218487

‘বেতনের কথা বলতেই অন্য বাসায় বিক্রি করে দিতো’

‘সারা দিন-রাত কাজ করাইতো। তার উপর কিচ্চু খাইতে দিতো না। খাওন চাইলে মারধইর করতো। দেশে ফিরতে চাইলে অন্য বাসায় বিক্রি কইরা দিতো।’ সৌদিতে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলেন গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে দেশে ফিরে আসা কিশোরগঞ্জের নারী মুনিরা বেগম (ছদ্মনাম)।

মুনিরা বলেন, ‘এক দালালের মাধ্যমে দুইমাস আগে সুখের লাইগা গেছিলাম সৌদি। যে বাসায় কাজ করতাম খুব মাইরতো। দুই মাস বেতন দেয়নাই। পরে আবার রাব্বী নামে এক অফিসে আমারে ২৫ হাজার রিয়ালে বিক্রি করে দেয়। বাড়িতে ফোন করতে চাইলে আরো বেশি মাইরতো।’

গতকাল রবিবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে সৌদির এয়ার এ্যারাবিয়া এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দুই নম্বর টার্মিনাল এসে পৌঁছান মুনিরা। শুধু মুনিরা নয়, আরো এমন ২৯ জন নারী শ্রমিক দিনবদলের স্বপ্নে সৌদিতে গেলেও নানা লাঞ্ছনা-নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষমেশ বুকভরা হতাশ আর দেশে ফিরে কিভাবে কী করবেন সেই দুশ্চিন্তা নিয়ে দেশে ফিরেন।

ভিড়ভাট্টার মধ্যে প্রথমে কেউই কথা বলতে রাজি হয়নি। তবে কিছু আর্তনাদ ভেসে আসছিলো সবার মধ্য থেকে। যে, ‘নির্যাতিত হওয়ার কথা জানতে পারলে পরিবারের সদস্যরা ঘরে উঠতে দেবে না। বেতন দিতো না, মাইরধর করতো, খাইতে দিতোনা, সৌদি আরবে নারী গৃহশ্রমিক পাঠানো বন্ধ করুন, দয়া করে।’

স্বামী হারানো দুই সন্তানের জননী আয়েশা বাবার বাড়ি নওগাঁতে থাকতেন। গ্রামের দালালের খপ্পড়ে পড়ে বেশি বেতনের লোভে সৌদি যান। স্বপ্ন ছিলো সৌদিতে কাজ করে টাকা পাঠাবে, দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়বেন তিনি। কিন্তু স্বপ্নটা যে দুঃস্বপ্ন হয়ে নিজের সাথে করে ফিরবে তা তিনি জানতেন না।

তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর কাজ করেছেন, কিন্তু তাকে মাত্র ১৩ মাসের বেতন দেওয়া হয়েছে। বাকি ১১ মাসের বেতন তিনি পাননি। বেতনের কথা বলতেই মারধর করতো। কাজ করবেন না বললে তাকে তার মালিক রাস্তায় ফেলে যায়। তখন সৌদি পুলিশ তাঁকে আটক করে, প্রায় এক সপ্তাহ জেল খেটে সে গতকাল দেশে ফেরত আসে।

সৌদি ফেরত আরও কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, দেশে ফেরার অপেক্ষায় জেদ্দার ডিপোর্ট সেন্টারে তাদের মতো কয়েকশ’ বাংলাদেশি নারী আছেন। এরমধ্যে কেউ কেউ ২-৩ বছর ধরে সেখানে আছেন। কারণ, তাদের কফিল তাদের নামে মামলা করেছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা দেশে ফিরতে পারবেন না।

ফিরে আসা নারী শ্রমিকরা আরও জানান, প্রতিদিনই রিয়াদ এবং জেদ্দার সেফহোমে ২-৩ জন করে নারী গৃহশ্রমিক আশ্রয় নিতে আসেন। এখনও জেদ্দার সেফহোমে একশ’র মতো নারী আছেন। এরমধ্যে অনেকে আবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামে কর্মরত শরীফুল ইসলাম এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য কর্মকর্তা আল আমিন নয়ন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ব্র্যাকের আবেদনের ভিত্তিতে ৪ জন নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। তাদের সঙ্গে আরও ২৫ জন ছিলেন বলে জানতে পেরেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘তাদেরকে পাঠানোর আগেই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আমি যেহেতু পারবোনা আমার বোনকে এমন নরকে পাঠাতে, তেমনি কেউ জেনে তাঁর আপনজনদের এমন ভয়ানক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পাঠাতে রাজি হবে বলে মনে হয়না।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১৯ মে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন ৬৬ জন নারী শ্রমিক। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মে ৩৫ জন, ১২ মে ২৭ জন, ১৯ মে ৬৬ জন, ২৩ মে ২১ জন এবং ২৭ মে ৪০ জন নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের আবেদনের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ৮০ জন নারী শ্রমিককে। রবিবার রাতে ফেরত আসা ২৯ জন নারী শ্রমিকের মধ্যে ৪ জন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের আবেদনের প্রেক্ষিতে দেশে এসেছেন।

উল্লেখ্য, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মক্ষেত্র স্বল্পতার কারণে নারীরা বেছে নেন অভিবাসন ব্যবস্থা। নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান সুদূর সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লেবাননসহ বিশ্বের ১৮টি দেশে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সালে অভিবাসী নারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন, যা মোট অভিবাসীর সংখ্যার ১৩ শতাংশ। এ সংখ্যা এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত একা অভিবাসন প্রত্যাশী নারী শ্রমিককে অভিবাসনে বাধা দেওয়া হলেও ২০০৩ এবং ২০০৬ সালে এ প্রবণতা কিছুটা শিথিল করা হয়। ২০০৪ সালের পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নারী শ্রমিকের অভিবাসন হার ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মোট অভিবাসনের ১৯ শতাংশে। কিন্তু এই হার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম।

ad

পাঠকের মতামত