‘ইকবালে আমগো সুখের সংসার তছনছ কইরা দিছে’
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেনের ছেলে খালেদ মোহাম্মদ ইকবালের মিথ্যা মামলা আর হামলায় আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে নিজমাওনা গ্রামের ৫টি পরিবারের ৩৫জন সদস্য।
জালিয়াতি করে দরিদ্র পরিবারগুলোর বসতি জমি নামখারিজ করে নেয়ার প্রতিবাদ করায় নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেই ক্ষান্ত হননি চেয়ারম্যানপুত্র। মোটা অংকের টাকা দিয়ে পুলিশ দিয়ে মিথ্যা মামলায় নারী পুরুষ ৫জনকে জেলও খাটায়। কিন্তু নির্যাতিত পরিবারগুলো দুই মাস থানা পুলিশ ঘুরে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেনি।
গত মঙ্গলবার শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে আদালতে গিয়ে চেয়ারম্যানপুত্র খালেদ মোহাম্মদ ইকবালসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য সারোয়ার হোসেন বাদী হয়ে গাজীপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন।
ওই মামলার পরপরই ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন চেয়ারম্যানপুত্র ইকবাল। ইকবালের ভয়ে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কলেজ পড়ুয়া বাদী সারোয়ার। সম্প্রতি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এসে সেই চেয়ারম্যান পুত্র ইকবাল ও তাঁর ক্যাডার বাহিনীর নির্যাতন এবং হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রমাণাদি তুলে ধরেন কালেরকণ্ঠের এ প্রতিবেদকের কাছে।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের নিজ মাওনা গ্রামের মোবারক হোসেনের চারপুত্র আরফান আলী, আছান আলী, শাহজাহান মুন্সি ও আরমান আলী। শত বছরের বেশি সময় ধরে নিজ মাওনা গ্রামে বসবাস করে আসছেন। কৃষি কাজ আর দিনমজুরি করেই নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সুখেই দিন কাটছিল। কিন্তু কয়েক মাস ধরে গাজীপুরা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেনের ছেলে ডাক্তার খালেদ মোহাম্মদ ইকবাল ও তাঁর অনুসারি ক্যাডাররা নিরীহি পরিবারগুলোর শান্তি বিনষ্ট করে দিয়েছে।
৫টি পরিবারের নারী আর পুরুষদের বিরুদ্ধে মামলা এবং হামলা করে চরম নির্যাতন চালানো হচ্ছে। নিজ মাওনা গ্রামে বসত ভিটার সাড়ে ৫৪ শতাংশ জমিটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠে চেয়ারম্যানের ছেলে ইকবাল।
ইকবালের নির্যাতনের শিকারদের কান্না
নিরীহ পরিবারগুলোর অভিযোগ- মোবারক হোসেনের ছেলেরা গাজীপুর মৌজার সিএস এবং এসএ ৮১৫ দাগের ১০৯ শতাংশ জমিটি ৪৬৭০ নম্বর দলিলের মাধ্যমে ২০০৬ সালে স্থানীয় আব্দুল মজিদ গংদের কাছ থেকে কেনেন। কিন্তু চেয়ারম্যানর ছেলে খালেদ মোহাম্মদ ইকবাল এসএ ৫৫৫ দাগে ৫৪৪৪ নম্বর দলিলের মাধ্যমে জমি কিনলেও দখল নিতে চায় ৮১৫ দাগের জমিটি। সেই জমিটি উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) সঙ্গে আতাত করে ২০১১ সালে ইকবাল ও তাঁর তিন বোনের নামে তাদের জমি নামখারিজ করে নিয়ে যায়।
বিষয়টি জানতে পেরে এসিল্যান্ড অফিসে মিস কেস করেন দরিদ্র পরিবারগুলো। এরপর ক্ষিপ্ত হয়ে ইকবাল ও তাঁর ক্যাডার বাহিনীর লোকজন নিয়ে সম্প্রতি হামলা করে এবং পরপর চারটি মামলা করে। হামলা করে আরফান আলীন কলেজপড়ুয়া ছেলে সারোয়ার হোসেনকে বেধড়ক পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেয় এবং বাড়ির নারীদের উপর চলে নির্যাতন। এরপর আহত অবস্থায় শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে গ্রেপ্তার করায় ইকবাল। একই মামলায় সারোয়ার, দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, ৭ মাসের শিশুকে মায়ের কোল থেকে নামিয়ে রেখে মা আলেয়া বেগমকে গ্রেপ্তার করে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় স্থানীয় স্কুল শিক্ষককেও ধরে নিয়ে যায় নিয়ে যায় পুলিশ।
কবরস্থান গুড়িয়ে ভবন নির্মাণ ইকবালের
অভিযোগ উঠেছে, ইউনিয়ন কমিউনিটি পুলিশের সভাপতি পদের সুযোগ নিয়েই ইকবাল দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর হামলা এবং নির্যাতন করে উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মামলা করে জেলে পাঠায়। কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলোর নির্যাতনের বিষয়ে মামলা করার জন্য একাধিক থানায় গিয়ে ঘুরাঘুরি করলেও পুলিশ মামলা নেয়নি। উল্টো নানা ভাবে ভয়ভীতি দেখায় দেখায়।
শেষে নিরুপায় হয়ে দুই মাস পর গাজীপুর আদালতে নির্যাতনের শিকার সারোয়ার হোসেন বাদী হয়ে খালেদ মোহাম্মদ ইকবালকে প্রধান আসামী করে মামলা করেন (মামলা নম্বর ৪৯৬)। মামলার অপর আসামীরা হলেন ইকবালের ক্যাডার মো. তাইজউদ্দিন, সাদ্দাম হোসেন, মো.উজ্জল মিয়া, ফয়েজ উদ্দিন।
অভিযুক্ত খালেদ মোহাম্মদ ইকবাল বলেন- আমি কারো জমি দখল করিনি এবং কবরস্থানও ভাঙ্গিনি। আমার বাবার কেনা জমিই আমি দখলে নিয়েছি। মারধর করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন-আমার কেয়ারটেকারকে মেরে হাত ভেঙ্গে দিয়েছে। সেই মামলায় তারা কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছিল। আমি কোনো খারাপ লোকের সঙ্গে চলি না।
শাহজাহান মুন্সির ছেলের বউ আকলিমা আক্তার বলেন, ‘একজন ডাক্তার মানুষ এমন খারাপ হয়। ইকবালের মামলায় জেল খাটলাম, এখন ঘরে ঠিকমত থাকতে পারি না। বাড়িতে এসে আমাদের হুমকি দেয় গালাগালি করে। ইকবাল আমাগো বাড়ির সব শান্তি কাইরা নিয়া গেছে।
ভুক্তভোগী বাদসা মিয়ার স্ত্রী আলেয়া বেগম বলেন,‘আমার সাত মাসের দুধের সন্তান ফালাইয়া ধইরা নিয়া গেছিল পুলিশ। লেহা-পড়া করাইয়া চেয়ারম্যান সাব ইকবালরে ডাক্তার বানাইছে,ডাক্তার ম্যানুষ এত হারামি অয় আমি দেহি নাই। একটার পর একটা মামলা দিতাছে আমগোরে। আমরা কোনো বিচার পাই না।’
শাহজাহান মুন্সির স্ত্রী বৃদ্ধা মানিকজান বেগন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাগো সব সুখ কাইরা নিছে চেয়ারম্যানে পুতে। রাতে পুলিশ আর ইকবালের ক্যাডারদের ভয়ে পুরুষ মানুষ কেউ বাড়িতে থাকে না। আমার জামাইর কবর ভাইঙ্গা দালান করে ইকবাল। দুনিয়ায় কি বিচার নাই বলেই তাঁদে থাকেন তিনি।’
মামলার বাদী সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘সারাক্ষণ ভয়ে থাকি,কখন জানি পুলিশ আমারে ধইরা নিয়া যায়। বিএসএস ফাইনাল ইয়ারে পড়ি। সবার সামনে এলোপাথারি আমারে মারপিট করলো ইকবাল ও তার লোকজন। বিচার তো পাইলামই না,উল্টো আরো আমাকে ধইরা নিয়ে জেলে দিল। জেল থেকে আইসা শ্রীপুর থানার বারিন্দা দিয়া ঘুরতে ঘুরতে জীবন শেষ,পুলিশ মামলা নেয় না। বহু কষ্টে গাজীপুর আদালতে মামলা করছি।’
আসান আলী বলেন, ‘ওরা জমি কিনছে অন্য দাগে দখলে নিতে চায় আমাদের জমি । জালিয়াতি করে নামজারির করে নেয় চেয়ারম্যানের ছেলে। আমাদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে ইকবাল। একের পর এক মামলা দিচ্ছে। কবরস্থান গুড়িয়ে সরকারি খাস জমিতে দালান করছে কিন্তু কিছুই বলার নেই।’
ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে আসান আলী বলেন, ‘আমার মা হালিমা বেগম ও বড় ভাই শাহজাহান মুন্সির কবর গুড়িয়ে দিয়ে দালান করছে ইকবাল।’
হাসমত আলী ফরাজী প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক মো. মফিজউদ্দিন ফরাজী বলেন, ‘সেইদিন নির্মমভাবে হামলা করেছিল চেয়ারম্যানের ছেলে ইকবাল ও তাঁর লোকজন। রক্তাত্ব অবস্থায় পড়ে থাকায় সারোয়ারকে নিয়ে আমি হাসপাতালে নিয়ে যাই। আর এই কারণে আমাকেও মামলায় আসামী করে এবং গ্রেপ্তার করিয়ে জেল খাটায় চেয়ারম্যানের ছেলে ইকবাল।’
গ্রামেস বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ডাক্তারের সঙ্গে ডাকাত আর হত্যা মামলার আসামীরা কিভাবে চলাচল করে। চাঁদাবাজ মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ডাক্তারের সখ্যতা কেন। হাসপাতাল রেখে নিজের গ্রামের বাড়িতে পড়ে থাকেন কেন ? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাই না আমরা।’
মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাগীব আলী মেডিকেলে কিছুদিন পড়ে এখন ইন্টার্নী করছেন বিএসএমএমইউতে। কিন্তু নিজেকে এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ডাক্তার তো মানবিক এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করে। কিন্তু ইকবাল মানুষের জমি জমা দখলবাজি করে সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম করে ফেলছে।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, চেয়ারম্যানের ছেলে ইকবাল ও তাঁর লোকজন গরিব মানুষের জমি জোর করে নেয়ার অত্যাচার জুলুম করছেন। বাধা দেয়ায় মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন। তাঁর অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেও হামলা মামলা শিকার হতে হচ্ছে।
এলাকার খাস জমি আর অর্পিত যেখানে, সেখানেই চোখ পড়ছে চেয়ারম্যান পুত্র ইকবালের। ইউনিয়নের যেখানে সরকারি সেখানের ভূমিহীন মানুষকে উচ্ছেদ করে জমি দখল নিচ্ছে ইকবাল।
চেয়ারম্যান পুত্র খালেদ মোহাম্মদ ইকবাল গাজীপুর ইউনিয়ন কমিউনিটি পুলিশের সভাপতি এবং একজন ডাক্তার। সেই মানুষটি এলাকার অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কথা থাকলেও তিনি নিজেই এখন দখলবাজি আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন এলাকায়। ১৫ থেকে ২০ জনের একটি ক্যাডার বাহিনী নিয়ে পুরো এলাকার মানুষকে জিম্মি করে রেখেছেন।
চেয়ারম্যানপুত্র ইকবাল নিজের ইউনিয়নের খুন, মাদক, ধর্ষণ, চাদাঁবাজি ও ডাকাতি মামলার আসামীদের নিয়ে প্রকাশ্যেই চলাফেরা করছেন এবং বিভিন্ন অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন। ইকবাল নিজেকে বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসক দাবী করলেও প্রকৃত অর্থে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগপ্রাপ্ত কোন চিকিৎসক নয়। তিনি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রেসিডেন্স ইন্টার্ন হিসেবে আছেন। এমন একজন ব্যাক্তির সঙ্গে ভয়ংকর অপরাধীদের সখ্যতা দেখে এলাকাবাসী বিস্মিত এবং ক্ষুদ্ধ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে, ইকবাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রেসিডেন্স ইন্টার্ন হলেও নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। মাসে হাতেগোনা কয়েক দিন উপস্থিত থাকলেও বেশিরভাগ সময় তিনি অনুপস্থিত থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাশপাশি নিজের এলাকায় বিতর্কিত এবং এলাকার চিহ্নিত অপরাধীদের সঙ্গে বেশি সময় কাটানোর বিষয়টির সতত্যা স্বীকার করেছেন স্থানীয় ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যানসহ গণ্যমাণ্য ব্যাক্তিরা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় স্থানীয় সন্ত্রাসী এবং ক্যাডার বাহিনী নিয়ে রাত অবদি চলে আড্ডা। এলাকায় যেখানেই সরকারি খাস জমি আর অর্পিত জমি আছে সেটাই কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাঁর ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। ইকবাল গাজীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও গাজীপুর বাজার পরিচালনা কমিটিরও সভাপতি।
গাজীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সত্তরোর্ধ নুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রামের দরিদ্র মানুষের উপর জুলুম যেন না করে সেটা বার বার বলেছিলাম কিন্তু তারা আমার কথা শুনছে না। হের টাকা পয়সা আছে, গায়ের জোর আর ক্ষমতা দিয়ে সবকিছুই করার চেষ্টা করছে। কবরস্থানের উপর দিয়েই এখন বিল্ডিং করতে বাধা দেয়ায় মানুষগুলোকে অনেক মারধর করছে। বিষয়টি আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছি, এর বেশি কিছুতো করার ক্ষমতা নেই আমার।’




