213442

শুধু হাতই নয়, স্বপ্নও হারিয়েছে রাজীব





ডেস্ক রিপোর্ট।। জীবনটাই তার দুঃখে মোড়া। তিন বছর বয়সেই বাবা ও আট বছর বয়সে মাকে হারিয়ে পুরোপুরি এতিম। তারপর ছোট দুই ভাইকে নিয়ে খালার বাড়িতে আশ্রয়। এক সময় ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাও শুরু। আর সেই স্বপ্ন পূরণের প্রস্তুতিও চলছিল বেশ ভালোই। এসএসসি-এইচএসসির গণ্ডি পেরিয়ে পড়ছিলেন সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতক (বাণিজ্য) তৃতীয় বর্ষে। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পার্টটাইম কাজ করে নিজের এবং ছোট দুই ভাইয়ের খরচ চালাতেন। কোনো রকমে আর ২-৩ বছর কাটিয়ে ফাইনাল রেজাল্টের পরই সরকারি চাকরিতে ঢুকবেন; ছোট ভাইদের ভরসা হবেন, গড়বেন নিজেদের একটা সংসার। যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগের মেস থেকে বেরিয়ে বিআরটিসির দ্বিতল বাসের পেছনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এসব কল্পনা করতে করতেই হয়তো মহাখালীর কলেজ ক্যাম্পাসে যাচ্ছিলেন রাজীব হোসেন (২১)। কিন্তু তার সুখ-কল্পনায় ফের আঘাত হানল দুঃখ। ‘চালক’রূপী এক দানবের গোয়ার্তুমিতে শুধু ডান হাতই হারাননি তিনি, হারিয়েছেন সব স্বপ্ন, সুখ-কল্পনাও। এমনকি জীবনটাও নয় শঙ্কামুক্ত।

রাজীব বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডের ১ নম্বর ইউনিটে চিকিৎসাধীন। গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে তাকে শমরিতা হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢামেক হাসপাতালে নেয়া হয়।

এর আগে মঙ্গলবার বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন রাজীব হোসেন। হাতটি বেরিয়েছিল সামান্য বাইরে। হঠাৎই পেছন থেকে একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে ওভারটেক করার জন্য বাঁ দিক গা ঘেঁষে ঢুকে পড়ে। দুই বাসের প্রবল চাপে রাজীবের ডান হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দু-তিনজন পথচারী দ্রুত তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও বিচ্ছিন্ন সে হাতটি রাজীবের শরীরে আর জুড়ে দিতে পারেননি। এ ঘটনায় দুবাস চালককে গ্রেপ্তার করেছে শাহবাগ থানার পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন বিআরটিসি বাসের চালক ওয়াহিদ ও স্বজন বাসের চালক খোরশেদ। শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাফর আলী দুই চালককে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

শমরিতা হাসপাতালে থাকাকালীন রাজীবের বড় খালা জাহানারা বেগমের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ওর জ্ঞান এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। মাঝে মধ্যে সে শরীর নাড়াচ্ছে। জ্ঞান এলেই বাম হাত দিয়ে ডান হাত খুঁজছে বারবার। আর শুধু মা মা করছে। আমি তার মুখের দিকে তাকাতেই পারছি না। আমি তাকে কী বলব? এটুকু বলেই অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন তিনি।

কিছুক্ষণ পর কান্নাজড়িত কণ্ঠেই জাহানারা বেগম বলেন, বাবা-মা হারানোর পর থেকে রাজীব ও তার দুই ভাইকে আমি দেখাশোনা করছি। অনেক ঘুরে ঘুরে তাকে সরকারি স্কুল-কলেজে ভর্তি করিয়েছি। তার পড়াশোনাও শেষ হয়ে আসছিল। আমি অনেক জায়গায় তাকে চাকরির জন্য দরখাস্ত করিয়েছি। কাল তার একটি ইন্টারভিউ কার্ড এসেছে। কিন্তু এখন তার হাত নেই, কীভাবে সে ইন্টারভিউ দেবে? তার দুটো ছোট ভাই আছে তাদের এখন কী হবে? এই এতিম ছেলেটিকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হতে হবে কেন?

তিনি আরো বলেন, রাজীবের চিকিৎসার খরচ জোগানোর মতো সাধ্য আমাদের নেই। মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ওষুধের দামসহ দেড় লাখ টাকা বিল হয়েছে। এর মধ্যে ওষুধের খরচ ছিল ১৫ হাজার টাকা। আমরা ৫০ হাজার টাকা দিতে পেরেছি। বাকি টাকা পরে দেব- হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে এমন আবেদন দিয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি।

রাজীবের মেজো খালা খাদিজা বেগম বলেন, একটি হাত নিয়ে রাজীব কীভাবে চলবে? সুস্থ হলে প্রধানমন্ত্রী যেন রাজীবকে একটি চাকরি দেন এমন আকুতি জানানোর পাশাপাশি সরকার ও দেশবাসীর কাছে আর্থিক সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি। রাজীবকে সহযোগিতা করতে চাইলে ০১৭০০৭৩৭৯৮ বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠানোর অনুরোধ করেন খাদিজা বেগম। এদিকে তিতুমীর কলেজের পক্ষ থেকে গতকাল রাজীবের বড় খালার হাতে ১০ হাজার টাকা তুলে দেন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. সেলিম।

শমরিতা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) মেডিকেল অফিসার ডা. মো. হোসেন জানান, রাজীবের জ্ঞান আছে, কিন্তু একটা ঘোরের মধ্য আছেন। তার সারা শরীরে ব্যথা। গতকাল বিকেলের দিকে হাসপাতালে আনার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তার অস্ত্রোপচার করা হয়। তার বাহুর নিচ থেকে পুরোটাই কাটা পড়েছে। ক্ষতগুলো ঠিক করা হয়েছে। এখন অবস্থা স্থিতিশীল। মো. হোসেন আরও বলেন, রাজীবের পরিবার জানিয়েছে এখানে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছে।

ঢামেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. সামসুজ্জামান জানান, রাজীবের আপাতত চিকিৎসা হচ্ছে ড্রেসিং ও হাই অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ। পরবর্তীতে তাকে আরো ভালোভাবে দেখে বলা যাবে তার প্লাস্টিক সার্জারি লাগবে কিনা। তবে তাকে এখনো শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না। সূত্র : ভোরের কাগজ

ad

পাঠকের মতামত