স্বামী পরিত্যক্তা নারীর আত্ম-প্রতিষ্ঠার গল্প
পঞ্চগড় সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত গ্রামের এক নারীর আত্ম-প্রতিষ্ঠার গল্প থেকেই এক বাজারের নামকরণ করা হয়েছে জয়গুন মার্কেট। অল্প বয়সেই স্বামী পরিত্যক্তা এই নারীর দোকান থেকেই এই মার্কেটের শুরু হয়। কিন্তু ভাগ্যদোষে ব্যক্তি মালিকানা জমিতে দোকানটি না থাকায় তাকে সেখান থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।আজ তিনি ওই মার্কেটে কেবল ক্রেতা হিসেবে যান। তবু আজও তারই নামই রয়ে গেছে জয়গুন মার্কেট। বার বার এই নাম পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি বরং আরও বেশি পরিচিতি পেয়েছে।
পঞ্চগড় জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে হাড়িভাসা ইউনিয়নের খোপড়াবান্দি চৌরাস্তার ছোট্ট বাজার জয়গুন মার্কেট। এই বাজারের নামকরণের পেছনে রয়েছে এক নারীর আত্ম-প্রতিষ্ঠার গল্প। স্বামী পরিত্যক্তা জয়গুন বেগম দু মুঠো খাবারের জোগানের জন্য একমাত্র ছেলেকে নিয়ে ২০০১ সালে এই স্থানে প্রথম একটি ছোট্ট দোকান শুরু করেন।
শুরুতে মুড়ি, চিড়া, পান, বিড়ি, বিস্কিট বিক্রি হলেও পরে চায়ের দোকান গড়ে তোলেন। জমে ওঠে চৌরাস্তাটি। ভাল মুনাফা হওয়ায় একমাত্র সন্তান নিয়ে ভালই চলছিল জয়গুনের সংসার। এদিকে জয়গুনের দেখাদেখি আস্তে আস্তে চৌরাস্তায় একটি দুটি করে দোকান বাড়তে থাকে। এরপর জায়গাটির নাম হয়ে যায় জয়গুন মার্কেট। বর্তমানে সবকিছুই পাওয়া যায় এই ছোট্ট বাজারে। দোকানের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু জয়গুন মার্কেট নাম হলেও সেখানে এখন আর নেই জয়গুনের দোকান ও চায়ের দোকানের।
বাজারটি জমে উঠলে ব্যক্তি মালিকানায় থাকা তার দোকানটি জোর করেই দখল করে নেয় মালিক আছিমদ্দিন। দোকানের কোন মালামালও তাকে নিয়ে যেতে দেয়া হয়নি। তারপর থেকে দিন মজুরি দিয়ে সংসার চলছে জয়গুনের। জয়গুন হেরে যাননি। সন্তানকে নিয়ে নিজে খেটে ১৩ শতক জমি কিনে বাড়ি করেছেন। তার এই জীবন সংগ্রামের জন্য তাকে ২০১৩ সালে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে জয়িতা হিসেবে সম্মাননাও দেয়া হয়েছে। তবে তার দোকান করার সাধটি অপূর্ণই রয়ে গেছে। এখনো দোকান করার স্বপ্ন দেখেন জয়গুন।
নারীর নামে মার্কেটের নাম হওয়ায় বার বার তা পরিবর্তনের চেষ্টাও করে স্থানীয় একটি মহল। কিন্তু চারপাশে জয়গুন মার্কেট নামটিই বেশি ছড়িয়ে পড়ায় তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়ে উঠেনি। প্রত্যন্ত এলাকার এই নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে জয়গুন মার্কেট ঠাঁই পেয়েছে পুরুষ শাসিত এই সমাজে।
খোপড়াবান্দি এলাকার বৃদ্ধ বশির উদ্দিন বলেন, এই চৌরাস্তায় মানুষের তেমন আনাগোনা ছিলো না। জয়গুন প্রথম দোকান দেয়। তারপর আস্তে আস্তে অনেক দোকান গড়ে ওঠে। জায়গাটির নাম হয়ে যায় জয়গুন মার্কেট। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখন জয়গুন মার্কেট অনেক বড় হলেও জয়গুনের দোকানটিই আর তার নেই।
জয়গুন মার্কেটের দোকানদার সাইদুর রহমান জানান, জয়গুন আপা দোকান শুরু না করলে হয়তো এখানে এত বড় মার্কেট হতো না। তিনি দোকান শুরু করে এই জায়গাটিকে পরিচয় করিয়েছেন বলেই আমরা আজ দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছি।
ওই এলাকার মফিজার রহমান জানান, আমরা জয়গুন আপার দোকান থেকে মুড়ি, চিড়া, চা খেতাম। আর কোন দোকান ছিলো না। সুযোগ পেলেই আড্ডা জমতো জয়গুন আপার দোকানে। তাকে দিয়ে এখানে মার্কেটের যাত্রা শুরু হলেও আজ তার দোকান নেই। তার নামে এই মার্কেটের নাম হয়েছে। এটা কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। সে মারা গেলেও তার নাম থেকে যাবে।
জয়গুন বেগম জানান, শুরুতে তারা আমাকে দোকান করার জন্য অনুমতি দিয়েছিল। খুব কষ্ট করে আমি দোকানটি সাজিয়েছিলাম। আমার দেখাদেখি অনেক মানুষ দোকান তোলে। এক পর্যায়ে মালিক আমাকে দোকান থেকে বের করে দেয়। আমার কোন মালামালও আমাকে নিয়ে যেতে দেয়নি। টাকা দিয়ে দোকান নেয়ার সামর্থ আমার নেই। আমার খুব সাধ ছিলো দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করবো। কিন্তু তারা আমাকে আর তা করতে দিলো না। এখন মজুরি দিয়ে যা পাই তাই দিয়ে সংসার চালাই। তিনি আরও বলেন, আমি নারী তাই আমার নামটিও মুছে দেয়ার চেষ্টা করেছে অনেকে। এখনো করছে। তারা এটি মেনে নিতে পারছে না।
পঞ্চগড় জেলা পরিষদের সদস্য ও পরস্পর এনজিওর নির্বাহী পরিচালক আখতারুন্নাহার সাকী বলেন, গ্রামের এক প্রত্যন্ত নারীর নামকরণে একটি জায়গার নামকরণ হওয়া সত্যিই আনন্দের। আমরা চাই জয়গুনের মতো জয়িতাদের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা করা হোক। এই নারী তার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে স্বামীর নির্যাতনের ক্ষত মুছে সফলতা অর্জন করেছে। আজ তার নিজের দোকানটিও নেই। আমাদের তার পাশে দাঁড়ানো উচিত।




