186116

মুসলিম হলেই কি জান্নাত পাওয়া যায়? জেনে নিন

কয়েকদিন জাহান্নামে শাস্তির পর জান্নাতে চলে যাবেই — এই ভুল ধারণা বনী ইসরাইলের ছিল, যারা ছিল সেই যুগের মুসলিম। কোনো কারণে নিজেদের প্রতি এমন অতি আত্মবিশ্বাস আজকে মুসলিমদের মধ্যেও চলে এসেছে। সূরা বাকারাহ সহ আরও কমপক্ষে ১০টি আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে বলেছেন: শুধু ঈমান এনেছি বললেই হবে না, একইসাথে আমাদেরকে ভালো কাজ (عَمِلُوا۟ ٱلصَّٰلِحَٰتِ) করতে হবে, যদি আমরা জান্নাতে যেতে চাই।[১৬৮] আর ঈমান একটা বড় ব্যাপার। কেউ মুসলিম দাবী করলেই ঈমানদার হয়ে যায় না। ঈমান যথেষ্ট কষ্ট করে অর্জন করতে হয় এবং তার থেকেও বেশি কষ্ট করে ধরে রাখতে হয়। একজন মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল, কিন্তু ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’ মানে কী সেটা বুঝল না, -এর সাতটি শর্ত পূরণ করল না;[১৭৫] ‘লোকে কী বলবে’ এই ভয়ে সে আল্লাহর تعالى নির্দেশকে প্রতিদিন অমান্য করল; নিজের কামনা-বাসনা পূরণ করার জন্য জেনে শুনে কু’রআনের নির্দেশ অমান্য করল; ইসলামকে সঠিকভাবে মানার জন্য নিজের ভেতরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার কোনো ইচ্ছাই তার ভেতরে নেই — এই ধরনের মানুষের ভেতরে ঈমান এখনও জায়গা পায়নি। তারা কেবল হয়ত মুসলিম হয়েছে বা নিজেকে শুধুই মুসলিম বলে দাবি করেছে।[১৬৮]

কেউ নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করুক আর না করুক, তার অবস্থা যদি এই আয়াতের মতো হয়, তাহলে সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন—

কখনই না! যে একটিও বড় পাপ অর্জন করে এবং তার পাপের ধারাবাহিকতা তাকে ঘিরে রাখে — ওরা হচ্ছে (জাহান্নামের) আগুনের সহযাত্রী। সেখানে তারা অনন্তকাল [বা অনেক লম্বা সময়] থাকবে। [আল-বাক্বারাহ ৮১]

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى এক বিশেষ প্রজাতির মানুষের কথা বলেছেন, যাদের অবাধ্যতা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তিনি تعالى বলছেন: যারা ‘একটিও বড় পাপ’ করে। سَيِّئَةً — যা এসেছে سُوء থেকে, যার অর্থগুলো হলো: নিজের বা অন্যের জন্য ক্ষতিকারক কাজ, অশ্লীলতা, অপব্যবহার, অন্যায় সুবিধা নেওয়া।[১৬৯] এটি হচ্ছে ঘৃণিত পাপ, বড় পাপ, যেমন মদ বা মাদকের প্রতি আসক্তি, ব্যভিচার, সুদ, হারাম ব্যবসা, অশ্লীলতা ইত্যাদি।[১] এটি ছোটখাটো পাপ ذنب নয়।[১] এই ধরনের একটি পাপ যে করে, তারপর যখন সেই পাপ তার জীবনটাকে ঘিরে ফেলে, সেই পাপ থেকে সে কোনোভাবেই বের হয় না, বরং সেই পাপ তাকে অন্যান্য পাপের দিকে নিয়ে যেতে থাকে, তাকে হাজার বুঝিয়েও লাভ হয় না, সে জাহান্নামের পথে চলতেই থাকে— সে চিরজীবন জাহান্নামে থাকবে, যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন।

হতে পারে সে কিছু ভালো কাজও করে। কিন্তু সেই পাপটা সে করবেই, এবং সেটা নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই। তাকে কু’রআন থেকে যতই প্রমাণ দেখানো হোক না কেন, সেই পাপ করা সে কোনোভাবেই ছাড়বে না। সে পাপটাকে হারাম মানে না। সে তার নিজের ইচ্ছা এবং সিদ্ধান্তকে আল্লাহর تعالى ইচ্ছা থেকে উপরে স্থান দিয়েছে। তার প্রভু আর আল্লাহ تعالى নয়, তার প্রভু হয়ে গেছে তার নিজের ইচ্ছা। এভাবে সে আল্লাহর تعالى আয়াতের কুফরি করেছে এবং আল্লাহর تعالى সাথে শিরক করছে, যার শাস্তি চির জাহান্নাম।[১][১১]

মানুষ যখন ছোট খাটো পাপ অনায়াসে করতে অভ্যস্ত হয়, তখন বড় পাপে জড়িত হওয়ার পথ খুলে যায়। আর বড় পাপগুলো কুফর ও শিরকের কাছাকাছি করে দেয়। এক পর্যায়ে ইসলাম থেকেই বের করে নেয়। ফলে তখন চিরস্থায়ী জাহান্নামই তার ঠিকানা হয়ে যায়।

 

