283662

‘তার বেয়ে নিচে নামতে গিয়ে আমার পরিচিত মুনিরসহ দুজনকে চোখের সামনেই নিচে পড়ে যেতে দেখেছি’

নিউজ ডেস্ক।। এফআর টাওয়ারে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ার পর দিগিবদিক ছোটাছুটি করছিল ভবনে আটকে পড়া লোকজন। এর মধ্যে এগারোতলা থেকে হঠাৎ ইন্টারনেটের তার বেয়ে নামতে শুরু করেন এক যুবক। তারে ঝুলে পাশের জানালার গ্রিল ধরে নিচে নামার প্রাণান্ত চেষ্টায় এই যুবককে অনুসরণ করে আরো চারজন। প্রথম দুজন নিচে নেমে আসতে পারলেও দশতলা থেকে পড়ে যায় বাকি দুজন। এরপর একই ইন্টারনেট তারে ঝুলতে গিয়ে ছিঁড়ে নিচে পড়ে আরেকজন। এভাবেই আটকে পড়া লোকজন প্রাণ বাঁচাতে এফআর টাওয়ার থেকে বের হয়ে আসার প্রাণান্ত চেষ্টা করছিল। কয়েকজনকে লাফিয়ে পড়তেও দেখেন কালের কণ্ঠ’র এই প্রতিবেদক।

ইন্টারনেটের তার বেয়ে নিচে নামতে সমর্থ হওয়া প্রথম যুবকের নাম মো. বেলাল। হেরিটেজ এয়ার নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করা ঠাকুরগাঁওয়ের এই যুবক বলেন, ‘মৃত্যুর মুখ থেকে নেমে এসেছি। এগারোতলা থেকে তার ও গ্রিল বেয়ে নিচে নেমে আসতে পেরেছি—এখন এটা বিশ্বাস হচ্ছে না। তার বেয়ে নিচে নামতে গিয়ে আমার পরিচিত মুনিরসহ দুজনকে চোখের সামনেই নিচে পড়ে যেতে দেখেছি।’

ভবনের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে বেলাল বলেন, ‘ভেতরে তাপ বাড়তে থাকায় লোকজনকে বাঁচার জন্য এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে দেখেছি। কোনো বিকল্প না দেখে তার বেয়ে নিচে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।’ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বনানীর ১৭ নম্বর সড়কের এই বহুতল ভবনে আগুন লাগে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হওয়া বা ওই মৃত্যুপুরী থেকে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচার ক্ষীণ চেষ্টা—এ দুটির যেকোনো একটি বেছে নিতে হয়েছিল ভবনে আটকে পড়া বেশ কয়েকজনকে।

ভবনের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে যাওয়ায় বারবার কাগজ ও কাপড় ফেলে উদ্ধারের তীব্র আকুতি জানাচ্ছিল ভবনের বিভিন্ন তলায় আটকে পড়া লোকজন। উদ্ধারকর্মীদের সাড়া না পেয়ে ভবনের ভেতরেই দিগিবদিক ছোটাছুটি করেছে অনেকে। উদ্ধারকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কেউ কেউ লাথি দিয়ে ভেঙেছে ভবনের কাচ। উত্তাপ বাড়তে থাকায় কোনো বিকল্প না দেখে দশ ও এগারোতলা থেকে ইন্টারনেটের তার বেয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেছে বেশ কয়েকজন। যমদূতের সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনজন জয়ী হলেও ব্যর্থ হয়েছে দুজন। দৌড়ে এসে ঝাঁপ দিতেও দেখা গেছে একজনকে। ভবনের ভেতর থেকে আগুনের ভয়াবহতা বর্ণনা করে মোবাইল ফোনে স্বজনদের কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছে কেউ কেউ। আগুনের ভয়াবহতা দেখে আটকে পড়াদের স্বজন এবং সাধারণ মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকার পরিবেশ।

ভবনের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা লোকজন জানিয়েছে, এফআর টাওয়ারের ছয়, সাত ও আটতলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুনের উত্তাপ ছড়িয়েছিল পুরো ভবনে। ওপরে ওঠার সিঁড়িতেও ছিল ধোঁয়া। ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে অনেকেই ওপরের তলায় উঠে জানিয়েছে বাঁচার আকুতি। লেডার দিয়ে ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে লোকজনকে উদ্ধার করছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ভবনের ওপরের দিকের অন্য তলার লোকজন উঠে গিয়েছিল ছাদে। এসব অসহায় মানুষের শেষ ভরসা ছিলেন উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু পুরো ভবন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ায় লেডার দিয়ে আটকে পড়াদের নিচে নামিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছিলেন উদ্ধারকর্মীরা।

ভবনটিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে কর্মরতদের খোঁজ নিতে বনানীতে ছুটে আসে অনেকেই। স্বজনের খোঁজ না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে তারা। মোবাইল নম্বর বন্ধ পেয়ে হাতপাতালে ছুটে যায় অনেকে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাজমা আক্তার নামের এক নারী বলেন, ‘আমার ভাই রিপন ও আরিফের অফিস তেরতলায়। দশ মিনিট আগেও (দুপুর ২টা ৩০ মিনিট) মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে। কিন্তু এখন ফোন বন্ধ পাচ্ছি।’

আটকে পড়া লোকদের বাঁচার আকুতি দেখে নিচে থেকে চিৎকার করছিল হাজারো মানুষ। ভবন থেকে ঝাঁপ দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া অনেককে বারণ করা হয় নিচ থেকে। কাগজ-কাপড় বা আটকে পড়াদের হাত দেখামাত্র উদ্ধারকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তারা। ফায়ার সার্ভিসের কাজে সহযোগিতাও করেছে সাধারণ মানুষ। তবে জনতার ভিড়ের কারণে বেশ বিপত্তিতেও পড়েন উদ্ধারকর্মীরা। উৎস: কালের কণ্ঠ।

ad

পাঠকের মতামত