270802

প্রদীপের নিচেই অন্ধকার

রাষ্ট্রের সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ভর করে আইনের শাসনের মানদণ্ডের ওপর। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য যৎসামান্যই। বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের পক্ষে সাফাই গাইলেও বাস্তবতা তার পক্ষে কথা বলে না। এর প্রমাণ মিলেছে, সুশাসনের সূচকবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার জরিপের ফলাফলে। সে মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের ১১৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২তম। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান চতুর্থ। মধ্যম আয়ের ৩০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২২তম অবস্থানে। আইনের শাসন পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘দ্য ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট’-এর ‘রুল অব ল ইনডেক্স’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আটটি সূচকের ভিত্তিতে এই জরিপ পরিচালিত হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক নাগরিক অধিকার, নিয়ম ও নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতার প্রয়োগ, নাগরিক ন্যায়বিচার ও ফৌজদারি বিচার- এই আটটি সূচকের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এই প্রতিবেদন। জরিপের ফলাফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। দেশটির সূচক দাঁড়িয়েছে ৫২তম।

তার পরে নেপাল ৫৮তম স্থানে রয়েছে। ভারত রয়েছে ৬২তম অবস্থানে। আমরা এ বিষয়ে মুখে অনেক লম্বা-চওড়া কথা বললেও জরিপের ফলাফলে আমাদের অবস্থানটা একেবারে নিচে। আইনের শাসনের ভিত্তিটা খুবই নড়বড়ে হলেও ক্ষমতাসীনেরা সে কথা কখনোই মানতে চান না। একজন সিনিয়র মন্ত্রী এই জরিপ সংস্থার ফলাফলে উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘যে সূচকে নেপালের অবস্থান বাংলাদেশের উপরে সে প্রতিবেদনের ওপর আমাদের আস্থা নেই। নেপাল এমন একটি দেশ যে দেশ এখন পর্যন্ত একটি স্থায়ী সরকার ও পূর্ণাঙ্গ সংবিধান তৈরি করতে পারেনি। সেই দেশের আইনের শাসন যদি বাংলাদেশের উপরে থাকে তাহলে সেই প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।’ তিনি দাবি করেছেন, ‘বাংলাদেশে একটি ‘শক্তিশালী’ সংবিধান ও সরকারের ‘আইনগত ধারাবাহিকতা’ রয়েছে।’

সরকারের এমন দাবিকে অনেকেই বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিহীন মনে করছেন। শ্রমিক জাহালম ও ভাগ্যাহত দিনমজুর শুক্কুর শাহর ভাগ্য বিড়ম্বনার খবর ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ‘দুষ্টের দমন করে শিষ্টের লালন’ হলেও উভয়ের ক্ষেত্রে ঘটেছে তার ঠিক উল্টোটা। তারা অপরাধ না করেও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতা এবং আইনের অপপ্রয়োগের কারণেই শাস্তি পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ বাহিনীর গুরুতর ব্যর্থতা আলোচনায় এসেছে।

‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’র ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণেই দেশে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দুদক বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে গঠিত একটি সংস্থা। এটি ২০০৪ সালের ৯ মে দুর্নীতি দমন আইন অনুসারে কার্যকর হয়েছে। এ সংস্থার লক্ষ্য হচ্ছে দেশে দুর্নীতি ও দুর্নীতিমূলক কাজ প্রতিরোধ করা। কিন্তু প্রতিষ্ঠার একযুগ অতিক্রান্ত হলেও এই কমিশনের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাটাই বেশ ভারী বলে মনে হয়। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় দায়িত্ব পালনের চেয়ে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেই বেশ জোরালো অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতিষ্ঠা দুর্নীতি দমনের জন্য হলেও তা সরকারের ‘প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের মেশিনে’ পরিণত হয়েছে বলে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অভিযোগ করছে। অতীতে রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে গণমামলা ও গণশাস্তি সে কথাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। এ পর্যন্ত দুদক যেসব রাজনীতিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তাদের প্রায় সবাই বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী। অথচ যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদেরই দুর্নীতি করার সুযোগ বেশি। এ বিষয়ে দুদকের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ রয়েছে।

