284074

বেঁচে ফিরেছি বিশ্বাস হচ্ছে না

নিউজ ডেস্ক।। চোখ মেলে সূর্যের আলো দেখে আঁতকে ওঠি। এ কি? আমি বেঁচে আছি। না আমার তো বেঁচে থাকার কথা নয়। ভবনে আমার চোখের সামনে দেখেছি অনেকের জীবন প্রদীপ নিভে যেতে। আমারও দম বন্ধ হয়ে আসছে। দোয়া দরুদ পড়তে থাকি। এরপর আর কিছু মনে নেই। কিন্তু যখন সংজ্ঞা ফিরে পাই, চোখ মেলে দেখি উপরে আকাশ। মানুষের চিৎকার। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এও কি সম্ভব? মৃত মানুষ কি জীবন ফিরে পায়? আমিতো মরে গেছি। এখন এসব কি দেখছি? বিষয়টি বুঝতে বুঝতে আমার খানিক সময় লাগে। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করি। আমার জীবনে এটা যেন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। কিন্তু আমি বেঁচে ফিরেছি ঠিকই। আমার চোখের সামনে যারা মারা গেছেন তাদের কথা ভুলি কি করে? আমার মতো ওরাওতো বাঁচার জন্য কত আকুতি করেছে। এখানে সেখানে ফোন করেছে। মৃত্যুর আগেও একজন তার স্বজনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে।

কথাগুলো বলছিলেন এফআর টাওয়ার থেকে বেঁচে ফেরা সোহাগ মোল্লা। বয়স বিশ বছর। সোহাগ ভবনের ১১তলায় ডার্ড গ্রুপে পিয়নের চাকরি করেন। এ প্রতিষ্ঠানে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ ১০ থেকে ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন। ওই সময়ের কথা বলতে গিয়ে সোহাগ কেঁদে ফেলেন। বলেন, চারদিকে ধোঁয়া আর ধোঁয়া। এমন ধোঁয়া যে নিজের হাতটি পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম না। নিশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে সবাই শুধু দোয়া দরুদ পড়ছিলাম।

সোহাগ বলেন, বেলা বারোটার দিকে বিদ্যুৎ চলে যায়। তখনই মনে হয় বিদ্যুৎ গেলো কেন? এখানে আমি একবছর ধরে চাকরি করি। কিন্তু কখনো দুপুর বেলা বিদ্যুৎ যায়নি। তখনই আমি অফিসের দরজা খুলি। দেখি বাতাসের গতিতে ধোঁয়া এসে পুরো রুম ঢেকে দেয়। কিন্তু এর মধ্যেই অন্যান্য ফ্লোরের মানুষজন উপরে উঠছিল। কেউ কেউ সিঁড়িতে বসে শার্ট খুলে নাক চাপা দিয়ে বসেছিল। সবই এগারো তলায়। আমাদের অফিসের কেউ উপরের ফ্লোরে উঠতে পারছিল না। কারণ ধোঁয়ার কারণে নিজের হাতটি পর্যন্ত দেখা যায়নি। সবাই টেনশন করছিলেন কিভাবে এখান থেকে বের হওয়া যায়। কিন্তু বের হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তারপরও আমরা জানালার পাশে গিয়ে সিগনাল দিয়েছি অনেকবার। মনে হচ্ছিল এটাই আমাদের জীবনের শেষ দিন। অফিসের কেউ কেউ ধোঁয়ায় সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। আবার কাউকে দেখেছি ছটফট করতে করতে এক সময় নিস্তেজ হয়ে গেছে। তখন সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলাম। কারণ তাদেরকে আমরা কোনো ভাবেই সাহায্য করতে পারছিলাম না।

সোহাগ মোল্লার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। জীবনে কখনো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে কল্পনাও করেননি তিনি। বলেন, এক সময় দোয়া দরুদ পড়ে আল্লার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে নিই। তারপর আর কিছুই মনে নেই। যখন সংজ্ঞা ফেরে নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করি। এফআর টাওয়ার থেকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে তাকে নিয়ে আসা হয় বেলা সাড়ে তিনটায়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকতে হয় তাকে।

সোহাগ মোল্লা বলেন, আমরা একবার চেষ্টা করেছিলাম নিচের দিকে যাওয়ার। কিন্তু নিচে প্রচণ্ড আগুনের তাপ। পা ঝলসে যাওয়ার মতো অবস্থা। আবার উপরে ধোঁয়ার কারণে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। পুরো ভবনে শুধু কান্নার শব্দ। কেউ দোয়া পড়ছে, কেউ ফায়ার সার্ভিসের লোকদের ডাকছে। এক সময় ধোঁয়া সহ্য করতে না পেরে অফিসের চেয়ার দিয়ে গ্লাস গুলো ভেঙ্গে দেই। তারপও ধোঁয়া বিন্দুমাত্র কমেনি। মনে হচ্ছিল আরো ধোঁয়া বাড়ছে। গ্লাস ভাঙতে গিয়ে আমাদের অনেকের হাত কেটে গেছে। যখন ধোঁয়া কমছিল না, নিচে থেকেও তাপ আসছিল তখন আমরা রুমে বসে অফিসের তোয়ালে ভিজিয়ে চোখে দিয়ে রাখি যেন ধোঁয়া কম লাগে। অফিসে আমাদের তুলনায় আরো বেশি অসুস্থ হয়ে যায় আমাদের ম্যাডামরা। পরে শুনেছি ফায়ার সার্ভিসের লোকজন আমাদের উদ্ধার করে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন না এলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত। আমাকে উদ্ধারের পর নিচে নামানো হলে লোকজন আমার চোখে মুখে পানি দেয়। এক সময় সংজ্ঞা ফিরে পাই। দেখি উপরে আকাশ। মানুষের আহাজারি। এরপর দ্রুত আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সোহাগ বলেন, মৃত্যুকে সামনে রেখে এত টেনশনের মধ্যেও বাবা মায়ের কথা মনে পড়ছিল। বাবা মায়ের সঙ্গে কাটানো ভালো সময়গুলোর কথা মনে পড়ছিল। ভাবছিলাম যদি মরে যাই বাবা মাকে কে দেখবে। আমি তো তাদের একমাত্র সন্তান। বাবা এখনো ভ্যান চালিয়ে সংসার চালায়। আমি তো তাদের জন্য কিছু করতে পারিনি।

এ অবস্থায় বাবা ফোন দিয়েছিল। তার সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে। এর দশ মিনিট পর যখন বাবা মায়ের কথা আবার মনে পড়লো তখন ফোন দিতে গিয়ে ফোনটা খোঁজে পাইনি। কখন যে ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেছে, বুঝতেও পারিনি। হাসপাতালে সোহাগ মোল্লার পাশেই বসা তার বাবা সোহরাব মোল্লা। তিনি বলেন, টিভিতে যখন দেখতে পাই বনানীর বিল্ডিংয়ে আগুন লেগেছে। তখনই সোহাগকে ফোন দেই। কথাও হয়েছিল তার সঙ্গে। কিন্তু পরে যখন আবার ফোন দেই তখন কল হচ্ছিল কিন্তু কেউ ধরছে না। তখন ভয়টা আরো বেশি লাগছিল। বিল্ডিংয়ের পাশে গিয়ে মোনাজাত ধরে দোয়া করছিলাম আমার ছেলেটাকে যেন উপরওয়ালা ফিরিয়ে দেয়। উপরওয়ালা আমার ডাক শুনেছে। বরগুনার বাসিন্দা সোহাগ মোল্লা তার পরিবার নিয়ে কড়াইল বস্তি এলাকায় থাকেন।

ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছি: কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। অন্ধকার আর অন্ধকার। বারবার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তবুও বেঁচে থাকার লড়াই। টানা তিন ঘণ্টা একই অবস্থায়। বাইরের গ্লাস ভেঙে হাত নাড়িয়ে ইশারা না দিলে হয়তো আগুনেই পুড়ে মরতে হতো বনানী এফআর টাওয়ারের ডার্ড গ্রুপের কর্মীদের। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে আসাদের মধ্যে হাসান নামের একজন এমনটাই জানালেন।  গতকাল রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রতিষ্ঠানটির পিওন হাসান জানান ওই ভয়ঙ্কর মুহূর্তের কথা। তিনি বলেন, ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছি। আগুনের ভয়াবহ অবস্থার কথা শুধু শুনেছি। কাছ থেকে এভাবে দেখিনি। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে এলাম ।

বনানীর এফআর টাওয়ারের ওই আগুনের ঘটনার কথা শুরুর দিকে বুঝতেই পারেননি ডার্ড গ্রুপে কর্মকর্তারা। শুধু ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছিলেন। বেলা ১২টা ৫০ মিনিটে লাগা ওই আগুনের ধোঁয়া যখন একটু একটু করে তাদের অফিসের ভেতরে আসা শুরু করছিল তখনই বুঝতে পারলেন কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। হাসান বলেন, অফিসের ভেতরে প্রথমে টের পাইনি। আমরা ৩০ জনের মতো অফিসেই ছিলাম। স্যার ম্যাডামরা সবাই কাজ করছিলেন। কিছুক্ষণ পর বাইরে গিয়ে দেখি ধোঁয়া। একদম অন্ধকার। তারপরও বুঝিনি। মনে করেছি এমনিই ধোঁয়া। পরে যখন দেখলাম তখন মনে হলো আগুন।

ঠিক ওই সময়ই আতঙ্ক ঢুকে যায় সবার ভেতর। ১২ তলার উপর থেকে নিচেও নামা যাচ্ছে না। উপরের দিকেও যাওয়ার পরিস্থিতি ছিল না। বেঁচে যাওয়া হাসান বলেন, ওই সময় ১২ তলার ওপর। আমরা উপরেও যেতে পারছিলাম না। নিচেও যেতে পারছিলাম না। ১২ তলার সবাই আটকা পড়ে গেছি। কেউ বের হতে পারিনি। আস্তে আস্তে দেখি ধোঁয়া আরো বাড়ছে। ধোঁয়া বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। অফিসের রাস্তার পাশের গ্লাস ছিল। সেগুলো চেয়ার দিয়ে ভেঙে ফেলি। যাতে ধোঁয়া বের হয়ে যায়। তাতেও কোনো কাজ হচ্ছিল না। সময় যত যাচ্ছিল ততই দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ধোঁয়া নাকে যাতে না যেতে পারে তার জন্য কিছু খুঁজছিলাম। কাছে কিছু না পেয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলাম। ওখানে কয়েকটা তোয়ালে ছিল। সেগুলো নিয়ে এসে নাকে মুখে চেপে ধরেছি। সেগুলো ভিজিয়ে চোখ মুখ বারবার মুছেছি। কিছুতেই শ্বাসকষ্ট কমছিল না।

এভাবে অনেকক্ষণ নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। একই জায়গার মধ্যে টানা তিন ঘণ্টা বাঁচার জন্য লড়াই করে গেছেন বলে জানিয়ে হাসান আরো বলেন, ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ১২ তলার উপর ৩০ জন মানুষ এভাবে লড়াই করেছি। বিকাল তিনটা থেকে আমরা ভাঙা গ্লাস দিয়ে নিচের দিকে হাত নাড়িয়ে ইশারা দিই। আমাদের সঙ্গে একজন প্রেগন্যান্ট নারী ছিলেন। আপার নামটা ভুলে গেছি। তার অনেক কষ্ট হয়েছে। তাকে নিয়ে আমরা কয়েকজন বেশি চিন্তায় ছিলাম। এ সময় সবাই বাঁচার জন্য নিচের দিকে বার বার হাত নাড়িয়ে ইশারা দিচ্ছি। অনেকক্ষণ ইশারা দেয়ার পর সাড়ে তিনটার দিকে একটা ক্রেন উপরের দিকে এলো। তখন আগে আমাদের সঙ্গে থাকা মহিলাদের নামার ব্যবস্থা করি। একটা ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে ছিলাম। একটা ফ্লোরে যে কয়জন ছিল সবার মধ্যে আতঙ্ক ছিল। এই আতঙ্ক যেন ভর করছিল আরো বেশি। হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছিল হাসানের জীবনের অধ্যায়। আল্লাহকে ডাকছিলেন তিনি ও তার সহকর্মীরা। সবাই ভেবেই নিয়েছিলেন আর হয়তো স্বজনদের কাছে ফিরে যাওয়া হবে না। এর মধ্যে কেউ কেউ সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন।

হাসান বলেন, মনে হচ্ছিল না আর বাবা মায়ের কাছে ফিরতে পারবো। দুই দফায় ম্যাডাম আর বয়স্ক স্টাফ যারা ছিল তাদের নামানোর ব্যবস্থা করলাম। শেষ বার এসে আমি সহ বাকিদের নামিয়েছে। তখন পর্যন্ত আমার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। ধোঁয়ায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। চারদিক তখন আরো অন্ধকার হয়ে পড়ে। কাউকে কেউ দেখার উপায় ছিল না। ভয় তখনই বেশি পেয়েছিলাম। ক্রেন যখন আমাদের নামাচ্ছিল তখন কি হয়েছিল জানি না। আমার হাতে খুব সম্ভবত ভাঙা গ্লাস লেগে কেটে গেছে। ভেতরের হাড় কেটে যায়। বিকাল চারটার পর কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে আসে আমাদের। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন যেভাবে ১২তলা থেকে এক এক করে নামালো আমি দেখে অবাক। এত উপর থেকে নামতে পারবো ভাবতেই পারিনি। বলতে পারেন ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছি।

যেভাবে মৃত্যুর কবল থেকে ফিরেছেন তারা : এফ আর টাওয়ারের ১৩ তলায় নিজের অফিসে কাজ করছিলেন সেঁজুতি দৌলা। হঠাৎ ‘আগুন, আগুন’ বলে চিৎকার। নিচে নামার চেষ্টা করেন তিনি। অফিস কক্ষ থেকে জরুরি সিঁড়ির দিয়ে নামতে চেষ্টা করেন। ধোঁয়ার কারণে এগুতে পারছিলেন না। অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস কষ্ট হচ্ছিল। চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। ততক্ষণে আগুন ছড়িয়ে গেছে। তাপ বাড়ছে। মানুষ কান্না করছে। ‘আল্লাহ আল্লাহ’ করছেন অনেকেই। এর মধ্যেই সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত ওপরে উঠেন সেঁজুতি ও তার সহকর্মীরা।

সেঁজুতি কাঁদছিলেন। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেই কালিমা পড়ছিলেন। গতকাল ডার্ড গ্রুপের পরিচালক সেঁজুতি দৌলার সঙ্গে কথা হয় এফ আর টাওয়ারের পাশে। তিনি জানান, ছাদে যাওয়ার সময় সিঁড়ি ব্যবহার করতে গিয়ে দেখেন ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে চারপাশ। তার সঙ্গে বেশ কয়েক সহকর্মী। সবার চোখ জ্বালাপোড়া করছে। জীবন বাঁচাতে শেষ চেষ্টা করছেন তারা। নাক, মুখ ঢেকে ছাদে উঠেন। তারপর ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পাশের আহমেদ টাওয়ারের ছাদে যেতে সক্ষম হন তিনি। তখন সোয়া ১টা প্রায়। সেখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামেন সেঁজুতি। নিচে নেমে নিজের অফিসের সহকর্মীদের জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি। সেঁজুতি জানান, প্রায় তিনশ’ সহকর্মী ছিলেন সেদিন। শুরুতে অনেকেই ভবন থেকে বের হতে পারেননি। অনেককে ফায়ার সার্ভিস ল্যাডার দিয়ে উদ্ধার করেছে। তবে তার অফিসের প্রায় সবাই নিরাপদে বের হতে পেরেছেন। বের হতে গিয়ে ১৫-১৬ জন আহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

এফ আর টাওয়ারের ১৮ তলায় ‘আমরা নেটওয়ার্কস’র অফিস। ওই অফিসে কর্মরত মোহাম্মদ নোমান জানান, বৃহস্পতিবার অগ্নিকাণ্ডের সময় অফিসে প্রায় ৫০ জন ছিলেন। হঠাৎ ‘আগুন আগুন’ শব্দ শুনে অফিসের সবাই বাইরে বের হন। কিন্তু ততক্ষণে ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। মনে হলো বের হলে ধোঁয়াতেই মারা যাবেন তারা। এদিকে, সময়ের সঙ্গে বাড়ছিল আগুনের লেলিহান শিখা। পুড়ছিল অফিসের আসবাবপত্র। মনে হচ্ছিল, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সব পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত বাথরুমের জানালা ভেঙে বাঁচার আশা পান তারা। বাথরুম থেকে আহমেদ টাওয়ারে ঢোকার সুযোগ রয়েছে। জানালা ভাঙার পর ওই পথ দিয়ে আহমেদ টাওয়ারে চলে যান। এভাবেই রক্ষা পান তারা। তারপরও তাদের অন্তত পাঁচ সহকর্মী আহত হন বলে জানান নোমান।

আট তলায় ছিল বায়িং হাউজ ‘এআই ফেইব’। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সৈয়দ নুরে আলম সিদ্দিকী জানান, মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার সহকর্মী তিনজন মারা গেছেন এই ভয়াবহ আগুনে। সেদিন অফিসে ছিলেন প্রায় ৩০ জন। নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, চারপাশে আগুন আর আগুন। নিচে নামার কোনো সুযোগ ছিল না। তাই প্রায় সবাই উপরে উঠে যান। ভবনের ছাদ থেকে পাশের আহমেদ টাওয়ারে লাফিয়ে যান তারা। তবে রুম থেকে বের হতে গিয়ে ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা গেছেন তিনজন। তারা হচ্ছেন- ওই প্রতিষ্ঠানের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রেজাউল করিম, ট্রান্সফার কর্মকর্তা আহমেদ জাফর ও অ্যাকাউন্টেট সালাহ উদ্দিন।  অগ্নিকাণ্ডের পর জীবন নিয়ে ফেরা ব্যক্তিরা জানান- ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রতিটি বহুতল ভবনে ফায়ার এলার্মসহ প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে এভাবে এতো মানুষ মারা যেতো না। এজন্য সবাইকে সচেতনভাবে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তারা।

পাশের ভবন দিয়ে বেঁচে ফেরেন তারা: আরফানুল ইসলাম। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। চার বছর ধরে কাজ করেন ডার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপে। বনানীতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এফআর টাওয়ারের ১৬তলায় তার অফিস। ভবনে যখন আগুন লাগে তখন তিনি ছিলেন ওয়াশরুমে। এ সময় তার হাতের ফোনটি পানিতে পড়ে যায়। তিনি ফোনটি তুলে টিস্যু দিয়ে মুছে তারপর বের হন। এ কারণে আগুন লাগার পরেও তার ৪ থেকে ৫ মিনিট দেরি হয়। তিনি বের হয়ে তার ফ্লোরে কোনো সহকর্মীকে না দেখে দিকভ্রান্ত হয়ে যান। এ সময় ধোঁয়ার কুণ্ডলিও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় দ্রুত তিনি সিদ্ধান্ত নেন আগুন কোথায় লেগেছে তা জানার। যখন বুঝতে পারেন তাদের বিল্ডিংয়েই এবং নিচের ফ্লোরে আগুন লেগেছে তখন তিনি ছাদে উঠার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় সিঁড়ির ফাঁকা স্থান থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করে। সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠার সময় দু’জনকে পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে জানেন না আরফান। এফআর টাওয়ারে ৫টি ফ্লোরে রয়েছে ডার্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অফিস। বিল্ডিংয়ের ২, ১২, ১৩, ১৬ ও ১৯ নম্বর ফ্লোর তাদের। তাদের অফিসের সবগুলো ফ্লোর মিলে কর্মকর্তা-কর্মচারী ৩০০ জনের উপরে। আরফানুলের সঙ্গে গতকাল দুপুরে বনানীর আহমেদ টাওয়ারের সামনে কথা হয়। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি কান্নায় মুষড়ে পড়েন।