এই ধরনের মানুষের উদাহরণ আমরা চারপাশে তাকালে দেখতে পারব, যারা হয়ত নিয়মিত জুম’আর নামায পড়ে, ফকিরদেরকে টাকা পয়সা দেয়, কুরবানির ঈদে লক্ষ টাকার গরু কিনে জবাই করে। কিন্তু তারপরে দেখা যায়: তারা তাদের হারাম ব্যবসা কোনোভাবেই ছাড়বে না। তারা কোনোভাবেই রাতের বেলা একটু হুইস্কি না টেনে ঘুমাতে যাবে না। তারা কোনোভাবেই ইন্টারনেটে পর্ণ দেখার অভ্যাস থেকে বের হবে না। তারপর তারা বিদেশে গেলে … না করে ফিরবে না। —এই ধরনের মানুষদেরকে পাপ ঘিরে ফেলেছে। তারা ঠিকই লক্ষ্য করছে যে, একটা পাপের কারণে তারা অন্যান্য পাপে জড়িয়ে পড়ছে। তারা খুব ভালো করে জানে তাদের কাজটা হারাম, কিন্তু তারপরেও তারা নানাভাবে সেই পাপ কাজকে সমর্থন করে। তারা কোনোভাবেই সেই পাপ থেকে বের হবে না। এমনটা নয় যে, তারা প্রবৃত্তির তাড়নায় এই পাপগুলো করছে। বরং তারা জেনে শুনেই ইচ্ছা করে অবাধ্য হয়ে পাপগুলো করছে। —এদের পরিণাম ভয়ঙ্কর।

এই আয়াতে خَطِيٓـَٔتُ এর অনুবাদ সাধারণত ‘পাপ’ করা হলেও, এটি হচ্ছে পাপের কারণে যে ফলাফল হয়, বা সঠিক রাস্তা থেকে দূরে চলে যাওয়া। এখানে আল্লাহ تعالى বলছেন যে, যে বড় পাপ করে, তারপর পাপের ধারাবাহিকতায় করা কাজকর্ম তার জীবনটাকে ঘিরে ফেলে।

যেমন, চৌধুরী সাহেব বিশাল পরিমাণের ঘুষ খাইয়ে একটা সরকারি প্রজেক্টের কন্ট্রাক্ট হাতালেন। এর জন্য তিনি মন্ত্রীকে গুলশানে দুইটা ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিলেন। তারপর ব্যাংকের লোণ নিয়ে জোগাড় করা সেই বিশাল অংকের ঘুষ, সুদ সহ শোধ করতে গিয়ে, এবং মন্ত্রীকে কথা দেওয়া দুইটা ফ্ল্যাটের টাকা উঠানোর জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে প্রজেক্টের অনেক টাকা এদিক ওদিক সরিয়ে ফেলতে হলো। দুই নম্বর সস্তা কাঁচামাল সরবরাহ করতে হলো। যোগ্য কনট্রাক্টরদের কাজ না দিয়ে অযোগ্য, সস্তা কনট্রাক্টরদের কাজ দিতে হলো, যারা কিনা তাকে প্রচুর ঘুষ খাওয়ালো। এরপর একদিন তার প্রজেক্ট ধ্বসে পড়ল। তার নামে ব্যাপক কেলেঙ্কারি হয়ে মামলা হয়ে গেলো। মামলায় উকিলের টাকা জোগাড় করতে তাকে আরও বিভিন্ন উপায়ে টাকা মারা শুরু করতে হলো। তারপর কয়েকদিন পর পর তাকে পুলিশ ধরতে আসে, আর তিনি পুলিশের উপরের তলার লোকদের ঘুষ খাইয়ে পুলিশকে হাত করে ফেলেন। প্রজেক্টে দুর্নীতির কারণে ভুক্তভুগি মানুষদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাকে অনেক টাকা খরচ করে কিছু ‘সোনার ছেলে’ পালতে হয়। তারা মাঝে মাঝেই খুন, ধর্ষণ করে, হোটেলে থেকে … করে এসে বিরাট বিল ধরিয়ে দেয়। তারপর তাদেরকে যখন পুলিশ ধরতে আসে, তিনি পুলিশকে টাকা খাইয়ে তাদেরকে রক্ষা করেন। এত দুশ্চিন্তার মধ্যে তিনি রাতে কোনোভাবেই ঘুমাতে পারেন না। দুশ্চিন্তা ভুলে থাকার জন্য তাকে নিয়মিত মদ খাওয়া ধরতে হয়। এভাবে একটার পর একটা পাপে তিনি জড়িয়ে পড়তে থাকেন। পাপের ধারাবাহিকতা তার জীবনটাকে ঘিরে ফেলে।

এই আয়াতে আল্লাহ বলেননি, “যারা একটি পাপ করে”, বরং তিনি বলেছেন, “যারা একটিও পাপ অর্জন করে।” এ থেকে আমরা এই ধরনের পাপীদের মানসিকতা সম্পর্কে ধারণা পাই: তারা চেষ্টা করে সেই পাপ অর্জন করে। পাপটা এমনিতেই ভুলে হয়ে যায় না। বরং তারা সেই পাপ করে একধরনের পরিতৃপ্তি পায়। সেই পাপ করে তার কোনো অনুশোচনা নেই, এটা তার কাছে একটা অর্জন। তারা মনে করে যে, এই পাপ করা কোনো ব্যাপার না, অন্য সবাই করছে না?[৬]

সূত্র: সম্পূর্ণা

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *