সমস্যার অন্ত নেই নারী পুলিশের
নিউজ ডেস্ক।। পাঠ্যবই গুটিয়ে বছর দুই হলো পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন কিশোরগঞ্জের মেয়ে সাবরিনা খানম (ছদ্মনাম)। হাওরের উন্মুক্ত পরিবেশে ঘুরে বেড়ানো এ তরুণীর ঠিকানা এখন রাজারবাগের পুলিশ লাইনস নারী ব্যারাকে। পদায়ন স্ট্যান্ডবাই টিমে। রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কায় অন্যসব নারী সদস্যদের মতো ১২ ঘণ্টার ডিউটি পড়ে তারও। পুরো সময়ের কখনো রাজপথে, কখনোবা স্ট্যান্ডবাই থাকা। ডিউটি শেষে আবার বহনকারী গাড়ির জন্য ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা।
সাবরিনার ভাষ্য, সবুজে ঘেরা গ্রামে বড় হলেও বেঁচে থাকার তাগিদে এখন রাজধানী ঢাকার বিরূপ পরিবেশকেই মানিয়ে নিতে হচ্ছে। এ অল্প সময়ে রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি নিতেও শিখেছেন। তবে রাজপথে কর্তব্য পালনে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই সৌচাগারের ঝামেলা পোহাতে হয় তাকে। তার জন্য যেতে হয় কোনো মার্কেট কিংবা সরকারি-বেসরকারি অফিসে। অনেকেই আবার বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখে না। এমনকি ঋতুকালীনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তাঘাটে পুরুষ সদস্যদের মতোই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আবার কাজের চাপে ঠিকমতো ছুটিও মেলে না। সাবরিনার মতো প্রতিটি নারী পুলিশ সদস্যের গল্প প্রায় একই।
সেবা প্রাপ্তি সহজ করার লক্ষ্যে গত রবিবার থেকে দেশব্যাপী সব ইউনিটে পালিত হচ্ছে পুলিশ সেবা সপ্তাহ-২০১৯। এ সেবা চলবে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। রাজধানীর বিভিন্ন ইউনিটে কর্তব্যরত নারী পুলিশ সদস্যরা বলছেন, মানুষের কল্যাণ বা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের সমস্যারই তো অন্ত নেই। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে নারী সদস্যদের আবাসনে চার ও ছয়তলা দুটি ব্যারাকে তাদের থাকতে হচ্ছে গাদাগাদি করে। ছারপোকার অত্যাচারে রাতের বেলা ঘুমানো যায় না। সেই সঙ্গে নি¤œমানের খাবার, সরাসরি লাইনের পানি পান করতে হয়।
রাজধানীর গুলশান শুটিং ক্লাবের সামনের চেকপোস্টে কর্তব্যরত কনস্টেবল মোসাম্মৎ মুসলিমা বানু আমাদের সময়কে বলেন, ‘পুলিশ লাইনস ব্যারাকের পরিবেশ আগের চেয়ে কিছুটা ভালো। তবে কর্তব্যরত স্থানে নারী-পুরুষ কারও জন্য ওয়াশরুম নেই। আবার ডিউটি শেষে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার গাড়িও প্রায়ই সময় দেরিতে আসে। কাজের চাপে বছর শেষে ছুটিও মেলে না।’ একই স্পটে কর্তব্যরত কনস্টেবল শিউলী আক্তারের মতে, ‘পুলিশে যোগ দিয়েছি দেশের মানুষের সেবা করতে। স্যাররাও আমাদের প্রতি আন্তরিক। কিন্তু নারী হয়ে দীর্ঘক্ষণ কাজ করা কঠিন। একমাস এ জায়গায়, আরেক মাস অন্য জায়গায় ডিউটি পড়ে। কর্তব্য পালন শেষে বাসায় গিয়েও কাজ করতে হয়। আবার ইউনিফর্ম পরে গণপরিবহনে উঠলে সাধারণ মানুষ কেন জানি নানা কথা বলে। বাসের হেলপার-কন্ডাক্টর মনে করে ভাড়া দেব না। তাই যাদের জন্য কাজ করছি সেসব মানুষের চিন্তাচেতনার পরিবর্তন দরকার।’
২০১৬ সালে প্রকাশিত বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশে কর্মরত নারী কনস্টেবলদের ১০ ভাগের বেশি সদস্য যৌন হয়রানির শিকার হন। শতকরা তিন ভাগ এ ধরনের ঘটনার শিকার হতে হয় খোদ পুলিশ বিভাগে সিনিয়র কর্মকর্তাদের হাতেই। বিসিএস ক্যাডার পর্যায়ের নারী পুলিশরাও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বাইরে নন বলে গবেষণার উঠে আসে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ দায়ের হয় না। কারণ নারী পুলিশ সদস্যদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে পুরুষ কর্মকর্তারা সংবেদনশীল নন। আবার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ বিভাগে নারী সদস্য মোট জনবলের মাত্র ৫ দশমিক ৮৪ ভাগ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে নারী-পুরুষ সমান। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার। কারণ একজন পুরুষকে নারীর মতো পদে পদে লিঙ্গ বৈষম্য বা প্রতিবন্ধকতার সমুখীন হতে হয় না। এজন্য পুলিশ বিভাগে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ জেন্ডার নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা জরুরি। একাধিক নারী পুলিশ সদস্য বলছেন, বর্তমানে অল্পসংখ্যক নারী নিয়োগ হলেও তাদের অধিক ঝুঁকি নিয়ে পরিশ্রম করতে হচ্ছে। তাই ২০ শতাংশ ঝুঁকিভাতা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ চান তারা।
যদিও পুলিশের নারী সহায়তা ও তদন্ত বিভাগের প্রধান (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন আমাদের সময়কে বলেন, ‘নারী সদস্যরা যাতে সুরক্ষার সঙ্গে কর্তব্য পালন করতে পারেন সেভাবেই তাদের কাজ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তাদের খাবারও কর্তব্যরত স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়। পুলিশ বাহিনী নারীদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে আন্তরিক।’ উৎস: দৈনিক আমাদের সময়।




