241840

‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ ফখরুলের

নিউজ ডেস্ক।। ভোট যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই পরিবর্তন হচ্ছে ভোটার ও ভোটের মাঠের প্রেক্ষাপট। গণসংযোগ, প্রচার-প্রচারণা, উঠান বৈঠক ও সভাসহ নানা কার্যক্রমে ব্যস্ত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের প্রার্থীরা। প্রেস্টিজ ইস্যু হওয়ায় নানা প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর জনমন জয় করে আসনটি ধরে রাখতে চাইছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন। স্বাধীনতার পর থেকে ঠাকুরগাঁও-১ আসন আওয়ামী লীগ কিংবা মহাজোটের দখলে থাকলেও শুধু ২০০১ সালের নির্বাচনে আসনটি হাতছাড়া হয়। এরপর থেকে ২০০৮ থেকে এই আসনটি আবারো আওয়ামী লীগের দখলে চলে আসে।

কিন্তু নিজ নির্বাচনী আসনে এবারো বেকায়দায় রয়েছেন বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২৩ ভাগ হিন্দু ভোটারদের কাছে টানতে না পারলে ফের হারাতে পারেন বিএনপির হেভিওয়েট এ প্রার্থী। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২১ হাজার ৬২২ জন। ২৩ শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের ১ লক্ষ ২০ হাজারের মত একটি নিদিষ্ট ভোট ব্যাংক রয়েছে আওয়ামী লীগের । বিশাল হিন্দু ভোটারদের কাছে টানতে না পারলে বিএনপি’র পক্ষে আসনটি দখলে নিতে পারবে না মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের কাছে টানতে বিএনপি নানা কৌশল করছেন। কিন্তু বিগত জামায়াত জোট সরকারের আমলে হিন্দু সম্প্রদারে উপর হামলা, নির্যাতনের কারণে অনেকটাই কোনঠাসা বিএনপি।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তরুণ প্রজন্মের নেতা সাহেদুল ইসলাম আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় সাবেক এমপি খাদেমুল ইসলামের ছেলে নৌকা মার্কাকে বিজয়ী করতে ঠাকুরগাঁওয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। বাবা’র অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার জন্য রমেশ চন্দ্র সেনের পক্ষে মানুষের দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা করছেন। এতে করে হঠাৎ নৌকা মার্কার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে যা বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।

৯১ ও ৯৬ সালে ঠাকুরগাঁও সদর আসনটিতে প্রথম নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খাদেমুল ইসলামের কাছে হারেন ফখরুল। ১৯৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকার সময় খাদেমুল ইসলাম মারা যান। পরে উপ-নির্বাচনে বর্তমান এমপি রমেশ চন্দ্র সেন নির্বাচিত হয়। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল প্রথম ২০০১ সালে বর্তমান এমপি রমেশ চন্দ্র সেনকে হারান। ২০০৮ সালে রমেশ চন্দ্র সেনের কাছে ফের হারেন মির্জা ফখরুল। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলে আবারো আসনটি রমেশ সেনের দখলে চলে আসে।

নির্বাচনী এলাকা ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফখরুল ইসলাম বিএনপির মহাসচিব হওয়ায় নিজ আসনে জনপ্রিয়তার এগিয়ে রয়েছেন। তেমনি প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনও এগিয়ে রয়েছেন নিজ সম্প্রদায় হিন্দু ভোটারদের কাছে। গত ২০০৮ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও সদর আসনে ৫৭ হাজার ভোটে পরাজিত হন মির্জা ফখরুল। তাই এবারো রমেশ চন্দ্র সেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক হওয়ায় অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছেন ভোট ব্যাংকে। এছাড়া সরকারের গত ১০ বছরে এলাকায় উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে ও বিভিন্ন সুবিধায় বেশি ভাগ হিন্দুরা পেয়েছে। এক কথায় বিএনপিকে এখানে হিন্দু ভোটারদের হাতের বাইরে রেখে নির্বাচনী মাঠে নামতে হয়েছে এবারো। তাই হতাশায় রয়েছে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল।

তবে এটা মানতে রাজি নয়, জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমুর রহমান। তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে ফখরুল ৩৭ হাজার ৯’শ ভোটের ব্যবধানে জিতেছিল। এবারও আরো বেশি ভোটে জিতবে। মির্জা ফখরুল হিন্দু সম্প্রদায়কে কখনও আলাদা ভাবে দেখেনি। তাই সব সময় তাদের সমর্থন ছিল, এবারও থাকবে।’ অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নৌকা মার্কার প্রার্থী রমেশ সেন বলেন, জনগন এলাকায় উন্নয়ন দেখেই নৌকাকে ভোট দিবে। এই আসনে বিগত ১০ বছরে যে পরিমান উন্নয়ন হয়েছে তা জোট সরকারে আমলে কখনই সম্ভব হয়নি আর হবেও না।

রমেশ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতী দিয়ে বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে এই এলাকার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, আইটি পার্ক চালু, অর্থনৈতিক জোন, মহিলা হোস্টেল চালু করা হবে।’ স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন, বিএনপির পক্ষে সারাদেশে যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, আর চলমান আন্দোলনে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বের প্রভাব নিজ এলাকাতে অবশ্যই পড়বে। রমেশ চন্দ্র সেন আওয়ামী লীগের মধ্যে বিরোধ রয়েছে যা নৌকা মার্কার টিকিট পেতে লক্ষনীয়। ভোটাররা এখন আরও বেশি সচেতন। তাই আগের মতো রমেশ চন্দ্র সেনের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া এখন আর সহজ নয়। আর হিন্দুরা যে এবার তার দিকেই একজোট হয়ে থাকবে তা ঠিক নয়।

গত তিন টার্মে নির্বাচনের পরিসংখ্যান দেখতে দেখা যায়, শতকরা ২৩ ভাগ হিন্দু ভোটারদের যে কাছে টানতে পেয়েছেন সে শুধু জয়ী নয়, বড় ভোটে জয় পেয়েছে। তবে আ’লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেন হিন্দু সম্প্রদায়ের হওয়ায় তিনি অতিরিক্ত একটা সুবিধা পাবেন। এই অবস্থায় জাতীয় পার্টির প্রায় ৩৫ হাজার ভোটারকেও কাছে টানারও চেষ্টা করছেন মির্জা ফখরুল। তবে মহাজোট বহাল থাকলে এই ভোটও পাবেন না তিনি। তাই তখন বিএনপি-জামায়াতের ভোটের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে তাকে। তবে হিন্দু ভোটারদের কাছে না টানতে পারলে নির্বাচনে জেতা কঠিন হযে দাঁড়াবে ধানের শীষের প্রার্থী মির্জা ফখরুলের জন্য।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, গ্রেপ্তারের ভয়ে গ্রাম পর্যায়ে আমাদের নেতাকর্মীরা বাসায় থাকতে পারছে না। প্রচারণা করতে গেলেই নানা রকম ভয়ভীতি দেখা হচ্ছে। ইসি যদি সুষ্ঠ নির্বানের পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারে তাহলে ব্যালটের মাধ্যমে মানুষ জবাব দিয়ে ধানের শীষে দিয়ে। ভোট দেওয়ার জন্য মানুষ সুষ্ঠ পরিবেশ পেলেই সরকার পতনের ঘটানো সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম জানান, আমার এই আসনে হিন্দু মুসলিমের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। যদি সুস্ঠ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয় তাহলে দেশের শান্তিক্লালে দিকে লক্ষ করেই সকলে ধানের শীষে ভোট দিবে বলে আশা ব্যক্ত করেন। অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিদের্শনায় পরিচালিত। তাই সুষ্ঠ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ আমরা। তবুও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আমরা ভোটে এসেছি, শেষ পর্যন্ত থাকবো। মানুষ ভোট দিতে পারলেই স্বৈচারি সরকারের পতন অনিবার্য। ৩০ ডিসেম্বর মানুষ ভোট দিয়ে বিজয় নিয়ে আসবে ধানের শীষের।

ঠাকুরগাঁও সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ বলেন, এই আসনে ১ লাখ ২০ হাজার ভোট বাদ দিয়ে নির্বাচনী হিসাব করি করতে হয় বিএনপির প্রার্থীকে। এরপর বর্তমান নৌকার প্রার্থী হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাই এবার এই হিসাব আরো কঠিন হবে ধানের শীষের প্রার্থীর জন্য।

নির্বাচনী পরিসংখ্যান: ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেন নৌকা প্রতীক নিয়ে ৫৬ হাজার ৬’শ ৯০ ভোটের ব্যবধান ধানের শীর্ষ প্রতীকের মির্জা ফখরুলকে পরাজিত করেন। নৌকা পায় ১ লাখ ৭৭ হাজার ১০১ ভোট, ধানের শীষ পায় ১ লাখ ২০ হাজার ৪১১ ভোট।

এর আগে ২০০১ সালে ৮ম সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৩৭ হাজার ৯’শ ৬২ ভোটের ব্যবধানে আ’লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেনকে হারান। ধানের শীষ পায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯’শ ১০ ভোট আর নৌকা পায় ৯৬ হাজার ৯’শ ৪৮ ভোট। এককভাবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নূরে আলম চৌধুরী পান ১৬ হাজার ৬’শ ৪৭ ভোট।

১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় নির্বাচনে আ’লীগের প্রার্থী নৌকা প্রতীক নিয়ে খাদেমূল ইসলাম পায় ৬২ হাজার ৭’শ ০৯ ভোট বিএনপি’র মির্জা ফখরুল ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পান ৫৮ হাজার ৩’শ ৬৯ ভোট। ভোটের ব্যবধান ৪ হাজার ৩’শ ৪০ ভোট। আলাদা নির্বাচন করে জামায়াতের রফিকুল ইসলাম পান ১৭ হাজার ২’শ ৪২ ভোট। তবে জামায়াতের সঙ্গে একত্রে হিসাব করলে আরো ১৪ হাজার ভোটে এগিয়ে থাকেন মির্জা ফখরুল।

১৯৯১ সালে ৫ম জাতীয় নির্বাচনে আ’লীগের প্রার্থী নৌকা প্রতীক নিয়ে খাদেমূল ইসলাম পান ৫৭ হাজার ৫’শ ৩৫ ভোট, বিএনপি’র মির্জা ফখরুল ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পান ৩৬ হাজার ৪’শ ০৬ ভোট। ভোটের ব্যবধান ২১ হাজার ১’শ ২৯ ভোট। তবে আলাদা আলাদাভাবে নির্বাচন করে জামায়াত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম পান ২৬ হাজার ৮’শ ভোট আর জাতীয় প্রার্থীর প্রার্থী রেজওয়ানুল হক পান ২১ হাজার’ ৫০ ভোট।

জাতীয় নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মহাজোট ও জোটের শরীকদের ভোটারও এই আসনে বড় ফ্যাক্টর। তবে গত ২০ বছরের জাতীয় পার্টির ভোটার কমলেও বেড়েছে জামায়াতের ভোট। বর্তমানে ঠাকুরগাও সদর আসনটিতে জামায়াতের ৪৫ থেকে ৫০ হাজার ভোট রয়েছে। তবে হিন্দু ভোটারকে কাছে না টানতে পারলে আসনটি উদ্ধার করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে বলে অভিমত স্থানীয় বিশ্লেষকদের। উৎস: বিডি-জার্নাল।

ad

পাঠকের মতামত