যেভাবে কর্মীদের চাঙ্গা করতে চায় বিএনপি
হতাশা কাটিয়ে দলকে সাংগঠনিকভাবে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন কারান্তরীণ থাকায় দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দল গোছানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।আগামী দিনে রাজপথের বিরোধী দল হিসেবে মাঠে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য যা করা দরকার, সেই উদ্যোগ তিনি দূর থেকে নেবেন। সে জন্য সাংগঠনিকভাবে দলকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দলের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির শূন্যপদগুলো পূরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীরা থানা, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। কর্মসূচি দিয়ে নেতারা মাঠে না থাকা, তৃণমূল নেতাকর্মীদের খোঁজখবর না রাখাসহ নানাবিধ কারণে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সর্বত্র। যার চূড়ান্ত পরিণতি এবারের নির্বাচনে দেখা গেছে।প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের ধরপাকড় ছিল সত্য; কিন্তু এর বিপরীতে বিএনপির মেরুদণ্ডহীন সাংগঠনিক চিত্র ধরা পড়েছে সবার চোখে। কোথাও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি দলটি।এমনকি বহু কেন্দ্রে এজেন্টেই দিতে পারেনি দীর্ঘদিন নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থাকা দলটি। সব মিলিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা বিএনপির।
আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার কারাবন্দি জীবনের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। ১১ মাস ধরে তারেক রহমানের নির্দেশনায় দলের স্থায়ী কমিটিই বিএনপিকে পরিচালনা করেছে। এর সমন্বয় করেছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।বিএনপির নীতিনির্ধারক কয়েকজন নেতা জানান, দলের চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অনুপস্থিত। বর্তমানে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকটি পদ শূন্য। এ পরিস্থিতিতে স্থায়ী কমিটি যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের সমন্বয়ে পুনর্গঠন জরুরি। বর্তমানে স্থায়ী কমিটির সদস্য না হয়েও বেশ কয়েকজন ভাইস চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে স্থায়ী কমিটির আনুষ্ঠানিক নীতিনির্ধারণী বৈঠকে ওই নেতাদের রাখা সম্ভব হয় না। অনেক সময় বিশেষ আমন্ত্রণে কাউকে কাউকে বৈঠকে রাখা হয়।
আবার অনেক সময় বৈঠকের আগে এবং পরও ওই গুরুত্বপূর্ণ নেতার মতামত ও পরামর্শ নিতে হচ্ছে স্থায়ী কমিটিকে। এ নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে স্থায়ী কমিটির পদপ্রত্যাশী জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে।বিএনপিতে স্থায়ী কমিটি বরাবরই একটি আকর্ষণীয় ও মর্যাদাসম্পন্ন পদ। আজীবন বিএনপির রাজনীতি করা পোড় খাওয়া নেতাদের টার্গেট থাকে শেষ জীবনে হলেও স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে এ ফোরামে সাংগঠনিকভাবে যোগ্য, পরীক্ষিত, ত্যাগী ও দলে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদেরই স্থান হয়। তাই প্রায় সব জ্যেষ্ঠ নেতার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া।
এ কমিটি নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত, কর্মসূচি প্রণয়ন থেকে শুরু করে সার্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজগুলো করে। স্থায়ী কমিটির সুপারিশের আলোকেই বেশিরভাগ সময় বিএনপির শীর্ষ নেতারা সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। অন্তত খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে।বিএনপির কাউন্সিলের কথা উঠলেই অনেকে স্থায়ী কমিটির পদ বাগিয়ে নিতে নানা কৌশল ও তদবির শুরু করেন। এবার বিএনপির কাউন্সিল কবে হবে তা নিয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ছাড়া জাতীয় কাউন্সিল করার কথা ভাবছে না বিএনপি। আগের কমিটি ঠিক রেখে কমিটির শূন্যপদগুলো পূরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাই দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির পাঁচটি শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে শীর্ষ নেতৃত্ব।
ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে সম্মতিও দিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য রাজনীতি থেকে অবসর নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পরীক্ষিত ও ত্যাগী প্রবীণ নেতার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নেতাদেরও স্থায়ী কমিটিতে স্থান দিতে চায় দলটি।এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নীতিনির্ধারক বলেন, মার্চে দলের নির্বাহী কমিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কিন্তু আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দির এক বছর পূর্ণ হবে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও দেশের বাইরে রয়েছেন। লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, তারা ঘরে থাকতে পারছেন না।
হাজারও নেতাকর্মী রয়েছেন কারাগারে। এমন অবস্থায় নতুন করে দলের জাতীয় কাউন্সিল করার মতো পরিস্থিতি নেই। তাই এখন স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির শূন্যপদ পূরণের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পরামর্শ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছি আমরা। অনুমতি পেলেই শূন্যপদগুলো পূরণ করা হবে।সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল করেছিল বিএনপি। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় নির্বাহী কমিটি তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হবে এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাহী কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত এ কমিটিই দায়িত্ব পালন করবে।
