283644

১২ ঘণ্টায় সড়কে ঝড়ল ২৭ প্রাণ

নিউজ ডেস্ক।। নিরাপদ সড়কের দাবিতে টানা বিক্ষোভ ও অবরোধ এবং যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা চেষ্টা সত্ত্বেও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। বেপরোয়া বাস, ট্রাক, মাইক্রোসহ বিভিন্ন যানবাহনের চাকায় প্রতিদিনই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষসহ অকালেই ঝরে যাচ্ছে একের পর একে মূল্যবান প্রাণ। সর্বশেষ গত ১২ ঘণ্টায় সড়কে ঝরেছে মা-মেয়েসহ ২৭ জনের প্রাণ। এর মধ্যে চট্টগ্রামে লোহাগাড়ায় বাস-মাইক্রো সংঘর্ষে নিহত হন মা-মেয়েসহ আটজন। মাদারীপুরে একটি মাহফিলের বাস খাদে পড়ে সাতজন এবং পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় আর দুজন মারা যান। যশোরে পৃথক তিন দুর্ঘটনায় মা ও মেয়েসহ নিহত হন ৬ জন। বগুড়ার ধুনটে বন্ধুর বিয়েতে গিয়ে সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কা লেগে নিহত হন এক পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় যশোরে ৪ জন, বগুড়ার শেরপুরে ১, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে ১ ও রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ১ জন নিহত হন। চট্টগ্রাম ব্যুরো ও বগুড়া থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক এবং জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

চট্টগ্রাম : লোহাগাড়া উপজেলার চুনতির জাঙ্গালিয়া এলাকায় গত বুধবার রাত ১টার দিকে যাত্রীবাহী রিলাক্স পরিবহন বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই মা-মেয়েসহ মাইক্রোবাসের আট যাত্রী নিহত হন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় আহত হন আরও ১১ জন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত পাঁচজন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। নিহতরা হলেন-কক্সবাজার সদরের পিএম খালীর ছনখোলা নয়াপাড়া গ্রামের মো. জিসানের স্ত্রী তসলিমা আক্তার (২০), তার শিশুকন্যা সাদিয়া আক্তার (২), তসলিমা আক্তারের মা হাসিনা মমতাজ (৪৫), লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া লস্করপাড়া এলাকার হজেরা বেগম (২৬), চুনতি খলিফার পাড়া এলাকার আবু তাহের (২২), চকরিয়ার খুটাখালীর উত্তর মেধাকচ্ছপিয়া এলাকার বান্ডু মিয়ার ছেলে মো. নুরুল হুদা (২৫), লোহাগাড়া সিকদারপাড়া এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে আফজাল হোসেন সোহেল (৩০) ও বাঁশখালীর শেখেরখিল এলাকার মো. সিদ্দিকের ছেলে মোহাম্মদ সায়েম (২২)। তারা সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী।

স্থানীয়রা জানান, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসটি কক্সবাজার যাচ্ছিল। দুর্ঘটানায় বিপরীত দিক থেকে আসা মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। আর বাসটি রাস্তার পাশে ধানক্ষেতে পড়ে যায়। সেখান থেকে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। চট্টগ্রামের সহকারী পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) হাসান মোল্লা জানান, দুর্ঘটনায় বাসের কয়েক যাত্রীও আহত হন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চমেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত কর্মকর্তা এএসআই আলাউদ্দীন তালুকদার জানান, ভোরে আহত পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তারা সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী। এর মধ্যে আতাউর রহমান নামের একজনের অবস্থা গুরুতর। তার চোখে গাড়ির ভাঙা গ্লাস ঢুকেছে। বাকিরা মাথায় ও শরীরে আঘাত পান।

হাইওয়ে পুলিশের দোহাজারি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, দুর্ঘটনাস্থলটি একেবারে নির্জন একটি এলাকা। আহতদের চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এসে হতাহতদের আশপাশে সরিয়ে নেয়। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ত, যদি না আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেত। ফায়ার সার্ভিস রাস্তা থেকে দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও মাইক্রোবাসটি সরিয়ে নিয়েছে।

মাদারীপুর : ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুর সদর উপজেলার কলাবাড়ী ভাঙ্গাব্রিজ এলাকায় গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফরিদপুরের চন্দ্রপাড়া ওয়াজ মাহফিল ফেরত একটি বাস খাদে পড়ে ৭ জন নিহত ও অন্তত ৪৫ জন আহত হন। নিহতরা হলেন হাবি হাওলাদার (৫০), আব্বাস খান (৩২), হাসিয়া বেগম (৫৫), হাসান (১৪), আক্কাস (৪০), নয়ন (২৭) ও সায়েম (২৫)। তাদের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার ভাঙ্গাব্রিজ, পান্তাপাড়া ও খৈয়রভাঙ্গা এলাকায়।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার চন্দ্রপাড়া মাহফিলে যান এসব মুসল্লি। মাহফিল শেষে গতকাল সকালে তারা সুবিন-নবীন নামের একটি লোকাল বাসে বাড়ি ফিরছিলেন। ভাঙ্গাব্রিজ এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাককে সাইড দিতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায় বাসটি। এতে ঘটনাস্থলে চারজন নিহত হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পরে মারা যান আরও তিনজন। খবর পেয়ে মাদারীপুর ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নিয়ে আসে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনার পর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।

মাদারীপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অখিল সরকার জানান, গুরুতর আহত বেশ কয়েক জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এদিকে গতকাল রাজৈর বাসস্ট্যান্ডে ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী বিকাশ কর্মী নাইম বেপারী নিহত হন। এ ছাড়া খাগদীতে অপর একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আর একজনের মৃত্যু হয়। তবে তার নাম জানা যায়নি।

যশোর : যশোর-খুলনা মহাসড়কের চাউলিয়ায় গতকাল বেলা ১১টার দিকে ট্রাক চাপায় লেগুনার চার যাত্রী নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহত হন। তারা হলেন-মণিরামপুর উপজেলার গাবুখালি গ্রামের সুভাষ বৈরাগীর ছেলে সুব্রত বৈরাগী, একই উপজেলার কুয়াদা গ্রামের ঋষিকান্ত দাসের স্ত্রী শিউলী দাস ও তার মেয়ে সাধনা দাস এবং সদর উপজেলার জঙ্গলবাধাল গ্রামের সুলতান মোল্লার ছেলে শামীম মোল্লা।

যশোরের জেলা প্রশাসক আবদুল আওয়াল বলেন, আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশংকাজনক। তাদের অবস্থা স্থিতিশীল হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাইরে নিতে হলে ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে সকল আহত রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী শহরের শংকরপুর এলাকার ইসহাক সরদারের ছেলে আলেক সরদার নিহত হন। শহরতলীর ঝুমঝুমপুরে বিকালে ইটভাঙ্গার মেশিনের ধাক্কায় রাস্তায় পড়ে গিয়ে মারা যান যশোর সদরের মধুপুর গ্রামের আজগর আলীর ছেলে ইসমাইল হোসেন।

পটুয়াখালী : বরগুনা-চান্দখালী-সুবিদখালী-বাকেরগঞ্জ মহাসড়কের মির্জাগঞ্জ উপজেলার রানীপুর নামক স্থানে দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে এক ডিশ ব্যবসায়ী নিহত ও পুলিশ সদস্যসহ তিনজন আহত হন। গতকাল বেলা ১১টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতের নাম আবদুল লতিফ খান। তিনি উপজেলার মজিদবাড়িয়া গ্রামের বাড়ি থেকে মটরসাইকেলে সুবিদখালী যাচ্ছিলেন।

বগুড়া : বন্ধুর বিয়েতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরলেন মোটরসাইকেল চালক পুলিশ সদস্য আহসান হাবিব জেবু (২৩)। গত বুধবার রাত দেড়টার দিকে ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ী ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকায় সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কা লেগে নিহত হন তিনি। আহসান হাবিব জেবু ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার খাসরাজবাড়ী গ্রামের আব্দুল খালেক সরকারের ছেলে।

পুলিশ সূত্র জানায়, পাঁচ বছর আগে কনস্টেবল পদে যোগ দেন আহসান হাবিব জেবু। ধুনট উপজেলার বানিয়াজান গ্রামে বন্ধু ইসমাইলের বিয়ের খবর পেয়ে ১২ দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি যান। গত বুধবার বন্ধুর বিয়ের বরযাত্রী হয়ে ধুনট উপজেলার সোনাহাটা গ্রামে যান। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে রাত দেড়টার দিকে তিনি মোটরসাইকেলে বন্ধুর বাড়িতে ফিরছিলেন।

এদিকে শেরপুর উপজেলায় শ্যামলী পরিবহনের বাসচাপায় চান মিয়া (৩৫) নামে এক ভটভটিচালক নিহত হন। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের ছোনকা বাজার এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। চান মিয়া লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার গন্ধমরিয়া গ্রামের আব্দুল হামিদের ছেলে। দুর্ঘটনার পর পরই ঘাতক বাসটি আটক করা গেলেও চালক-হেলপার পালিয়ে যান।

রাঙামাটি : বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম সাজেকে জিপ গাড়ি উল্টে এক শ্রমিক নিহত ও পাঁচজন গুরুতর আহত হন। গতকাল দুপুর ২টার দিকে সাজেক সড়কের এগোজ্যাছড়ি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতের নাম জিয়া মাঝি। তিনি নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বাসিন্দা।

ad

পাঠকের মতামত