232112

‘সরকারের ভিত নড়ছে’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মন্তব্য করে বলেছেন, সরকারের আচরণে বোঝা যাচ্ছে তাদের ভিত নড়ছে। শনিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত মুক্তিযোদ্ধা দলের আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘২০১৮ সনের নির্বাচনটা অন্য নির্বাচন থেকে ভিন্ন। এবার জনগণ মুখ খুলেছে। গণতন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে অঙ্গীকার আমরা দিয়েছিলাম তার জবাব দিতে চাই, জবাব নিতে চাই।’মুক্তিযোদ্ধা দলের আলোচনা সভায় নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বৃহস্পতিবারই ঘোষণা হতে পারে এ ইশতেহার। এবারের স্লোগান হতে পারে ‘দেশের মালিক জনগণ, আসছে পরিবর্তন’। এ ছাড়া আরও কয়েকটি স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে ১১ দফা লক্ষ্য সামনে নিয়ে আসা হবে। অন্যদিকে বিএনপি পৃথক একটি ইশতেহার ঘোষণা করবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন ২০৩০-এর আলোকে।

উভয় ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে সংবিধান সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, নতুন ধারার ইতিবাচক রাজনীতির প্রতিশ্রুতিও থাকছে ইশতেহারে। চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষার পাশাপাশি ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার সুস্পষ্ট ঘোষণাও থাকবে প্রতিশ্রুতিতে। এ ছাড়া চাকরিতে যৌক্তিক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটা রেখে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করা হবে। ইশতেহারের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার প্রণয়ন কমিটিতে ছয় সদস্যের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি থেকে সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, গণফোরামের আ ও ম শফিক উল্লাহ, নাগরিক ঐক্য থেকে ডা. জাহেদ-উর রহমান, জেএসডির শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের অধ্যক্ষ ইকবাল সিদ্দিকী ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বেশকিছু চমক থাকবে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও সহাবস্থান— এ তিন অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি ও সরকার পরিচালনার প্রতিশ্রুতি থাকছে ইশতেহারে। ‘জনগণ এ রাষ্ট্রের মালিক’— এ ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত করার নির্দেশনাসংবলিত ইশতেহারে সব মত ও পথ নিয়ে বাংলাদেশকে একটি রংধনু জাতিতে পরিণত করার বিস্তারিত ঘোষণা থাকবে।

তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বিএনপির ইশতেহারে মৌলিক কোনো পরিবর্তন থাকছে না। কারাগারে যাওয়ার আগে খালেদা জিয়া ঘোষিত ৩৭টি বিষয়ে ২৫৬ দফাসংবলিত ‘ভিশন-২০৩০’ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো নিচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কেমন হচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার— জানতে চাইলে প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ‘আমরা যুগোপযোগী ইশতেহার তৈরি করতে চাই। আশা করি, এতে পরিবর্তনের ছোঁয়া থাকবে। আমরা এ নিয়ে কয়েকটি বৈঠক করেছি। একটা পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার তৈরি করে যে কোনো সময় ঘোষণা করা হবে। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট-ঘোষিত ১১ দফার আলোকেই ইশহেতার প্রণয়ন হবে। এ ছাড়া বিএনপির ইশতেহার হবে ভিশন ২০৩০-এর আলোকে।’

ইশতেহার কমিটির আরেক সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা একটি জনকল্যাণকর শান্তির গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চাচ্ছি। আমরা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে চাচ্ছি। খসড়া ইশতেহারে মূলত সাত ফা ও ১১ লক্ষ্য সামনে রেখেই আমরা সব সেক্টর নিয়ে কাজ করছি। এটুকু বলতে পারি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সরকারে গেলে একটি সুন্দর বাংলাদেশ হবে। কারণ, পরিবর্তন আসছে। দেশের বাতাস বদলে গেছে। আমরা বাস্তবমুখী কাজ করতে চাই।’

জানা যায়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের খসড়া ইশতেহারে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি থাকবে। মহান মুক্তিসংগ্রামের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদ্যমান স্বেচ্ছাচারী শাসনব্যবস্থার অবসান করে সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক, শোষণমুক্ত ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার থাকবে।

এ ছাড়া ইশতেহারে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্বাহী ক্ষমতার অবসানে সংসদ, সরকার, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হবে। প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ ও ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে। ৭০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের যুগোপযোগী সংশোধন করা, জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি নিয়োগদানের জন্য সাংবিধানিক কমিশন ও সাংবিধানিক কোর্ট গঠন করা হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগে নীতমালা প্রণয়ন ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হবে।

খসড়া ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ?দুর্নীতি দমন কমিশনকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা হবে। দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতিকে কঠোর হাতে দমন করা হবে। দেশে বিনিয়োগ ?বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি, বেকারত্বের অবসান, শিক্ষিত যুবসমাজের সৃজনশীলতাসহ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে মেধাকে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করে কোটা সংস্কার করা হবে। সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তার বিধান করা, কৃষক, শ্রমিক ও দরিদ্র জনগণের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও পুষ্টি সরকারি অর্থায়নে সুনিশ্চিত করা হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হবে। খসড়ায় আরও বলা হয়, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে দুর্নীতি ও দলীয়করণের থাবা থেকে মুক্ত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার করা হবে। জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুষম বণ্টন, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূরীকরণ ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বেতন-মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। এতে আরও বলা হয়, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন এবং প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ও নেতিবাচক রাজনীতির বিপরীতে ইতিবাচক সৃজনশীল ও কার্যকর ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা হবে। কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

খসড়া ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বদেশে ফেরত ও পুনর্বাসনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষাবাহিনী আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি ও সমরসম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগী করা হবে। এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এ মুহূর্তে বিএনপি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি রাজনৈতিক দল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০-দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচনের জন্য ইশতেহার তৈরির কাজ চলছে। আগামী দিনে দেশ ও জনগণের জন্য আমরা কী কী করতে চাই তা আমাদের দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ভিশন ২০৩০-এ উল্লেখ করেছেন। ইতিমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও ১১টি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সবকটির সমন্বয় করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার ঘোষণা করা হবে।’সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল

ad

পাঠকের মতামত