350432

করোনায় মৃত মুসলমানদের পু’ড়িয়ে ফেলছে শ্রীলঙ্কা

করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ২০ দিন বয়সী এক মুসলিম শিশুকে পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পু’ড়িয়েছে শ্রীলঙ্কা। গত সপ্তাহে নির্মম এ ঘটনা ঘটে। মহামারি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত করোনায় মারা যাওয়া অন্তত ১৫ মুসলিমকে পু’ড়িয়ে সমাহিত করেছে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি।

মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কবরে দাফন অথবা পু’ড়িয়ে ফেলার নির্দেশনা রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায়। লঙ্কান কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ নির্দেশনাও মানছে না।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে বা সন্দেহভাজন করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হলে তাকে পু’ড়িয়েছে ফেলা বাধ্যতামূলক করে মার্চে আদেশ জারি করে শ্রীলঙ্কা।

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর সবচেয়ে বড় উপশহর বোরেলার শ্মশানে জোরপূর্বক শেখ নামের এক শিশুকে ৯ ডিসেম্বর পোড়ানো হয়। ২০ দিন বয়সী ওই শিশুসহ এ পর্যন্ত অন্তত ১৫ জনকে পোড়ানো হয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে মানা হয়নি ধর্মীয় বিধান।

শেখের বাবা এমএফএম ফাহিম আল জাজিরাকে জানান, ছোট্ট শিশুকে পু’ড়িয়ে ফেলার দৃশ্য দেখার মতো সাহস ছিল না বিধায়, সন্তানের শেষ বিদায় আয়োজনে অংশ নিতে পারেননি তিনি।

‘আমি তাদের বলেছি, যেখানে আমার সন্তানকে পোড়ানো হবে সেখানে আমি উপস্থিত হতে পারব না। আমরা আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসা করেছিল, অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া কীভাবে তাদের সন্তানকে পোড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’ আলজাজিরাকে বলেন ফাহিম।

ফাহিম আরও বলেন, কর্তৃপক্ষ বলেছে, এই শিশু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তাই তাকে পু’ড়িয়ে ফেলতে হবে। এ কারণে তারা আমার সন্তানকে তাড়াহুড়ো করে পু’ড়িয়ে ফেলতে ছুটে যায়। আমরা যখন প্রশ্ন করেছি, আপত্তি জানিয়েছি, তারা আমাদের সঠিক কোনো জবাব দিতে পারেনি।

‘জোরপূর্বক না পু’ড়িয়ে তারা যদি আমাদের দাফন করার সুযোগ দিত তাহলে অন্তত শান্তি পেতাম। আল্লাহর বান্দা আল্লাহ নিয়ে গেছে, আমাদের কিছু করার নেই। কিন্তু তারা তো ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফনই করতে দেয়নি। বরং বর্বরভাবে পু’ড়িয়ে ফেলা হয়েছে। সরকারের আচরণ মেনে নিতে পারছি না।’ বলেন ফাহিম।

মারা যাওয়ার পর মুসলিম এবং খ্রিস্টানদের করবে দাফন করার রীতি রয়েছে। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পু’ড়িয়ে ফেলা বাধ্যতামূলক করায় সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর লোকজন অসহায় হয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ।

দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের সাবেক গভর্নর এবং ন্যাশনাল ইউনিটি অ্যালায়েন্সের (এনইউএ) নেতা আজাথ স্যালি বলেন, এটি সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্ত। সংখ্যালঘুদের অনুভূতিতে আঘাত করছে সরকার। তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা এবং মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।

‘তারা ২০ দিনের শিশুকেও ছাড় দেয়নি। সন্তান হারানো বাবা-মায়ের বেদনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তারা। জোরপূর্বক তো পু’ড়িয়েছেই, তারপর শেখের পরিবারকে পোড়ানো খরচ বাবদ ৩০০ মার্কিন ডলার পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।’ বলেন স্যালি।

সংখ্যালঘুদের বিশ্বাস এবং তাদের মরদেহ দাফনের অনুমতি দিতে শ্রীলঙ্কা সরকারকে বাধ্য করতে দেশটির ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্যালি।

শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে দাফন করা হলে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হবে।

৪ নভেম্বর বাধ্যতামূলক পু’ড়িয়ে ফেলার নীতি পুনর্বিবেচনার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে সরকার। ২২ নভেম্বর কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদেনে কোনো কারণ উল্লেখ না করেই পোড়ানোর নীতিকে সমর্থন দেওয়া হয়।

দাফনকে ধর্মীয় এবং মৌলিক অধিকার উল্লেখ করে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে মুসলিম এবং খ্রিস্টানরা পিটিশন দায়ের করেন। ১ ডিসেম্বর তাদের সেই আবেদন খারিজ করে দেন আদালত।

২ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার শ্রীলঙ্কায় মুসলমানদের হার ১০ শতাংশের মতো। ২০০৯ সালে তামিল বিচ্ছন্নতাবাদী এবং সরকারের মধ্যকার গৃহযুদ্ধ নিরসনের পর থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনহালা বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের দ্বারা অব্যাহতভাবে আক্রমণের শিকার হয়ে আসছেন মুসলমানরা।

গত বছর ইস্টার সানডেতে গির্জায় ভয়াবহ হামলার পর দু’জাতির সম্পর্কে আবারও ফাটল ধরে। ওই হামলার দায় স্বীকার করে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস।

‘মরদেহের স্তূপ বাড়ছে’

করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়াদের পু’ড়িয়ে ফেলার সরকারি নীতির বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করছেন ক্ষুব্ধ মুসলিমরা। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা পোড়ানোর খরচ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তারা।

গত সপ্তাহে কলম্বোর মর্গে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া মুসলমানদের মরদেহের মধ্যে ৭৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ জেফরির মরদেহও ছিল। ২৬ নভেম্বর তিনি মারা যান।

আলজাজিরাকে তার ভাতিজা মোহাম্মদ ফারুক মোহাম্মদ আফরাফ এখনো জানেন না, তার চাচার মরদেহ শেষমেশ দাফন করা হয়েছে কি না। ‘চাচা মারা যাওয়ার পর, আমরা আর মর্গে যাইনি। তাই আমরা জানি না, কী হয়েছে।

‘আমাদের ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী মরদেহ পোড়ানো নিষিদ্ধ। তারা যা করছে তা আমরা সমর্থন করি না। আমরা তাদের সম্মতিও দেইনি। আমি তাদের জানিয়েছি, মরদেহ রেখে দেওয়ার জন্য। আমরা আমাদের রীতি অনুযায়ী দাফন করব।’ বলেন, মোহাম্মদ ফারুক।

চলতি মাসে মুসলমানদের মরদেহ পোড়ানোর প্রতিবাদে শ্রীলঙ্কার উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় এলাকাজুড়ে বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ হয়। ক্ষোভ প্রদর্শনের অংশ হিসেবে স্থানীয় শ্মশানের গেটে সাদা ফিতা ঝুলিয়ে রেখে যান তারা।

সামাজিক মাধ্যমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন অনেকে। তাদের অভিযোগ করোনা মহামারিকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে সংখ্যালঘুদের আরও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করছেন; বিশেষ করে মুসলমানদের।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটি বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে সরকারকে শ্রীলঙ্কার সব নাগরিকের প্রতি সুবিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, করোনা ভাইরাসকে ইস্যু করে জাতিগত, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় পার্থক্যের ভিত্তিতে বৈষম্যের কোনো সুযোগ নেই। শ্রীলঙ্কা সরকারেরও বৈষম্য করা উচিত নয়।

বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় সরকারের মুখপাত্র কেহেলিয়া রামবুকওয়েলা বলেন, বিশেষজ্ঞ কমিটি পোড়ানো নীতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। দাফনের অনুমতি দিয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো সুযোগ সরকারের নেই। কারণ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলছে সরকার।

‘এ ছাড়া আমরা যখন মুসলমানদের উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে চাই, তখন বৌদ্ধ সম্প্রদায় বলছে, সরকারের পু’ড়িয়ে সমাধিস্থ করার প্রক্রিয়ায় তাদেরও চূড়ান্ত কিছু রীতি লঙ্ঘিত হচ্ছে; খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও আপত্তি জানাচ্ছে। মোট কথা এটি একটি জটিল পরিস্থিতি।’ বলেন কেহেলিয়া রামবুকওয়েলা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা দাফন বা পোড়ানো দুইটার কথাই বলা হলেও কেনো শ্রীলঙ্কা পোড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে কেহেলিয়া বলেন, এটি অনেক শক্ত বিতর্ক। বিষয়টি বিশেষজ্ঞ কমিটির সামনে উত্থাপন করা হবে।

শ্রীলঙ্কার আহ্বানে সাড়া দেওয়ায় মালদ্বীপের নিন্দা

শ্রীলঙ্কার মুসলমানরা প্রতিবেশী মালদ্বীপের ওপরও ক্ষুব্ধ। মালে জানায়, শ্রীলঙ্কার সরকার করোনায় আক্রান্ত মুসলমানদের মালদ্বীপে দাফনে সহায়তা চেয়ে অনুরোধ করেছে। তাদের আহ্বান বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও জানায় মালে।

গত সপ্তাহের শুরুতে মালদ্বীপের কর্মকর্তা জানান, দেশটির প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম মোহামেদ সলিহ শ্রীলঙ্কা সরকারের কাছ থেকে দাফনের অনুমতি-সংক্রান্ত একটি অনুরোধ পেয়েছেন।

টুইট বার্তায় মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ শাহিদ বলেন, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম সলিহকে বিশেষ অনুরোধ করা হয়েছে। তা হলো, শ্রীলঙ্কায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া মুসলমানদের মালদ্বীপে ইসলামিরীতি অনুযায়ী দাফনের ব্যবস্থা করার অনুরোধ। মালদ্বীপের সরকার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

মালদ্বীপে আপনজনদের দাফনে সরকারি পরিকল্পনায় উদ্বেগ জানিয়েছে শ্রীলঙ্কার মুসলমানরা।

জোরপূর্বক পোড়ানোর কট্টর বিরোধিতাকারী এবং সাবেক সংসদ সদস্য আলি জাহির মাওলানা আলজাজিরাকে বলেন, আমরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। মালদ্বীপে মরদেহ রফতানি করতে দেব না আমরা। নিজেদের মাটিতে আমাদের দাফন হবে।

‘অবশ্যই মালদ্বীপের সরকার সাধুবাদ পেতে পারে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের জন্য এটি জুতার বাড়ি। আমরা সবাই এখানে জন্মেছি। আমরা এখানে বসবাস করছি। এ ভূমিতে আমরা মরতে চাই।’ বলে, আলি জাহির।

সূত্র: আলজাজিরা।

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *