371183

বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় গভীর সংকট: জলবায়ু পরিবর্তন ও যুদ্ধের যৌথ আঘাত

কামাল হোসেন।।  বিশ্ব এক ভয়াবহ খাদ্য সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চিত প্রকৃতি ও বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ-সংঘাত মিলেমিশে এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৯২০ মিলিয়ন মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছেন না—যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যা। এই পরিস্থিতি শুধু মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন তীব্র হচ্ছে। অস্বাভাবিক গরম, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও ভয়াবহ বন্যা একদিকে কৃষিজমি ধ্বংস করছে, অন্যদিকে ফসল উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।

  • দক্ষিণ এশিয়া: বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের বহু কৃষক একদিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ফসল হারাচ্ছেন, অন্যদিকে দীর্ঘ খরায় চাষাবাদ করতে পারছেন না। ফলে বাজারে খাদ্যের সরবরাহ কমছে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ছে।

  • আফ্রিকা: সাহেল অঞ্চল ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে অনাবৃষ্টি ও খরার কারণে কোটি কোটি মানুষ খাদ্য ঘাটতিতে পড়েছেন।

  • লাতিন আমেরিকা: দীর্ঘমেয়াদি খরায় সয়াবিন, ভুট্টা ও কফি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে কৃষিজ উৎপাদন শুধু কমেই যাচ্ছে না, কৃষকদের জীবিকাও সংকটে পড়ছে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং দারিদ্র্যের মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব

জলবায়ুর পাশাপাশি সশস্ত্র সংঘাতও খাদ্য সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

  • ইউক্রেন যুদ্ধ: ইউক্রেন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গম রপ্তানিকারক দেশ। চলমান যুদ্ধের কারণে কৃষিজ উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার অনেক দেশের খাদ্য সরবরাহে।

  • আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য: সুদান, ইয়েমেন ও কঙ্গোতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং দাঙ্গার কারণে কৃষকরা জমিতে কাজ করতে পারছেন না। ফলে ফসল কাটার সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে, এবং লাখো মানুষ অনাহারে ভুগছেন।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) সতর্ক করে জানিয়েছে, যুদ্ধ ও জলবায়ুর মিলিত প্রভাব এখন এক অভূতপূর্ব মানবিক সংকট তৈরি করেছে।

অর্থনীতি ও সমাজে প্রভাব

খাদ্যের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছে। পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ায় শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বাড়ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। খাদ্য সংকটের কারণে শিক্ষায় অংশগ্রহণও কমছে, কারণ অনেক পরিবার বেঁচে থাকার সংগ্রামে শিশুদের স্কুল থেকে সরিয়ে কাজে পাঠাচ্ছে। এছাড়া সামাজিক অস্থিরতা ও অভিবাসনের ঝুঁকিও বাড়ছে।

সমাধানের পথ: আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য

খাদ্য সংকট মোকাবিলায় শুধু জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দরকার বৈশ্বিক সমন্বিত পরিকল্পনা।

  • উন্নত দেশগুলোকে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

  • উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি, খরা-সহিষ্ণু বীজ ও পানি-সাশ্রয়ী চাষাবাদ ছড়িয়ে দিতে হবে।

  • যুদ্ধ-সংঘাত নিরসনে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

  • খাদ্য সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক সমন্বয় জোরদার করতে হবে, যাতে সঙ্কটকালীন সময়ে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ইতিমধ্যেই উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা ও প্রযুক্তি নির্ভর কৃষিকাজে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করতে হলে বৈশ্বিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

সতর্কবার্তা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী কয়েক বছরে খাদ্যের দাম আরও বাড়বে এবং অনাহারের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর প্রভাব পড়বে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শ্রমবাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। জাতিসংঘ আগামী সম্মেলনে খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রধান আলোচ্যসূচি হিসেবে রাখার পরিকল্পনা করছে, যাতে একটি বৈশ্বিক সমাধানের পথ খোঁজা যায়।

উপসংহার

খাদ্য নিরাপত্তা আজ শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এ সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তি, জ্ঞান ও সম্পদ ভাগাভাগি করা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং মানবিক দায়িত্ববোধ একসঙ্গে কাজ করলেই কেবল এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হবে। অন্যথায় লাখো মানুষের জীবন বিপন্ন হবে এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা আরও তীব্র হবে।

ad

পাঠকের মতামত