ছেলের খোঁজে ৩০ বছর পথে পথে স্কুলশিক্ষক
পরীক্ষায় ফেল করার পর নিরুদ্দেশ হয়েছে ছেলে। সেই ছেলের খোঁজে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ পরিচিত সবার বাড়িতে পাগলের মত ছেলেকে খুঁজেছেন স্কুলশিক্ষক বাবা। কিন্তু ছেলের কোনো খোঁজ পাননি। কোনো উপায় না দেখে পুলিশের কাছেও গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। শেষমেষ ছেলের খোঁজে রাস্তায় নামেন প্রাইমারি স্কুলের ওই শিক্ষক। এরপর গত ত্রিশ বছর ধরে পথে পথে ঘুরছেন সন্তোষ কুমার মাইতি। ৯০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধের আশা, একদিন না একদিন তিনি ছেলেকে খুঁজে পাবেনই।
চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গিয়েছে তার। কানেও ভালো শুনতে পান না। নড়বড়ে দেহখানি লাঠিতে ভর করে তিনি ঘুরে বেরান। মৃত্যুর আগে অন্তত একবার ছেলের মুখ দেখতে চান এই বৃদ্ধ। তাইতো এই বয়সে এতটা কষ্ট করে চলেছেন।সন্তোষ কুমার মাইতির বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ভুপতিনগর থানার বায়েন্দা গ্রামে। সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলের নাম কৃষ্ণানন্দ আর ছোট ছেলের নাম দয়ানন্দ। সুভাষপল্লি হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলো ছোট ছেলে দয়ানন্দ।
আজ থেকে ত্রিশ বছর আগের কথা। ১৯৮৯ সালের ২ জানুয়ারি স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলে দেখা যায় দয়ানন্দ ফেল করেছে। এরপর স্কুল থেকে আর বাড়ি ফেরেনি সতেরো বছরের দয়ানন্দ।দুই সপ্তাহ ধরে আত্মী-স্বজন পরিচিতদের বাড়ি বাড়ি ছেলেকে খুঁজে ফেরেন ৬০ বছরের মধ্যবয়সী বাবা সন্তোষ কুমার মাইতি। এরপর ২০ জানুয়ারি ছেলে নিখোঁজের ঘটনা জানিয়ে ভূপতিনগর থানায় ডায়েরি করেন প্রাথমিক শিক্ষক সন্তোষবাবু।
এর চার বছর পর অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন তিনি। এরপর ছেলের খোঁজে নিজেই নেমে আসেন রাস্তায়। সেই থেকে খুঁজেই চলেছেন। তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘ছেলের খেঁজে কতবার যে পুলিশের কাছে গেছি! কিন্তু তারা কোনো সাহায্যই করেনি।’২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বড় ছেলেকে নিয়ে তার সঙ্গেও দেখা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা হয়নি। বিষয়টি তার নজরে আনার জন্য ছেলের নিখোঁজ সংক্রান্ত সমস্ত কাগজপত্র মুখ্যমন্ত্রীর স্থানীয় দফতরে জমা দিয়েছেন সন্তোষ কুমার মাইতি।
কলকাতায় ভবানীভবনেও বহুবার ছেলের খোঁজে এসেছেন। সিআইডির কথামত ২০০৬ সালের ২৭ এপ্রিল ভবানীভবনে নতুন করে অভিযোগও দায়ের করেছেন। লালবাজার থানাতেও ধর্না দিয়েছেন। কিন্তু ছেলের কোনো খোঁজ পাননি।শুধু কি থানা, আদালত চত্বরেও কত বছর ধরে ঘুরছেনেএই বৃদ্ধ! আদালতের এখানে সেখানে বসে ছেলের জন্য চোখের জল ফেলেন। কিন্তু কে দেবে তাকে ছেলের খোঁজ!বড় ছেলে কৃষ্ণানন্দ মাইতি বলেন, ‘ভাই নিখোঁজ হওয়ার বছর দুয়েক পর প্রতিবেশীদের কয়েকজন জানিয়েছিলেন কলকাতার শিয়ালদহ, ধর্মতলা ও বৌবাজার এলাকায় তারা ভাইকে দেখেছেন। কিন্তু আজও ভাইয়ের খোঁজ পাইনি।’
তবে মাইতি পরিবারের লোকজন জানান, কয়েক বছর আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দফতর থেকে একটা চিঠি এসেছিল। তাতে জানানো হয়েছিল, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।আর এখনও সেই চিঠির কারণেই ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন সন্তোষবাবু। সূত্র: আনন্দবাজার




