ডা. আকাশের আত্মহত্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা
চট্টগ্রামের ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশের আত্মহত্যার ঘটনায় তোলপাড় সারা দেশ। আমেরিকার কৃষ্টি-কালচারে আসক্ত ছিল স্ত্রী মিতু। বিয়ের পর মিতুর অবাধ মেলামেশা আকাশকে কুড়েকুড়ে খাচ্ছিল। তবু আকাশ মিতুকে ডিভোর্স দিতে পারছিল না। কারণ তার মাথার ওপর ছিল কাবিননামার ৩৫ লাখ টাকার চাপ। এমনি দাবি করেছে তার স্বজনরা।গত তিন দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমগুলোতে বেশ আলোচিত সংবাদ: স্ত্রীর পরকীয়ার জেরে স্বামীর আত্মহত্যা।দীর্ঘ নয় বছর প্রেম, অতঃপর বিয়ে তবু কেন চিকিৎসক আকাশের এমন করুণ পরিণতি হলো, এ বিষয়ে নানা প্রশ্নে সরগরম সোশ্যাল মিডিয়া।
শুধুই কি কাবিনের মোটা অঙ্কের টাকা ও স্ত্রী মিতুর অবাধ মেলামেশাই এই আত্নহত্যার মানতে নারাজ মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।তারা বলছেন, কাবিনের টাকা ও স্ত্রীর অবাধ মেলামেশাই শুধু আত্মহত্যার কারণ নয়। একজন মানুষ যখন নিজের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, যখন সে মনে করে এই পৃথিবীতে বেচে থাকা তার জন্য অর্থহীন। তিনি দাম্পত্য প্রতারিত হচ্ছেন । কিন্তু সম্মান ও নিজের সামাজিক অবস্থা ও লোকলজ্জার ভয়ে কিছু বলতে পারছেন না। এই সমস্যাগুলো এক সময় প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে যার জন্য মানুষ নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারি ফেলে। যার পরবর্তীতে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, ডা. আকাশের আত্মহননের ঘটনাটি বিশ্নেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, তার স্ত্রী একধিক মানুষের সঙ্গে মেলামেশা তার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে তাকে পলায়ন প্রবৃত্তিতে বাধ্য করেছে। পারিবারিক কলহের কারণে প্রচণ্ড চাপে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে যার ফলে আত্মহননের মতে পথ বেছে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা অনেক আগে জাপানে বেশি ঘটত। তবে তারা তাদের পাঠ্যক্রমে বিষয়টি সংযুক্ত করে ও সামাজিক ও পারিবারিভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করে। তাই আমি বলতে চাই বাংলাদেশে সামাজবিজ্ঞান বিভাগের পাঠক্রমে দাম্পত্য কলহের বিষয়ে তুলেধরা ও এর সমাধানে কী করা যেতে পারে তা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, চিকিৎসক স্ত্রী মিতুর একাধিক লোকের সঙ্গে মেলামেশা আইনবহির্ভূত ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের সমস্যা সমাধানে পারিবারিক ও সামাজিক কাউন্সিল প্রয়োজন। পারিবারিক বা সামাজিকভাবে সমাধান করা না গেলে বিচ্ছেদের প্রশ্নটি আসে। তবে তা আমাদের কাম্য নয়। তবে দাম্পত্য সম্পর্ক যদি আত্মহত্যা, খুন, বা শারীরিক নির্যাতনের পর্যায়ে চলে যায় তবে বিচ্ছেদ উত্তম।এই সমস্যা সমাধনে গণমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চিকিৎসক মোস্তফা মোরশেদের আত্নহননের কথা উল্লেখ করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাঈদ এনাম যুগান্তরকে বলেন,মোস্তফা মোরশেদের প্রচণ্ড মানসিক চাপে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি ভুল করেছেন। আত্মহত্যা কোনো সমাধান হয়। এসব পরিস্থিতিতে সাধারণত পারিবারিকভাবে তিনি সমাধান করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তার কষ্টগুলোর অন্য কারো সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারতেন। তখন হয়তো এমটনটি হতো না।
তিনি বলেন, মোস্তফা মোরশেদের দাম্পত্য সমস্যাগুলো এক সময় ভারি বিষণ্ণতায় পরিণত হয়েছে। যা তিনি সহ্য করতে পারেননি। বিষণ্ণতা, একা থাকা। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকা, উৎসাহ উদ্যম হারিয়ে ফেলা, ঘুম কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, রুচি কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, কাজকর্মে শক্তি না পাওয়া, মনোযোগ হারিয়ে ফেলা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, নিজেকে নিঃস্ব অপাঙক্তেয় মনে করা, অযাচিত অপরাধবোধ ও আত্মহত্যার কথা বলা, ভাবা। এই লক্ষণগুলো টানা দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে আমরা তাকে মেজর ডিপ্রেশনের রোগী বলি, এবং তিনি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছেন বলা যায়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জানান, যে কোনো সমস্যায় আত্নহত্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় হলো কাছের কাউকে তার সমস্যার কথা খুলে বলা। খোলোমেলা আলোচনা করা। কখনোই কোনো সমস্যা নিজের মধ্যে পুষে রাখবেন না। সমস্যা পুষে রাখলে বিষণ্ণতায় পরিণত হবে। এক সময় আপনি আত্মহননের দিকে এগিয়ে যাবেন।এক গবেষণা দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৩৯ দশমিক ৬ জন আত্মহত্যা করে। ছেলেদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হলেও বাংলাদেশে এই হার নারীদের মধ্যে বেশি। সাধারণত কম বয়সী মেয়েদের মধ্যে এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। স্বল্পশিক্ষা, দারিদ্র্য, দাম্পত্য কলহের জন্য অনেকে আত্মহত্যা করে। এ ছাড়াও প্রেম-সম্পর্কিত জটিলতা, আর্থিক অনটন, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব আত্মহত্যার পেছনের অন্যতম কারণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাওলানা হুসাইনুল বান্না যুগান্তরকে বলেন, আত্নহত্যা মহাপাপ। ভুলেও এই কাজটি করা যাবেন না। ইসলামে দাম্পত্য জীবনে কলহ হলে তালাকের বিধান রাখা হয়েছে। আর দেনমোহরের কারণে আত্মহননের যে বিষয়টি চিকিৎসক মোস্তফা মোরশেদের ব্যাপারে বলা হচ্ছে তা হয় তা হতে পারে। তবে ইসলামে দেনমোহর সম্পর্কে বলা হয়েছে। লোক দেখানো দেনমোহর ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার থেকে চিকিৎসক মোস্তফা মোরশেদ আকাশের লাশ উদ্ধার করা হয়। দাম্পত্য কলহের কারণে আত্মহত্যা করেন এই চিকিৎসক। মৃত্যুর এক ঘণ্টা আগে তিনি নিজের ফেসবুকে স্ত্রীর উদ্দেশে একটি স্ট্যাটাস দেন। স্ট্যাটাসটিতে স্ত্রীর প্রতি তার অভিমান ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে।
ডা. আকাশ স্ট্যাটাসে স্ত্রীর উদ্দেশে লেখেন- ‘ভালো থেকো, আমার ভালোবাসা তোমার প্রেমিকাদের (প্রেমিকদের) নিয়ে।’ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করা চিকিৎসক মোস্তফা মোরশেদ স্ত্রী তানজিলা হক চৌধুরী মিতুর বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।
ডিপ্রেশন কী? ডিপ্রেশন একটি ভয়াবহ মানসিক ব্যাধি যা একজন মানুষকে সবার অজান্তে তিলেতিলে শেষ করে দেয়। মানুষের শারীরিক মানসিক কর্মক্ষমতা ও মারাত্মক কমিয়ে দেয় এই ডিপ্রেশন। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় তিনশ মিলিয়ন (১ মিলিয়ন=১০ লাখ) ডিপ্রেশন এর রোগী রয়েছেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি ৫ জনের ১ জন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ডিপ্রেশন বা এনজাইটি তে ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক বা সামাজিক সম্পর্কের অবনতি এই ডিপ্রেশন এর জন্য হয়ে থাকে, যা হয়তো থেকে যায় একেবারে অজানা। আবার উল্টোটি হয়। পারিবারিক বা সামাজিক টানাপোড়েন থেকেই অনেক সময় মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগেন।শুরুতেই বলেছিলাম, ডিপ্রেশনের ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে আক্রান্ত রোগীরা নীরবে-নিভৃতে আত্মহত্যা করে বসেন।
চিকিৎসা-সাইকিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে থেকে নানান প্রকারের কার্যকরী এন্টিডিপ্রেশেন্ট ড্রাগ সাইকোথেরাপি ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে একজন ডিপ্রেশনের রোগীকে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। সাধারণত এমিট্রিপটাইলিন, সিটালোপ্রাম, এস সিটালোপ্রাম, মিরটাজাপিন এন্টিডিপ্রেশন হিসেবে খুবই কার্যকরী।সারা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান ডিপ্রেশনের এই ভয়াবহতা উপলব্ধি করেই গত বছরের ৭ এপ্রিল (২০১৭) বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের স্লোগান করা ছিল “ডিপ্রেশন: লেট’স টক” অর্থাৎ “আসুন, ডিপ্রেশন নিয়ে আলোচনা করি”। সবশেষে আবারও বলছি, ডিপ্রেশনের রোগীরা সবার অগোচরে আত্মহত্যা করে বসেন। তাই তাদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলুন, সময় দিন এবং বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।




