257368

পঙ্গুত্বকেও হার মানালো নুরুল আমিন

মিডলাইন পরিবহনের একটি বাস। বাসে উঠতেই দেখা গেল, পেছন থেকে দুই হাতে ভর একজন সামনের দিকে এগিয়ে আসছেন এক তরুণ। পা দুটি একেবারেই ক্ষীণ। দুই পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই বোঝা গেল। একটু একটু করে এগিয়ে বাসের যাত্রীদের কাছে টাকা তুলছেন। প্রথম দেখায় তাকে ভিক্ষুক বলেই মনে হলো। তবে কাছে এসে ভাড়া চাইতেই ভুল ভাঙল। ওই তরুণ ভিক্ষুক নন, তিনি এই বাসের চালকের সহযোগী। যাত্রীদের কাছে ভাড়া নিচ্ছেন।

বাংলাদেশে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার চর্চা নতুন নয়। শারীরিকভাবে একটু অক্ষম হলে তো কোনো কথাই নেই! অক্ষমতার দোহাই দিয়ে তারা মানুষের কাছে হাত পাততে শুরু করে। তাই নুরুল আমিনকে প্রথম দেখায় এমনটা ভাবা অস্বাভাবিক কিছু নয়। চাইলে তিনিও তাদেরই একজন হতে পারতেন। আরও আগেই পেশা হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নিতে পারতেন তিনি। কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তির পথে যাননি তিনি। শারীরিক অক্ষমতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হয়েছেন বাসচালকের সহযোগী।নুরুল আমিনের বাড়ি নোয়াখালীতে। জন্মগতভাবেই তার দুটি পা একেবারেই অচল।

মোহাম্মদপুর থেকে খিলগাঁওগামী মিডলাইন পরিবহনের বাসে নিয়মিতই দেখা মিলে নুরুল আমিনের। বাসের গেটে গুটিসুটি দিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। কোমরে ভর দিয়ে দুই হাতেই চলে নুরুল আমিনের প্রতিটি কর্মব্যস্ত দিন। সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া ব্যস্ততা শেষ হয় প্রায় মাঝ রাতে। বাসের যাত্রী ডাকা থেকে শুরু করে ভাড়া আদায়, সব কাজ একাই করেন তিনি।৪ ভাই, ২ বোনের মধ্যে নুরুল আমিন চতুর্থ। তার বাবা-মা এখনো জীবিত। শারীরিক অক্ষমতার দোহাই দিয়ে চাইলে বাবা-মা কিংবা অন্যান্য ভাইদের সাহায্য নিয়েও জীবিকা নির্বাহ করতে পারতেন নুরুল আমিন। কিন্তু অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচতে চাননি তিনি। বরং কাজ করার মধ্যে যে সম্মান আছে, সেটা নিয়েই বাঁচার ইচ্ছা ২২ বছর বয়সী নুরুল আমিনের।

নুরুল আমিন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘চাইলে তো বাপ-ভাইদের ঘাড়ে থাইকাও খাইতে পারতাম। কিন্তু কারো ওপর নির্ভর কইরা থাকতে তো ভাল্লাগে না ভাই। চাইছিলাম নিজেই কিছু করতে। যাতে কারো কাছে কোনো সময় হাত পাতা না লাগে। আল্লাহ এই ডাক শুনছে। অহন তো নিজের কামাই নিজেই করি। খাইটা-খুইটা যা পাই তাতে আল্লাহ দিলে চইলা যায়। মাঝে-মধ্যে বাড়িও পাঠাইতে পারি।’প্রায় ৭ বছর ধরে বাসচালকের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন নুরুল আমিন। অর্থাৎ ১৫ বছর বয়সে তিনি এই কাজ শুরু করেন।নিজে থেকে কাজ করার তাগিদ অনুভব করেই পেশাগত জীবনে পা বাড়ান জানিয়ে নুরুল আমিন বলেন, ‘সবসময়ই চাইতাম কাজ করতে। শরীরে যতটুকু পারা যায় ততটুকুই যেন করতে পারি। কিন্তু ভিক্ষা কইরা খাওয়ার রুচি পাই নাই। বাকিডা আল্লাহর ইচ্ছা, আর ওস্তাদে ব্যবস্থা কইরা দিছে।’ভাড়া আদায় করতে করতে তার কর্মজীবনের গল্পটাও শুনিয়েছেন নুরুল আমিন।

তিনি বলেন, ‘বাড়ি থাকতেই বাসে বাসে ঘুরতাম। ঢাকায় আইতাম, আবার নোয়াখালী যাইতাম। বাসে ঘুরতে ঘুরতে অনেক ড্রাইভার, কন্ট্রাক্টর গো লগে পরিচয় হইছিল। এরপর এক ড্রাইভারের লগে মোহাম্মদপুর আইলাম। তারে জানাইলাম, কাজ করতে চাই। এরপর সে ব্যবস্থা কইরা দিছে। সেই থেইকা কাজ শুরু করি। এখনো তার লগে আছি।’প্রায় ৭ বছর ধরে বাসচালকের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন নুরুল আমিন। ছবি: প্রিয়.কম
নুরুল আমিনের অনুরোধ, শারিরীকভাবে অক্ষম ও প্রতিবন্ধীদের যেন সমাজ থেকে আলাদা করে দেওয়া না হয়। তাদেরকে যেন খাটো করে না দেখারও অনুরোধ জানান তিনি।

সামর্থ্য অনুযায়ী কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দিলে শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরাও কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন বলে মনে করেন নুরুল আমিন।তিনি বলেন, ‘আমরাও চাই কাজ কইরা খাইতে। ওস্তাদে আমারে কাজ দিছে। তাই আমি কাজ কইরা খাই। আমার মতো বাকি যারা আছে তাগোরে কাজ দিলে তারাও কাজ করবে। আল্লাহর দুনিয়ায় কেউ হাত পাইত্তা খাইতে চায় না ভাই। কাজকাম না পাইলে পেটের দায়ে হাত পাতে।’

ad

পাঠকের মতামত