266475

‘এর চেয়ে ভালো সবাই মিলে মরে যাওয়া’

কোনো বন্দুকযুদ্ধের খবর শুনলেই হামিদার উদ্বেগ বেড়ে যেত। মনে মনে ভাবতেন, তার ২০ বছরের ছেলেটা আবার ওই লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েনি তো। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরের পুলওয়ামায় যখন সেনাবাহিনীর গাড়ির ওপর আত্মঘাতী হামলা হলো তখন দুধ দোয়াচ্ছিলেন হামিদা। তবে সেদিন ওই হামলার কথা শুনে খুব একটা ভয় পাননি তিনি। কেননা তার ধারণা ছিল, ছেলে আর যাই হউক কখনো আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী হবে না।

আর কাশ্মীরের দীর্ঘ দিনের স্বাধীনতার আন্দোলনে এ ধরনের হামলার কথা সাধারণত শোনা যায়। কাশ্মীরে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মত আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটলো। এর আগে ২০০১ সালে শ্রীনগরে ভারতীয় সেনাদের ক্যান্টনমেন্টের প্রবেশদ্বারে গাড়িবোমা হামলা চালিয়েছিল আফাক শাহ নামে এক বিদ্রোহী। ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্যই ওই হামলা চালানো হয়েছিল। কাশ্মীরে সাধারণত: বিদেশ যোদ্ধারাই বেশিরভাগ আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে থাকে।পুলওয়ামায় ১৪ ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলাটি চালিয়েছিল হামিদার ছেলে আদিল দার, যা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের অবস্থা তৈরি হয়েছে।

আমি তাকে আল্লার হাতে ছেড়ে দিয়েছিলাম-হামিদার বাড়ি পুলওয়ামা জেলার গান্ধিবাগ গ্রামে। ছেলের মৃত্যুতে শোকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছেন হামিদা। অথচ তার তিন ছেলের মধ্যে আদিলই ছিল সবচেয়ে শান্ত। সে সবসময় মাকে তার গৃহকাজে সাহায্য করতো। আর মা চাইতেন, একদিন ছেলে জীবনে সফল হবে।পুলিশ রেকর্ডেও বলা হয়েছে, আদিল অতি সাধারণ একজন মানুষ। সে কোনো গোড়া মুসলিম ছিল না। এমনকি নিয়মিত নামাজও পড়তো না। পরিবারের খুব বাধ্য ছেলে ছিল সে।

হামিদা বলেন, ‘আমার কোনো মেয়ে নাই। ও আমাকে ঘরের কাজে সাহায্য করতো। সে ভারতীয় ক্রিকেট দলকে পছন্দ করতো। কোনো খেলায় ভারত জিতলে সে পটকা ফোটাতো। কিন্তু গত বছরের মার্চে সে বাড়ি ছেড়ে যায়। এরপর আর তাকে দেখিনি। মাসের পর মাস আমি তাকে খুঁজে বেরিয়েছি। তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষায় দেখেছি। শেষে আল্লাহর হাতে তাকে সপে দিয়েছি।’আদিলের বাবা হাসান দারের (৫০) অবস্থাও খুব নাজুক। দোতলা বাড়িটাতে তিনি সারাদিন সাংবাদিকদের সামলাতে ব্যস্ত। তিনি মনে করেন, কাশ্মীরে ভারতীয় সেনারা সে নির্যাতন চালাচ্ছে তার প্রেক্ষিতেই কাশ্মীরের তরুণরা হাতে বন্দুক তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বলুন তো, কোনো বাবা-মা তার ছেলেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা কোনো বড় কর্মকর্তা বানাতে না চায়? কে চায় তার ছেলে বন্দুক তুলে নিয়ে মৃত্যুকে ডেকে আনুক? একজন তরুণ সন্তানের মৃত্যু তার বাবা-মায়ের কাছে কতটা বেদনাদায়ক সেটা কি আপনারা কল্পনা করতে পারেন?পেুলওয়ামায় ভারতীয় সেনাদের হত্যার ঘটনায় তিনি দুঃখিত। তিনি চান না এভাবে আর কোনো প্রাণ ঝড়ে যাক। তিনি চান কাশ্মীর সঙ্কটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান। ‘আমরা সবাই ক্লান্ত। আমরা এর অবসান চাই।’

একই কথা বলেন আদিলের চাচা আবদুল রশিদ। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন মৃত্যু চাই না। আমরা চাই কারো হাতে যেন কেউ খুন না হয়। কিন্তু আমাদের ছেলেরা কেবল নির্যাতনের প্রতিবাদ করছে। আমরা আমাদের সন্তান, ঘর-বাড়ি এবং আমাদের মানসিক শান্তি হারিয়েছি। কিন্তু আমাদের দেখার কেউ নেই।’আবদুল রশিদের দুই ছেলেও বিদ্রোহী দলে যোগ দিয়েছে এবং এদরে একজন মারা গেছে।কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি কোনো আমার আলো দেখছেন না।আদিলের চাচাতো ভাই সামির আহমেদ যিনি জিওলজিতে মাস্টার্স করছিলেন, তিনিও গতবছরের মার্চে নিখোঁজ হন। এক মাস পর সামাজিক মাধ্যমে একে রাইফেল হাতে তার ছবি পোস্ট হয়। যেখানে তিনি জঙ্গি গোষ্ঠী জইস-ই-মোহাম্মদে যোগ দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়।

এ প্রসঙ্গে রশিদ বলেন,‘এখানে কোনো বিচার নেই। আমাদের সন্তানরা যখন হত্যাসহ নানারকম নির্যাতন দেখে তখনই তারা চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।’গ্রামবাসীর আশঙ্কা পুলওয়ামা আত্মঘাতী হামলার পর পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে, তাদের ওপর ভারতীয় সেনাদের হামলা আরো বাড়বে।’ইতিমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার সেনাবাহিনীকে পুলওয়ামা হামলার বদলা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেও উত্তেজনায় অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। এই হামলার পর গোটা ভারত জুড়ে কাশ্মীর বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাতে নানারকম হামলার শিকার হচ্ছে কাশ্মীরিরা।

এ সম্পর্কে ব্যবসায়ী নাজির আহমেদ বলেন,‘যেভাবে প্রতিবেশী দুটি দেশ প্রতিক্রিয়া দেখোচ্ছে তাতে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দ্রুত কোনো সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছে না। কাশ্মীর যে একটি রাজনৈতিক সমস্যা, এই সত্যটা ভারত কোনোদিনও স্বীকার করতে চায় না।’আর এ কারণেই সঙ্কটের কোনো সমাধানও হয় না। আপনি যদি কোনো সমস্যাকে গুরুত্বই না দেন তাহলে এর সমাধান কীভাবে হবে।যদিও কিছু কাশ্মীরির ধারণা, যুদ্ধের মাধ্যমে কয়েক দশকের দীর্ঘ এই সমস্যাটির সমাধান সম্ভব।‘আমাদের এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো যুদ্ধ। আমরা তো অলরেডি একটা যুদ্ধের মধ্যেই আছি। প্রতিদিনই তো আমরা মরছি। এর চেয়ে কি ভালো নয় একসঙ্গে সবাই মিলে মরে যাওয়া?’বলছিলেন ২৭ বছরে যুবক মুবাশির। সূত্র: আল জাজিরা

ad

পাঠকের মতামত