পাটকল শ্রমিক জাহালমের দীর্ঘ কারাবাসের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। জনৈক আবু সালেকের ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় চেহারায় মিল থাকায় মিথ্যা মামলায় তাকে যেভাবে নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে তাতে দুদকের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। নিন্দনীয় এই ঘটনা দেশে একটি ‘ক্রিমিনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর প্রতিচ্ছবি বলে রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ উঠেছে। এবার আরেক ‘জাহালমের’ খোঁজ মিলেছে। তিনি দিনমজুর শুক্কুর শাহ। নামের মিল থাকায় বিনা অপরাধে তাকে এক বছর জেল খাটতে হয়েছে।

আদালতের কাছে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এই ভুল স্বীকার করা হয়েছে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষে। আদালত শুক্কুর শাহকে মুক্তির নির্দেশ দিলেও তার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে একটি বছর। দুর্নীতি দমন কমিশনের ৩৩ মামলায় পাটকল শ্রমিক জাহালমের ৩৮৪ বছর কারাদণ্ড হয়েছিল। সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবু সালেক নামে একজনের নামে ৩৩টি মামলা করেছিল দুদক। ওইসব মামলায় ‘ভুল’ আসামি হিসেবে জাহালম গ্রেফতার ও তিন বছর কারাবন্দী ছিলেন। জাহালম নিজেকে নির্দোষ এবং তিনি অভিযুক্ত আবু সালেক নন বলে দাবি করলেও দুদক তা কেন আমলে নিয়ে অধিকতর তদন্ত করেনি এটা খুব রহস্যজনক এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের মারাত্মক অসদাচরণ। কিন্তু এ বিষয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে দুদক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে শোনা যায়নি। কাদের অবহেলার কারণে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল তা নিয়ে দুদকের যেন মাথাব্যথা নেই।

দুর্নীতি দমন কমিশনের রূপকল্প হচ্ছে, ‘সমাজের সর্বস্তরে প্রবহমান একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবিরোধী সংস্কৃতির চর্চা এবং এর প্রসার সুনিশ্চিত করা’। আর লক্ষ্য, ‘অব্যাহতভাবে দুর্নীতির দমন, নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ এবং উত্তম চর্চার বিকাশ সাধন।’ একযুগেরও অধিককাল অতিক্রান্ত হলেও কমিশন খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারেনি; বরং খাজনার চেয়ে বাজনাটা হয়েছে অনেক বেশি। দুদকের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, প্রতিষ্ঠানটি জনগণের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে পারেনি। বরং সাবেক ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ যেমন ‘দুর্নীতি লালন কমিশন’ হিসেবে জনশ্রুতি পেয়েছিল, বর্তমান কমিশনও বোধহয় সে বৃত্তে আটকে পড়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় তাদের অতিআগ্রহটা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে কমিশন। হাইকোর্ট বিভাগও বিষয়টি নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন।

‘পাঁচ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তদন্তের চেয়ে স্কুলের অনিয়ম তদন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন দুদক চেয়ারম্যান।’ ‘ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট-পাচার হয়ে যাচ্ছে; আর দুদক ব্যস্ত প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের হাজিরা নিয়ে’- মহামান্য হাইকোর্টের করা এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় দুদক এভাবেই আত্মপক্ষ সমর্থন করেছে। কেউ কেউ প্রাইমারি শিক্ষক নিয়ে টানাটানি দুদকের ‘কর্মপরিধির বাইরে’ বলে মনে করছেন। সে অনিয়ম দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছেন। আর দুদককেই যদি সব কিছুই করতে হয় তাহলে অন্যরা কী করবে?

দুর্নীতি দমনে দুদকের বড় কোনো অর্জন নেই। দুদক প্রদীপের নিচে অন্ধকার রেখেই যেভাবে কর্মতৎপরতা চালাচ্ছে তাতে সফল হওয়ার আশা খুবই ক্ষীণ। এতে কেউ কেউ পুলকিত হলেও কিন্তু জাহালম আর শুক্কুর শাহদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। সূত্র: নয়া দিগন্ত

ad

পাঠকের মতামত