কমিটি ঘোষণার সময়ই ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির দুটি পদ ফাঁকা ছিল। বাকি ১৭ সদস্যের মধ্যে তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ ও এমকে আনোয়ার মারা গেছেন। ফলে বর্তমানে পাঁচটি পদ ফাঁকা। লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া অসুস্থতার কারণে নিয়মিত সময় দিতে পারছেন না। স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ কমিটি ঘোষণার আগে থেকেই ভারতের শিলংয়ে আছেন। তিনি কমিটির একটি বৈঠকেও যোগ দিতে পারেননি।
সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার গুলশান কার্যালয়ে নীতিনির্ধারকদের এক বৈঠকে দলের জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে অলোচনা হয়। স্থায়ী কমিটির একজন সিনিয়র সদস্য বিষয়টি বৈঠকে তোলেন। তবে অন্য সদস্যদের এ ব্যাপারে আগ্রহ না থাকায় এ নিয়ে বেশি আলোচনা হয়নি।বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা বলেন, দলের স্থায়ী কমিটির শূন্যপদ পূরণের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহাসচিবকে নির্দেশনা দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দেখা করতে পারেন। সে সময় চেয়ারপারসনের সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়েও আলাপ করার কথা রয়েছে।জানা গেছে, স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার কথা ভাবছেন। এ নিয়ে ওই দুই নেতা তাদের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কথাও বলেছেন।
সব মিলিয়ে স্থায়ী কমিটিতে সাতটি পদ ফাঁকা হচ্ছে। এসবের অন্তত পাঁচটিতে নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। বাকি দুটি পদ ফাঁকাই রাখা হতে পারে।স্থায়ী কমিটির একটি পদে জিয়া পরিবারের সদস্য ও তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জোবায়দা রহমানের অন্তর্ভুক্তির দাবি রয়েছে দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হওয়ায় ক্লিন ইমেজের ডা. জোবায়দা দলকে গোছাতে পারবেন বলে ধারণা অনেকের।যদিও এ বিষয়ে জিয়া পরিবার কিংবা বিএনপির নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের কোনো নেতা কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থায়ী কমিটির শূন্যপদে আসতে পারেন বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমানের মতো প্রবীণ নেতারা।এদের মধ্যে আবদুল্লাহ আল নোমান ও আবদুল আউয়াল মিন্টু বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার পছন্দের। তারা বিভিন্ন সময়ে আস্থা মূল্য দিয়েছেন।গতবার কাউন্সিলের আগে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আলোচনায় ছিলেন প্রবীণ নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম।এই দু’জনকে স্থায়ী কমিটির শূন্যপদে দেখা যেতে পারে।
গত কাউন্সিলে আলোচনায় ছিলেন ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা ও ড. ওসমান ফারুক। এ দুজনই এখন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তাই শূন্যপদে তাদের কারোরই অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা নেই।ভাইস চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টামণ্ডলী থেকে অন্তত দুজনকে স্থায়ী কমিটিতে পদোন্নতি দেয়া হতে পারে। চট্টগ্রামের প্রবীণ বিএনপি নেতা এম মোরশেদ খান ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান জিয়া পরিবারের বিশ্বস্ত। তাদের কোনো একজনকে দেখা যেতে পারে স্থায়ী কমিটিতে।বয়সের কারণে মোরশেদ খান বাদ পড়লেও মোহাম্মদ শাহজাহানের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপির আইনজীবীদের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন স্থায়ী কমিটিতে আসুক এমনটি চাওয়া অনেকের।খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের এ সদস্য ইতিমধ্যেই আস্থা অর্জন করেছেন বিএনপি নেতাদের কাছে।এছাড়া অপর আইনজীবী নেতা সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনও গত কাউন্সিলে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভূক্তির বিষয়ে আলোচনায় ছিলেন।কমিটি পুনর্গঠন করা হলে তাকেও স্থায়ী কমিটিতে দেখা যেতে পারে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম চাচ্ছে দূরদর্শী ও মাঠে থাকার মতো নেতারা স্থায়ী কমিটিতে আসুক। সেই বিবেচনায় দুজন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নেতাকেও এ পদে অন্তর্ভুক্ত করার কথা উঠছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কোনো মন্তব্য করতে চাননি।তবে দলটির সিনিয়র নেতারা চাচ্ছেন যে করেই হোক শত সঙ্কটেও বিএনপি ঘুরে দাঁড়াক। প্রয়োজনে যেকোনো ছাড় দিতে রাজি তারা। যেমনটি ফুটে উঠেছে গত শুক্রবার বিকালে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকীর আলোচনা সভায়। সেখানে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপিকে এখন ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এ জন্য দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। ২০০৮ সালে এমনিভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পরাজিত হয়েছিলাম। তার পর পরই কিন্তু আমরা দলের কাউন্সিল করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম এবং সারা দেশে আমাদের নেতাকর্মীরা সাহসের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আমরা যারা ব্যর্থ বলে পরিচিত হয়েছি, তাদের পদ ছেড়ে দিতে হবে। তরুণদের জায়গা করে দিতে হবে।