আরফান বলেন, আমি ছাদে উঠে দেখি সেখানে আরো ৫০ থেকে ৬০ জন । এ সয়ম ছাদে আগুনের তাপ আসতে থাকে। দেখি পার্শ্ববর্তী আহমদ টাওয়ারের গ্রিল খোলা। ওদের ভবন আরো দুই তলা উচু। ওই ভবনের লোকজন তাদের বাঁচতে সহযোগিতা করেন বলে তিনি জানান। তিনি যান আহমদ টাওয়ারে আর কিছু লোক আউয়াল টাওয়ারের ছাদ দিয়ে নিচে নামেন। তিনি যখন আহমদ টাওয়ারের সিঁড়িতে তখন ঘড়িতে সময় ১২টা ৫৭। বলেন মাত্র ৫ থেকে ৭ মিনিটে এটা ঘটে গেছে। এরপরে নিচে নেমে আসেন। তার ইনজুরি মারাত্মক না হওয়ায় হাসপাতালে সামান্য চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেন। গতকাল ভবন দেখতে এসেছেন ।

মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা আর একজন হলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি ভবনের ১৭তলায় অবস্থিত আমরাই নেটওয়ার্কের অফিসের এডমিন বিভাগে কাজ করেন। সাত বছর ধরে এই অফিসেই কাজ করেন। জীবনে বেঁচে যাওয়া মামুন গতকাল এ গ্রুপের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিজেদের অফিস দেখতে এসেছেন। তার সঙ্গে যখন কথা হয় তখন ভবনে ওঠার জন্য মামুন প্রস্তুতি নিতে থাকেন। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পেলেই তাদের অফিসের আরো অনেকের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে উঠবেন। এ বিল্ডিংয়ে আমরাই নেটওয়ার্কের ৫, ৯, ১৭ ও ১৮ নম্বর ফ্লোর। এরমধ্যে ৯মতলা আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়েছে।

মামুন বলেন, আগুন টের পেয়ে আমি নিচে না নেমে উপরে উঠি। ছাদে গিয়ে দেখি গ্রিল। আরো অনেকের সঙ্গে আমিও গ্রিল কাটি। এরপরে আবার আহমদ টাওয়ারের গ্রিল কাটি। এরপরে একে একে সবাই নেমে যাই। আমি যখন ছাদে উঠি তখন আরো তিন শতাধিক লোক ছাদের উপরে দেখতে পাই। যারা পাশের বিল্ডিং থেকে নেমে যায়। তাদের অফিসের ২৫ জন আহত হয়েছে। তাদের অধিকাংশ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরে গেছেন। ৮ জন এখনো হাসপাতালে ভর্তি চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান মামুন।

আগুনের ভয়ঙ্কর থাবা থেকে নিজে বেঁচে গেলেও আরেক ব্যক্তিকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছেন মুন্সীগঞ্জের হাসিবুর রহমান। তিনি এফআর টাওয়ারের প্রথম তলায় স্যামস্যাং মোবাইলের শো-রুমে বিক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন। তিনি এবং তার দুই সহকর্মী আগুন লাগার শুরুতেই ভবন থেকে বের হয়ে যান। এ সময় উপর থেকে এক ব্যক্তিকে পড়ে যেতে দেখেন চোখের সামনে। হাসিব বলেন, আমি উপর থেকে এক ব্যক্তিকে ফুটপাথের উপর পড়ে যেতে দেখি। দৌড়ে তাকে বাঁচাতে যাই। এ সময় উপর থেকে পোড়া গ্লাস পড়ে আমার হাতের একাংশ পুড়ে যায়। কিন্তু ওই লোকটিকে তারপরেও তুলে নিয়ে আসি। কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন ছিল না। তিনি জায়গায় চোখের সামনে থেঁতলে যান। কিছুই করতে পারিনি। এ সময় পোড়া হাত নিয়ে আর পারছিলাম না পড়ে চিকিৎসা নিতে চলে যাই।

