198668

‘মরার আগে আমার শেষ ইচ্ছা পূরণ কর’

‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। মরার আগে তোরা আমার শেষ ইচ্ছা পূরণ কর। আমার আব্বার সঙ্গে দেখা করতে দে।’ এভাবেই আকুতি জানাচ্ছিলেন র‌্যাগিংয়ের শিকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী।

ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানার কাইকোরিয়াকান্দা গ্রামের অদম্য মেধাবী মো. মিজানুর রাহমান সদ্য ক্লাস শুরু করেছে জাবির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। গ্রামের প্রকৃতির সঙ্গে অতি সহজ-সরল ভাবেই বেড়ে ওঠা তার। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এই ‘সহজ-সরল’ আচরণই কাল হয়েছে তার জীবনে।

চালাক আর চাতুর্য শেখানোর নামে বিভাগের সিনিয়ররা তাকে মানসিক ও শারীরিক চাপ প্রয়োগ করে মানসিক ভারসাম্যহীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। শুক্রবার রাতে তার পিতা দেখা করতে এলে সে কাউকে চিনতে পারেনি। বলেছে অসংলগ্ন কথা-বার্তা।

জুনিয়র শিক্ষার্থীদের সঙ্গে করা এমন বর্বর ও নিষ্ঠুর আচরণে হতবাক গোটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। অপরদিকে একমাত্র ছেলের মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখে ভেঙে পড়েছে মিজানুরের পিতা-মাতাসহ পুরো পরিবার। মিজানুরের বন্ধুরা জানান, বুধবার দুপুরে বিভাগের ৪৬তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা তাদের (৪৭তম আবর্তন) সঙ্গে পরিচিত হওয়ার নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। মিজানুর সরল-সোজা হওয়ার কারণে সিনিয়ররা তাকে আলাদাভাবে অকথ্য ভাষায় গালি দেয়াসহ শারীরিক নির্যাতন করে। এছাড়া সংযুক্ত শহীদ সালাম বরকত হল ছেড়ে আ. ফ. ম. কামালউদ্দিন হলে আসতেও সে হলের সিনিয়রা চাপ প্রয়োগ করেছিল। এমনকি সেখানে তাকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছে বলে তার আচরণের মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছিল, যা সে মানসিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। এরপর বৃহস্পতিবার দুপুরে আবারও তাকে বিভাগের সিনিয়ররা ধমক ও হুমকি দিয়েছে বলে জানা যায়।

এ ঘটনার পর মিজানুর বৃহস্পতিবার রাত থেকে হলে অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। হলের সিনিয়র শিক্ষার্থীরা তাকে দেখতে এলে ‘তুই আমার জীবন শেষ করেছিস, তোরা আমাকে মেরে ফেলবি’ এমন অসংলগ্ন আচরণ করতে থাকে। এমনকি শুক্রবার দুপুরে সে তার বন্ধুদের বলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে ‘শেষবারের মতো তোরা আমার আব্বার সঙ্গে দেখা করতে দে’।

তার পরিবারকে বিষয়টি জানানো হলে রাতে তার পিতা ও চাচা ক্যাম্পাসে আসে। সাক্ষাতে স্বজনদের মিজানুর চিনতে পারেনি। ঘটনা শুনে হলের সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়। সেখানে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। স্বজন ও শিক্ষার্থীদের অভয় দেয়া সত্ত্বেও সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ডাক্তারের রুমে প্রবেশ না করে উদ্ভট আচরণ করতে থাকে। ছেলেকে এ অবস্থায় দেখে নিমিশেই চাপা কান্নায় ভেঙে পড়েন মিজানুরের পিতা।

ডাক্তারের কাছে যেতে অস্বীকার করে সে বলে, ‘মায়ের সঙ্গে দেখা করবো, তোরা আমার মায়ের কাছে নিয়ে চল’। এমতাবস্থায় ডাক্তারের রুমের দরজার সামনে বসিয়ে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। এরপর বিশ্রামের জন্য সাভারে তার চাচার বাসায় নেয়া হয়।

শনিবার দুপুরে চাচা জয়নাল আবেদীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মিজানুরের অবস্থার অবনতি হয়েছে। সে কোনো স্বজনকেই চিনতে পারছে না। এমনকি কাউকে দেখলেই সে ভয় পাচ্ছে।’ উন্নত চিকিৎসার জন্য তার মানসিক ডাক্তারের কাছে নিবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে র‌্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকা সন্দেহে শুক্রবার রাত ১টার দিকে বিভাগের ৪৬তম আবর্তনের মামুন, হিমেল, সুদীপ্ত ও ক্লাস প্রতিনিধি আনোয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এটিএম আতিকুর রহমান বলেন, জিজ্ঞাসাবাদকালে তারা র‌্যাগিংয়ের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। তবে তাদের কথা শুনে যতটুকু বোঝা গেছে তারা র‌্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল।

কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় একাডেমিক বৈঠকে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আজীবন বহিষ্কারের সুপারিশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমরা আবেদন জানাবো। এদিকে র‌্যাগিংয়ের ঘটনার জড়িতদের নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। সূত্র: মানবজমিন

ad

পাঠকের মতামত