গরিবের ১১২ কোটি টাকা মেরে দিয়ে হাওয়া
ডেস্ক রিপোর্ট : সাধারণ মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কষ্টার্জিত অর্থ লুটে নিচ্ছে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলো। তারা সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্রেডিট সোসাইটি লিমিটেড (এসিসিএফসিএসএল) এই চক্রেরই একটি অপপ্রয়াস। সমকাল।
সূত্র জানায়, ১৯৯৮ সালে সরকারি প্রতিষ্ঠান সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত এই কোম্পানিটি গ্রামগঞ্জের ৫ হাজার ৮৩৩ জন নিরীহ মানুষের ১১২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আরও জানা যায়, সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধন আর চাকচিক্য অফিসের কারণে ওই কোম্পানির কর্মকর্তাদের প্রতি বিশ্বাস জন্মেছিল গরিব ও সরলমনা মানুষের। তাদের বলা হয়, টাকা জমা হলে ব্যাংকসহ যে কোনো সঞ্চয়ী প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি লাভ পাওয়া যাবে। এই বিশ্বাসেই হাজার হাজার মানুষ তাদের কষ্টার্জিত কোটি কোটি টাকা জমা করেন আজিজ কো-অপারেটিভে। কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাবে গচ্ছিত ওই টাকা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের পর উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়। প্রতারকদের অসৎ উদ্দেশ্য প্রকাশ পেলে কোম্পানির ঢাকার প্রধান কার্যালয় ও সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শাখা কার্যালয়গুলো বন্ধ করে গা-ঢাকা দেন কর্মকর্তারা।
সমবায় অধিদপ্তর সূত্র জানায়, আজিজ কো-অপারেটিভের চেয়ারম্যান এম তাজুল ইসলামসহ ৯ জন সাধারণ মানুষের ওই টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তারা পরস্পর যোগসাজশে আমানতকারীদের উচ্চহারে সুদের প্রলোভন দেখান। এভাবে সারাদেশে ৭১টি শাখার মাধ্যমে তারা ৫ হাজার ৮৩৩ জন সদস্যের কাছ থেকে সর্বমোট ১১২ কোটি ৪১ লাখ ৪৬ হাজার ২৭৮ টাকা হাতিয়ে নেন। একপর্যায়ে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য ফাঁস হলে আমানতকারীরা জমানো অর্থ ফেরত চান। তখন দেই-দিচ্ছি বলে নানা অজুহাত দেখাতে থাকেন কর্মকর্তারা। অবশেষে আমানতকারীদের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করে লাপাত্তা হন চক্রের সদস্যরা।
এদিকে জমানো অর্থ ফেরত চেয়ে আমানতকারীরা সমবায় অধিদপ্তরে আবেদন করেন। পরে অধিদপ্তর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়ে আজিজ কো-অপারেটিভের প্রতারণা ও দুর্নীতির তথ্য পায়। বন্ধ করা হয় ঢাকার প্রধান কার্যালয়সহ অন্যান্য কার্যালয়। এতে আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বিপুলসংখ্যক আমানতকারী। ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে অধিদপ্তরেরও।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আজিজ কো-অপারেটিভের প্রতারণার ফাঁদে পা দেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর, শ্রমিক, বর্গাচাষি, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ। কষ্ট করে দিনের পর দিন জমানো সেই টাকা হারিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তারা।
সমবায় অধিদপ্তর জানায়, অর্থ আত্মসাৎকারী ৯ জন হলেন আজিজ কো-অপারেটিভের চেয়ারম্যান এম তাজুল ইসলাম, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সেক্রেটারি এসএম হারুন অর রশিদ, অপসারিত সদস্য গাজী মো. বায়োজিদ, কমিটির সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, মোহাম্মদ বাহারুল আলম হাজারী, এমরান উদ্দিন পাটোয়ারী, মো. আরিফ রেজা, মো. সিরাজুল ইসলাম ও মো. হারুন-অর-রশীদ।
সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক দিদার উদ্দিন আহমদ বাদী হয়ে তাদের আসামি করে গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রমনা থানায় মামলা (নম্বর-৫২) করেন। মামলায় বলা হয়, অপরাধটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনের আওতাভুক্ত হওয়ায় সেটি তদন্তের জন্য থানা থেকে দুদকে পাঠানো হয়। দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, এমএলএম কোম্পানির প্রতারণার শিকার হয়ে দেশের সাধারণ মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে। সমবায় অধিদপ্তর বা সরকারের অন্য কোনো সংস্থা থেকে ওইসব কোম্পানির নিবন্ধন দেওয়ার আগে এর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের সম্পর্কে যাচাই করতে হবে। প্রাথমিক তদন্ত করে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে হবে। দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণার ফাঁদ পাতা হচ্ছে- এমন উদ্দেশ্য পরিলক্ষিত হলে নিবন্ধন দেওয়া যাবে না। আজিজ কো-অপারেটিভের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণার ফাঁদ থেকে জনগণকে রক্ষা করতে পারে সংশ্নিষ্ট নিবন্ধনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোই।
জানা যায়, আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্রেডিট সোসাইটি লিমিটেড সমবায় অধিদপ্তর থেকে প্রাথমিক নিবন্ধন নেয় ১৯৯৮ সালের ১৩ নভেম্বর। সর্বশেষ নিবন্ধন নেওয়া হয় ২০১২ সালের ৮ আগস্ট। ঢাকার ৪৫ বিজয় নগরের সায়হাম স্কাইভিউ টাওয়ারের পঞ্চম তলায় এর প্রধান কার্যালয় খোলা হয়। বর্তমানে এই কার্যালয়টি বন্ধ রয়েছে।
মামলা করছে দুদক :পূবালী ব্যাংকের দুটি হিসাব এবং সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) একটি হিসাবে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা জমা ও উত্তোলন করে আত্মসাতের অভিযোগে আজিজ কো-অপারেটিভের চেয়ারম্যান এম তাজুল ইসলামসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক। অন্য দুই আসামি হলেন তাজুল ইসলামের ছেলে সাজ্জাদুল ইসলাম তানভীর ও কোম্পানির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির চৌধুরী। দুদকের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী বাদী হয়ে শিগগির মামলাটি দায়ের করবেন।
দুদক সূত্র জানায়, পূবালী ব্যাংকের নয়াপল্টন শাখার একটি হিসাব, একই ব্যাংকের প্রিন্সিপাল (ইসলামিক) শাখার আরেকটি হিসাব ও এসআইবিলের প্রিন্সিপাল শাখার অন্য একটি হিসাব থেকে ২০১৬ সালের ৩০ মে থেকে ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ২ কোটি ১২ লাখ টাকা জমা ও উত্তোলন করে স্থানান্তর করা হয়, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দুদক আরও জানায়, আজিজ কো-অপারেটিভের হিসাব থেকে কোম্পানির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের মালিকানাধীন সাউদি বাংলা প্রপার্টিজ লিমিটেডের হিসাবে লাখ লাখ টাকা স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ছেলে সাজ্জাদুল ইসলাম তানভীরের নামেও লাখ লাখ টাকার চেক ইস্যু করা হয়। পরে তানভীরের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়।




