275355

মালয়েশিয়ায় অবৈধ প্রবাসীদের বিরুদ্ধে যে কারনে কঠোর হয়েছে দেশটির পুলিশ

ডেস্ক রিপোর্ট।। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় বিদেশী নাগরিকদের অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় অবৈধভাবে বসবাসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছে ইমিগ্রেশন ও পুলিশ। একের পর এক সাড়াশি অভিযানে গ্রেফতার হচ্ছে অবৈধ প্রবাসী। অপরদিকে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের প্রবাসী কমিউনিটি বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন। জানা গেছে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এলেও ভাগ্য বদলানোর আশায় অনেকেই থেকে যাচ্ছে অনির্দিষ্টকালের আশায় অবৈধ হয়ে।

আবার অনেকেই রাতারাতি কোটিপতি হতে বেছে নিচ্ছে অবৈধ কর্মকান্ড। দালালী, বাটপারি, প্রতারণা, নকল পাসপোর্ট, ভিসা, বিভিন্ন ডোকোমেন্ট, ডাকাতি, কিডন্যাপ, জিম্মি, হত্যাসহ নানান ভয়ংকর অপরাধ। ইদানিং নারী পাচার করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্যকরার বেশ কয়েকটি ঘটনায় নারীদের উদ্ধার করেছে মালয়েশিয়া পুলিশ ও ইমিগ্রেশন।

যত অভিযান ও গ্রেফতার হচ্ছে, ততই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে এসব মুখোশধারী কিছু বাংলাদেশি। এর সাথে বাংলাদেশের সরকার বিরোধী চক্রের নানান অপপ্রচার রয়েছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকরা মালয়েশিয়ায় মর্যাদার সংকটে আছে বলে অনেকেই দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একদিকে যেমন ক্ষুন্ন হচ্ছে বাংলাদেশের মান, তেমনি সংকুচিত হচ্ছে শ্রমবাজার। এজন্য দুশ্চিন্তায় আছেন শ্রমবাজারে বিনিয়োগ করা বাংলাদেশি ও চাইনিজ এজেন্টরা।

এক মালয় তরুনীর মুখে ছুড়িকাঘাত করে ২০ বছরের শাস্তি পেয়েছে এক বাংলাদেশি যুবক। এই ঘটনাটি বংলাদেশি প্রবাসীদের উপর অনাস্থা ও অবিশ্বাস এনেছে স্থানীয় মালয়দের মধ্যে। অপরদিকে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে শ্রমিক নিয়োগের বিষয়টি মালয়েশিয়া সরকার। তাই নেপালের সাথে চুক্তি, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে নতুন মাত্রা যোগ করলেও বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগের কোন সিদ্ধান্ত এখনও দেয় নি মালয়েশিয়া সরকার।

এ সুযোগে আদম ব্যবসায়ীদের নানামুখী অপতৎপরতায় আবারও শংকিত মালয়েশিয়া সরকার। উল্লেখ্য ২০০৬ সালের অমানবিক পরিস্থিতি, ২০১৫ সালের আন্দামান ট্রাজেডি এবং ২০১৭/১৮ সালের অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় মালয়েশিয়াকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। এর পিছনেই রয়েছে বাংলাদেশিদের পাচার ও মালয়েশিয়ায় গ্রহণ। এজন্য ড. মাহাথির সরকারের স্পষ্ট ঘোষণা আইনের শাসন নিশ্চিত করা। এজন্যই মালয়েশিয়ার সরকার এবং অভিবাসন বিভাগ কড়া অবস্থান নিয়েছে।

সম্প্রতি বছরের কিডনাপের অভিযোগে অভিযুক্ত দুই বাংলাদেশীকে পুলিশের গুলিতে নিহতের ঘটনায় রেশ কাটতে না কাটতেই ইমিগ্রেশনের অভিযানে গ্রেফতার করা হলো ৯ বাংলাদেশিকে। উদ্ধার করা হলো ১,১৫০ টি পাসপোর্ট, জাল ভিসা।

অভিবাসন বিভাগের প্রধান জানান, দীর্ঘদিন এই গ্রুপটি মালয়েশিয়ায় জাল পাসপোর্ট ভিসার স্টিকার সহ বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আর এতে করেই বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণকারীরা প্রমাদ গুণছেন ভবিষ্যৎ নিয়ে। হুমকির মুখে পড়েছে নতুন করে শ্রমিক নিয়োগের ব্যবস্থা এমনই অভিমত ব্যক্ত করলেন বাংলাদেশী কমিউনিটির নেতারা।

ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ভিসায় অবৈধভাবে অনেক বাংলাদেশিদের দোকান কোতারায় রয়েছে যার অধিকাংশই নকল ডকুমেন্টস তৈরি, জিম্মি করা, দালালী করা এবং সর্বশেষ পতিতাবৃত্তির পসরা করার কেন্দ্রে পরিণত করেছে কোতারায়া। কথিত দালালরা কোতারায়াকে অপরাধের সূতিকাগার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাই সম্প্রতি বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়েছে ইমিগ্রেশন। উল্লেখ্য মালয়েশিয়া ইমগ্রেশন আইন অনুযায়ী পতিতাবৃত্তির সংগে জড়িত বা পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করলে তাদের ভিসা বা পারমিট বাতিল সহ কঠিন শাস্তির উল্লেখ আছে।

সচেতন প্রবাসী, প্রফেশনাল, শিক্ষক, চিকিৎসক ও ছাত্ররা এসব অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবী জানিয়েছেন। প্রবাসীরা বাংলাদেশিদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে সম্প্রতি সময়ে নানান কটুবাক্যএর সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানা গেছে।

