পাকিস্তানে ভারতের হয়ে খেলছেন নওয়াজ শরিফ: ইমরান খান
প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমানে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক নওয়াজ শরিফ ‘ভারতের হয়ে খেলছেন’ বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে রাজনৈতিক বিভক্ত যখন তুঙ্গে তখন তিনি এ মন্তব্য করলেন।
পাকিস্তানের তেহরিক ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান ২০১৮ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসেন। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) প্রচার হওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে গিয়ে তিনি (নওয়াজ) এখন ভারতের খেলা খেলছেন। তিনি সেখানে বসে পাকিস্তানকে আক্রমণ করছেন। তাকে শতভাগ সমর্থন দিচ্ছে ভারত। তিনি একটা কাপুরুষ, এ ছাড়া তিনি কিছুই করতে পারেননি।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্রমাগত সরকারকে আক্রমণ করে যাচ্ছেন নওয়াজ শরিফ। ইমরান খান সরকারকে উৎখাতে তার দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) বিরোধী জোটে অংশ নিয়েছে। এসবের জবাবে নওয়াজ শরিফের তীব্র সমালোচনা করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন নওয়াজ। রক্তের প্লাটিলেট জটিলতা নিয়ে চিকিৎসার জন্য তিনি যখন পাকিস্তান ছাড়েন তখন তার জীবন হুমকিতে বলে জানান চিকিৎসকরা। ২০১৮ সালে দুর্নীতির অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছিল নওয়াজকে। চিকিৎসার জন্য আবেদন করায় আদালত তাকে দেশ ছাড়ার অনুমতি দেয়।
বৃহস্পতিবার সকালে নওয়াজ শরিফ দলীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ভিডিও লিংকে সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার দুর্নীতিবিরোধী বিচারের নামে দ্বিচারিতা করছে।
সোমবার পাকিস্তানের দুর্নীতি দমন কমিশন নওয়াজের ছোট ভাই পিএমএল-এনের প্রেসিডেন্ট শাহবাজ শরিফকে গ্রেফতার করে। এর আগে দুর্নীতির মামলায় জামিন আবেদন করেন শাহবাজ। আবেদন নাকচ করে দিয়ে তাকে আটক করা হয়।
নওয়াজ শরিফ, সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (ফজল গোষ্ঠী) প্রধান ফজল-উর রেহমান ও অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করে ইমরান খান দুর্নীতি দমন আন্দোলনকে তার শাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছেন।
শাবহবাজ শরিফের ছেলেসহ বিরোধী দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা এখন কারাগারে। বাকিদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলছে। আদালত থেকে জামিনে আছেন বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী।
সমালোচকরা বলেছেন, একপক্ষীয় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলছে। যার মাধ্যমে ইমরান খান প্রচ্ছন্নভাবে তার রাজনৈতি বিরোধীদের আইনের মুখোমুখি করছেন। একই সময়ে পিটিআই এবং তাদের জোটসঙ্গীরা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জুলাইতে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট দুর্নীতির একটি মামলার রায়ে জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন রাজনৈতিক বিভাজনের একপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নারাজ। যাদেরকে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার এবং জেলে নেয়া হচ্ছে তাদেরকে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই মাসের পর মাস বছরের পর বছর আটকে রাখা হচ্ছে।
গেলো মাসে শরিফের পিএমএল-এন, পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি), জেইউ-আই-এফসহ বেশ কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক দল ছোট দলগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) নামে একটি আন্দোলন শুরু করে। সেখানে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরকারে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলেন তারা।
পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া পাকিস্তানের ৭৩ বছরের ইতিহাসের অর্ধেক সময় দেশটিকে শাসন করছেন। তার নিয়ন্ত্রণে পররাষ্ট্র এবং নিরাপত্তানীতিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে।
ইমরানের শাসনামলে সেনাবাহিনী দেশটির সরকারে ব্যাপকভাবে তৎপরতা বাড়িয়েছে। সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন আর্থিক বিষয়ে কাজ করছে তারা। ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে শীর্ষ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনী। অংশ নেয় করোনা ভাইরাস মোকাবিলায়ও।
প্রতিপক্ষের অভিযোগ, ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন ইমরান খান। দুর্নীতিবিরোধী অভিযোনের মাধ্যমে বিরোধীদের কোণঠাসা করছেন বলেও তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ। যদিও এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার প্রচারিত সাক্ষাৎকারে, সরকারে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপকে কিছু মানুষের ভুল ধারণা বলে আখ্যা দেন ইমরান খান। বলেন, অতীতে যখন সেনাবাহিনী কোনো ভুল করেছে, আমরা কি তাদের অপমান করেছি? অতীত থেকে শুধু শিক্ষা নেয়া যায়। আমি কি শিখলাম? আমরা শিখেছি সরকার চালানো সেনাবাহিনীর কাজ নয়।
২০১৭ সালে দুর্নীতির অভিযোগে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজ শরিফককে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে তাকে কারাদণ্ড দেয়া হয়। সাধারণ নির্বাচনের কয়েক দিন আগে এ ঘটনা ঘটে।
গত সপ্তাহের শুরুতে নওয়াজ অভিযোগ করেন, ২০১৪ সালে ইমরান খানের নেতৃত্বে ইসলামাবাদে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে দেশটির গোয়েন্দা প্রধান জাহির উল-ইসলাম তার সরকারকে উৎখাতের হুমকি দিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার সরকার পরিচালিত পাকিস্তানের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অপরাধী এবং ফেরারি আসামির বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশ থেকে বিরত থাকার জন্য একটি নির্দেশনা জারি করে। যা ইমরান খানের আমলে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আরেকটি পদক্ষেপ।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইথআউট বর্ডারের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম তালিকায় ১৮০টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৪৫।






