এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ঋণবিস্তার: অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির সুযোগ ও ঝুঁকি
বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় এজেন্ট ব্যাংকিং এখন আর শুধু প্রত্যন্ত অঞ্চলে টাকা জমা, উত্তোলন বা প্রবাসী আয় গ্রহণের বিকল্প মাধ্যম নয়; ধীরে ধীরে এটি ঋণপ্রবাহেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেলে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ এপ্রিল-জুন ২০২৬-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানত ৫১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একই সময়ে এ চ্যানেলে ঋণ বিতরণও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো প্রচলিত ব্যাংক শাখার উপস্থিতি সীমিত। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ২০,৩৩৯টি সক্রিয় আউটলেটের ৮৫.৪ শতাংশই ছিল গ্রামাঞ্চলে। অর্থাৎ ব্যাংকিং অবকাঠামোর বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এজেন্ট ব্যাংকিং ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, এই প্ল্যাটফর্ম শুধু সঞ্চয় সংগ্রহ করছে না; ঋণও পৌঁছে দিচ্ছে। মার্চ ২০২৬-এ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের পরিমাণ আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৭.৭৯ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩৭ হাজার ৭৫২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। একই সময়ে ঋণ-আমানত অনুপাত বেড়ে ৭৪.১৬ শতাংশ হয়েছে। তবে এখানেই নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়—ঋণের পরিমাণ বাড়লেই কি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ে? উত্তরটি সরল নয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আউটলেট কোনো ঋণ কার্যক্রমে যুক্ত ছিল না। অর্থাৎ বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি হলেও ঋণসেবা এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত কিছু আউটলেটে কেন্দ্রীভূত।
তাই ভবিষ্যতের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘কত টাকা ঋণ দেওয়া হলো তা নয়; বরং ‘কারা ঋণ পেল, কেন পেল এবং সেই ঋণ অর্থনীতিতে কী ফল তৈরি করল’—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা ও নিম্নআয়ের মানুষের উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে ঋণ পৌঁছালে এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি তৈরি করতে পারে। বিপরীতে ঋণের বড় অংশ যদি অনুৎপাদনশীল খাতে যায় বা ঋণগ্রহীতার পরিশোধ সক্ষমতা বিবেচনা না করে ঋণ বিতরণ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এখানে প্রবাসী আয়ের সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সংযোগও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৮,৯৬০ কোটি টাকা প্রবাসী আয় এসেছে, যার ৯০ শতাংশের বেশি গেছে গ্রামাঞ্চলে। ফলে একটি সম্ভাবনাময় আর্থিক চক্র তৈরি হতে পারে—প্রবাসী আয় থেকে সঞ্চয়, সঞ্চয় থেকে ঋণ, এবং ঋণ থেকে কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ।
নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও অগ্রগতি দৃশ্যমান। মার্চ ২০২৬-এ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট হিসাবের প্রায় ৪৯.৭ শতাংশ নারীদের নামে ছিল। তবে হিসাব খোলার সঙ্গে ঋণপ্রাপ্তির সমতা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
অতএব, এজেন্ট ব্যাংকিংকে শুধু ‘শাখার বিকল্প’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে বাংলাদেশের ডিজিটাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তবে এর জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীল ঋণনীতি, স্বচ্ছ সুদহার, কার্যকর গ্রাহক সুরক্ষা, ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা যাচাই এবং ডিজিটাল ও আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি। সামনে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ঋণবিস্তারকে কীভাবে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে যুক্ত করা যায়। সঠিক নীতি ও তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এজেন্ট ব্যাংকিং শুধু ব্যাংকিং সেবার ভৌগোলিক সীমা কমাবে না; বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে পুঁজি প্রবাহ বাড়িয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে। আর সেই কারণেই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘ঋণ কত বাড়ল’ নয়—‘ঋণ কতটা মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াল?’

আমিনুল হক রাসেল
পিএইচডি ফেলো, ফিনান্স বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ। এবং
সহকারী অধ্যাপক, ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি।