পাঁচ মিনিটের জন্য বেঁচে যান ইউরো গ্রুপের রাফিউল ইসলাম মারুফ। রাস্তায় জ্যাম থাকায় অফিসে আসতে একটু দেরি হয়। অফিসের সামনে আসতেই দেখেন আগুন। গ্লাসের ফাঁক দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এ সময় তার সহকর্মীরা ফোনে বাঁচার জন্য বারবার আকুতি জানান। এ সময় তিনি তাদেরকে গ্লাস ভেঙে ফেলতে বলেন। মারুফ জানান, আমার পাঁচ জন সহকর্মী আগুনে নিহত হয়েছেন। আগুন লাগার পরেও তাদের দু’জনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। মারুফ ইউরো গ্রুপের এয়ার ডিভিশনের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ২২ বছর ধরে একই কোম্পানিতে কাজ করেন। তিনি বলেন, আগুন লাগার ৫ মিনিটের মাথায় আমি অফিসের সামনে চলে আসি। আল্লাহ আমাকে ৫ মিনিটের জন্য রক্ষা করেছেন তবে আমার পাঁচ জন সহকর্মী চলে গেছেন। এ কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, আমি ভবনের সামনে থেকে কয়েকজনকে ফোন দেই। সবাইকে পাই না। তবে এরমধ্যে রাব্বি ও ফারুককে ফোনে পেয়ে গ্লাস ভাঙতে বলি। তবে ওরা সবাই তা পারেনি। তিনি বলেন, আমি ভোর রাত ৪টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলের মর্গে চার জনকে খুঁজে পেয়েছি। এরমধ্যে আবদুল্লাহ আল ফারুক এয়ারফেট ডিপার্টমেন্টে সেলস দেখতো, ফজলে রাব্বি ছিল এয়ার মার্কেটিং। আর ইফতেখার হোসেন মিঠু কাজ করতো এয়ার অ্যাকাউন্টস হিসেবে। তারা সবাই আমার বিভাগে কাজ করতো বলে অফিসের সময় আমার কাছেই থাকতো। আর আমি প্রধান হিসেবে ছিলাম ওদের বড় ভাই।

এ ছাড়া শেখ জেরিন ছিল আমাদের রিসিপশনে আর অনুপম দেবনাথ কাজ করতো এইচআরে। তবে অফিসের সবার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। সবার সঙ্গে দেখা হতো। তিনি আবদুল্লাহ আল ফারুকের কথা বলে বারবার কান্না করছিলেন। বলেন, আবদুল্লাহর দুইটি ছোট ছোট সন্তান। ছোট বাচ্চাটির নাম আমার বাচ্চার নামেই। মাহান। ওদের কথা ভাবতেও পারছি না। কিভাবে ওরা বড় হবে। বৃহস্পতিবার সকালেও বাবাকে ওরা কিভাবে বিদায় দিয়েছিল। এ ছাড়া জেরিন মেয়েটিও ছিল অনেক ভদ্র। জেরিন রিসিপশনে কাজ করলেও সবার সঙ্গে হাসিখুশিভাবে কথা বলতো। মারুফ জানান, ঢামেকের মর্গে রাতেই চার জনের লাশ পাওয়া যায়। কারো চেহারা বিন্দুমাত্র কিছু হয়নি। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যান। মনে হয়েছে যেন তারা সবাই ঘুমিয়ে রয়েছেন। এ ছাড়া যারা আহত তাদের মধ্যে অনেকের হাত-পা পুড়ে গেছে। তারা নামতে গিয়ে আহত হয়। যাদের পায়ে স্যান্ডেল ছিল ওদের বেশিই ইনজুরি হয়েছে। এ ছাড়া যাদের পায়ে সু ছিল ওদের তুলনামূলক কম হয়েছে। উৎস: মানবজমিন।

ad

পাঠকের মতামত