220049

‘আম্মুকে মারধর করে আব্বু’

বরগুনার আমতলী উপজেলায় যৌতুকের জন্য নাসরিন বেগম (৩০) নামের এক সন্তানের মাকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল রোববার রাতে উপজেলার উত্তর তক্তাবুনিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

আহত নাসরিনকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছে পুলিশ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কুকুয়া গ্রামের আবদুল হক মিয়ার মেয়ে নাসরিন বেগমের সঙ্গে ২০০৮ সালে পাশের হলদিয়া ইউনিয়নের তক্তবুনিয়া গ্রামের বজলু হাওলাদারের ছেলে সাহাব উদ্দিন স্বপনের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে সাহাব উদ্দিনকে পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র এবং ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

পরে ২০১০ সালে স্বপনের বরিশাল পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে জুনিয়র ইন্সট্রাকটর পদে চাকরি হয়। চাকরি হওয়ার পর থেকে নাসরিনের ওপর অসহনীয় নির্যাতন নেমে আসে। ২০১২ সালে আমতলীতে জমি কেনার জন্য স্বপন শ্বশুরবাড়ি থেকে তিন লাখ টাকা এনে দিতে বলেন নাসরিনকে। নাসরিন এতে রাজি হননি। এর পর থেকে শুরু হয় নির্যাতন। মেয়ের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আবদুল হক জামাতাকে তিন লাখ টাকা যৌতুক দেন।

সে বছর ফেব্রুয়ারিতে মাসে আরও পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন স্বপন। এ টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় নির্যাতন আবার শুরু হয় নাসরিনের ওপর। স্বামী স্বপনের নির্যাতনে সে বছর ১০ ফেব্রুয়ারি নাসরিন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। পরে নাসরিনকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের মানসিক বিভাগে পাঠান। ওই হাসাপাতালে গত তিন মাস চিকিৎসাধীন ছিল নাসরিন। চিকিৎসা শেষে এ বছর মে’তে নাসরিন বরিশালে শ্বশুরবাড়ি গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন স্বামী স্বপন। তিনি নাসরিনকে বেধড়ক মারধর করে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেন।

পরে গত ১৫ দিন ধরে নাসরিন বাবার বাড়িতে অবস্থান করেন। রবিবার সন্ধ্যায় শাশুড়ি সাজেদা আক্তার সাজুর অনুরোধে নাসরিন স্বামীর উত্তর তক্তাবুনিয়া গ্রামের বাড়িতে যান। বাড়ি পৌঁছানো মাত্রই স্বামী ও শ্বশুর বজলু হাওলাদার নাসরিনকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেন। নাসরিন প্রাণ রক্ষায় পাশের পাশা হাওলাদারের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে ওই বাড়ি থেকে স্বপন টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে নাসরিনকে ঘরের মধ্যে তালা দিয়ে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে নাসরিনের মামা আবদুস সালাম আকন পুলিশ নিয়ে রাত সাড়ে ১১টায় নাসরিনকে উদ্ধার করে আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপকমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. হারুন অর রশিদ বলেন, নাসরিনের বাহু, কোমর ও হাতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ ছাড়া তার সারা শরীরে জখমের চিহ্ন রয়েছে।

আহত নাসরিন বলেন, ‘বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে জুনিয়র ইন্সট্রাকটর পদে চাকরি হওয়ার পরে থেকে যৌতুকের দাবিতে স্বপন আমাকে অমানসিক নির্যাতন করে আসছে। তার নির্যাতনে আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছি। আমাকে চিকিৎসা না করিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। এ পর্যন্ত তাকে আমার বাবার বাড়ি থেকে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক এনে দিয়েছি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমার বাবার বাড়ি থেকে পাচঁ লাখ টাকা যৌতুক এনে দিতে বলে। আমি এতে রাজি না হওয়ায় আমাকে মারধর করেছে। বিয়ের ১০ বছরে স্বপন আমাকে একাধিকবার মারধর করেছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’

এ বিষয়ে আহত নাসরিনের মেয়ে সাওদা মনি জানায়, ‘আব্বু আম্মুকে মারধর করে।’

এদিকে নাসরিনের স্বামী স্বপনকে ফোন দিলে তিনি ফোন ধরে ‘ব্যস্ত আছি’ বলে কেটে দেন।

আমতলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই ) মো. ইমন বলেন, খবর পেয়ে আহত নাসরিনকে শ্বশুর বাড়ি থেকে উদ্ধার করে আমতলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছি।

আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলাউদ্দিন মিলন বলেন, স্বজনদের মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ পাঠিয়ে নাসরিনকে উদ্ধার করেছি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ad

পাঠকের মতামত