ইমিগ্রেশনের তথ্য মতে পাসপোর্ট না থাকা, ভিসা না থাকা, ভিসা নিয়ে অন্যত্র কাজ করা, কর্মস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত অপরাধে বাংলাদেশি গ্রেফতার হয়। এসব সাধারনত অন্যের প্ররোচনা, দালাল ও এজেন্টের গাফিলতির কারণে হয়ে থাকে। তবে সামাজিক অপরাধ খুব কমই দেখা যায়।

এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার কারাগারে ১০ জন বাংলাদেশি সাজা ভোগ করছেন বলে হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে। কমার্সিয়াল ক্রাইম যা ব্যবসা সংক্রান্ত অপরাধও খুব কম। ইদানিং বৈধ করার জন্য প্রতারণার ঘটনা ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে। দালালরা প্রতারণা করে বাংলাদেশি নাগরিকদের এরা অর্থ হাতিয়ে নিয়ে সটকে পড়েছে।

অপরদিকে বৈধ করা, ভিসা ও পাসপোর্ট সম্পর্কে নানান চক্রের রয়েছে সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক অপপ্রচার যা বাংলাদেশি প্রবাসীদের হেয় করা হচ্ছে বলে অনেকে মত দিয়েছেন। মাদক পাচার, মাদক ব্যবসা ও মাদক ব্যবহার অপরাধও সম্প্রতি উদঘাটিত হয়েছে যেগুলোতে বাংলাদেশিদের নাম এসেছে।

বাংলাদেশীদের অপরাধের কারণে শ্রমবাজার এর কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী এই প্রতিবেদককে জানান, মালয়েশিয়া সরকার সব সময় স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে শ্রমিক নিয়োগ দিলেও বাংলাদেশ থেকে শ্রমিকরা প্রতারিত হয়ে আসার কারণেই দীর্ঘদিন বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে আছে। সেই প্রতারণার ঘটনা মুছতে না মুছতেই কিছু কিছু বাংলাদেশীদের ইমিগ্রেশন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অপরাধের কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজার হুমকির মুখে পড়তে পারে।

নারায়ণগঞ্জের প্রবাসী আবুল কালাম জানান, সন্ত্রাসী সহ অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়ার ভিসা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অপরাধীরা মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করে আবারো তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। যার কারণে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সম্পর্কে বিভিন্ন বাজে মন্তব্য করেছে মালয়েশিয়ানরা। কমিউনিটির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ ২০/২৫ বছর ধরে দেখে আসছি এরা অবোইধভাবে আসতে দেয়, যারা বৈধ আছে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে মেয়াদ বৃদ্ধির আশা দেয় কিন্তু করে না এভাবে অবৈধদের সংখ্যা বাড়াতে থাকে। তারপর শুরু করে গ্রেফতার , অনেককে দেশে পাঠিয়ে দেয়। আবার শুরু হয় অবৈধভাবে আসা, চলে বৈধতার নামে বাটপারি। এর কোন স্থায়ী সমাধান দেখিনি কখনও।

তবে কি এভাবেই চলতে থাকবে? না, এ থেকে বের হয়ে এসে মর্যাদা ও সম্মমানের সাথে প্রবাসে থাকার আশাবাদ ও উপায় বলেছেন অনেকে।

মালয়েশিয়া প্রবাসী সাংবাদিক কাজী আশরাফুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে জানান, মালয়েশিয়ায় আসার আগেই একজন অভিবাসন প্রত্যাশী যেন এদেশের আইন কানুন ও নিয়ম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা পায় সেটা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।’ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনির বলেন, প্রবাসীদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনামূলক আইডিয়া নিয়মিত জানাতে হবে। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে প্রবাসীদের নিয়ে আলোচনা করা যায়। এজন্য কমিউনিটিকে সবার আগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। ‘ তিনি মনে করেন প্রবাসী পাশে যাকে পান সেই সবচেয়ে কাছে তাই তাকেও এ নৈতিক দ্বায়িত্ব নিতে হবে দেখতে হবে প্রবাসী কোন অপরাধে জড়িত হচ্ছে কি না বা কেউ তাকে প্রতারিত করছে কি না।

মালয়েশিয়াস্থ ব্রাম্মণবাড়িয়া জেলা এসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক প্রকৌশলী মো. রাহাদ উজ্জামান বলেন, যেহেতু মালয়েশিয়ায় বিশাল অংকের প্রবাসী বসবাস করে, তাই বিভিন্ন ধরনের মন মানসিকতার মানুষ এখানে আছে। তেমনি বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার লোক ও ব্যবসায়ী আছেন। অপরাধ কর্মকাণ্ড শুধু শ্রম বাজারের নয় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে মালয়েশিয়াতে। তবে এ সব বিষয়ে শুধু যে বাংলাদেশীরাই জড়িত তা বলা মুশকিল কারন এসব অপরাধ সংঘবদ্ধভাবে ঘটছে অন্যদেশের নাগরিকও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

এ কারণে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সুরক্ষার আওতা বাড়াতে হবে।’ তিনি বলেন, যেহেতু এদেশে শুধু শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন এবং পরিবারের স্বচ্ছলতা আনাই মূখ্য তাই আমাদের উচিত সকল লোভ লালসা পরিহার করে এদেশের আইনকানুন সহ কোম্পানির নিয়ম কানুন মেনে চলা। এ জন্য কমিউনিটি, হাইকমিশন এবং মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একযোগে কাজ করতে পারে।

ad

পাঠকের মতামত