335211

আরব আমিরাত ফিলিস্তিনিদের পিঠে ছু’রি মেরেছে : তুরস্ক, ইরান

ডেস্ক রিপোর্ট।। আরব দেশগুলোর মধ্যে প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চুক্তিতে পৌঁছেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দীর্ঘদিন ধরেই দেশ দুটির মধ্যে সতর্কতার সঙ্গে বাণিজ্য এবং প্রযুক্তিখাতে যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তথাকথিত ‘আব্রাহাম চুক্তির’ বিষয়টি ঘোষণা করেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দখলকৃত পশ্চিমতীরে নিজেদের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রত্যাহারে রাজি হয় ইসরাইল।

যদিও পরে তেল আবিবে সংবাদ সম্মেলনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা স্থগিত করতে রাজি হয়েছেন তিনি। তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখনো বিবেচনাধীন বলে জানান নেতানিয়াহু।

জর্ডান এবং মিশরের পর তৃতীয় আরব দেশ হিসেবে ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তিতে সম্মত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকটের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরোইলের চুক্তিকে কিভাবে দেখছেন বিশ্ববাসী?

ফিলিস্তিন: এক বিবৃতিতে চুক্তির নিন্দা জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা নাবিল আবু রুদেইহে একটি বিবৃতিতে পড়ে শোনান। মাহমুদ আব্বাসের পক্ষে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিস্ময়কর ঘোষণা প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি চুক্তির নিন্দা জানাচ্ছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।

দখলকৃত পশ্চিমতীরের রামাল্লা শহরে আব্বাসের প্রধান কার্যালয়ের বাইরে সংবাদ সম্মেলনে আবু রুদেইনেহ বলেন, ইসরাইল-আমিরাতের চুক্তি জেরুজালেম, আল আকসা এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য হানান আশরাভি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘোষণা বন্ধুর দ্বারা প্রতারিত হওয়া।

এক টুইটে আবুধাবরি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনি হয়তো কখনোই নিজের জন্মভূমি দখল হয়ে যাওয়ার অন্তর্বেদনা অনুভব করবেন না। হয়তো কখনো অবরুদ্ধ, বন্দিজীবনের কষ্ট বুঝবেন না। আপনার বাড়িঘর গুড়িয়ে দেয়া, আপনজন হত্যার নৃশং ঘটনার স্বাক্ষী হবেন না। হয়তো কখনোই আপনার বন্ধুর দ্বারা আপনি প্রতারিতে হবেন না।

হামাস: পশ্চিমতীরে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রত্যাহারের শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাস। বলা হয়, চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়নি।

চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে ইহুদিবাদীদের। এ চুক্তি দখলদার ইসরাইল বাহিনী দ্বারা চলমান ফিলিস্তিনিদের অধিকারহরণকে উৎসাহী করবে। এক বিবৃতিতে জানান, হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম।

হাজেম বলেন, ‘প্রয়োজন ছিল দখলদারদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বৈধ সংগ্রামে সহায়তা করা। দখলদারদের সঙ্গে চুক্তি নয়। ইসরাইলের সংযোজন পরিকল্পনা রুখতে আরব বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনে ফিলিস্তিনিদের চলমান প্রতিরোধ আন্দোলনকে বেগবান করা। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি নয়।’

জর্ডান: ১৯৬৭ সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের কাছ থেকে দখল করা ভূমিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি যদি ইসরাইল দেয় তাহলে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরাইলের চুক্তি স্থবির হয়ে পড়া শান্তি সমঝোতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

ইসরাইল যদি চুক্তিকে দখলদারিত্ব বন্ধের পদেক্ষপ হিসেবে নেয় তাহলে চুক্তি এ অঞ্চলকে শান্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বলেন, জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি।

এক বিবৃতিতে সাফাদি বলেন, ইসরাইল এ কাজটি করতে ব্যর্থ হলে আরব-ইসরাইলের বহু দশক পুরানো সংকট এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি আরো দীর্ঘায়িত হবে।

সাফাদি বলেন, পশ্চিমতীরে ইসরাইলি সংযোজন পরিকল্পনা শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে বাধা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইলকে একতরফা সংযোজন পরিকল্পনা বাতিল করতে হবে।

পুরো অঞ্চল এখন চতুর্মুখী সংকটে। অব্যাহত দখলদারিত্ব, ফিলিস্তিনিদের আইনি অধিকার হরণ চলতে থাকলে কখনোই শান্তি, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা হবে না।

ইহুদি দখলদার গ্রুপ: ইসরাইল-আমিরাত চুক্তিতে ডানপন্থী ইসরাইলি দখলদাররা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ডানপন্থীরা ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরকে ইসরাইলের মূলভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে।

নেতানিয়াহু যখন ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের ভূমি এবং ইহুদি বসতিগুলোতে ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তখন তিনি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেন, এ কাজে প্রথমে ওয়াশিংটেনের সবুজ সংকেত লাগবে।

দখলদারদের সংগঠন ইয়েশা কাউন্সিলের প্রধান বলেন, নেতানিয়াহু প্রতারণা করেছেন। তিনি ৫ লাখ স্থানীয় এবং হাজার হাজার ভোটারকে ধোকা দিয়েছেন।

মিশর: সংযুক্ত আরব আমিরাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন।

মধ্যেপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসরাইল দ্বারা ফিলিস্তিনের ভূমি আত্মসাত পরিকল্পনা বাতিলে যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরাইলের যৌথ বিবৃতি প্রশংসনীয়। এক টুইটে বলেন আল সিসি।

সিসি বলেন, আমাদের অঞ্চলে সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা অর্জনে রাষ্ট্রনেতাদের চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদী।

বাহরাইন : সংযুক্ত আরব আমিরাত-ইসরাইলের চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে উপসাগরীয় রাষ্ট্র বাহরাইন। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বিএনএ এ তথ্য জানিয়েছে।

ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র বাইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব এখনো চুক্তির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। চুক্তিতে পৌঁছাতে সহায়তা করায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশংসা করে বাহরাইন।

ইরান: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসরাইল আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। চুক্তিকে ভয়ানক, মূর্খ কৌশল বলে অভিহিত করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত প্রতিরোধ আন্দোলনকে আরো জোরদার করবে মত তেহারানের।

দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, ভুয়া ইহুদি রাষ্ট্রের সঙ্গে আবুধাবির চুক্তি ভয়ানক পদক্ষেপ। আমিরাতসহ যারা এ চুক্তিতে সহায়তা করেছে ভয়াবহ পরিণতির দায় তাদেরই নিতে হবে। ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি করে আমিরাত ফিলিস্তিনিদের পিঠে ছুরি চালিয়েছে। তাদের এ পদক্ষেপ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ইহুদিবিরোধী একতা আরো জোরদার করবে।

ইরানরে বিপ্লবী গার্ডের সহযোগী বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের চুক্তি লজ্জাজনক। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এখনো কোনো মন্তব্য করেননি।

তুরস্ক: ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের চুক্তিকে ভণ্ডামি অভিহিত করেছে তুরস্ক। আবুধাবির ভণ্ড আচরণ ইতিহাস কখনো ভুলবে না, ক্ষমা করবে না বলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে আঙ্কারা।

ফিলিস্তিনের জনগণ এবং তাদের প্রশাসনের অধিকার রয়েছে চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা।

তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে দেয়া হয়েছে। ইতিহাস এবং বিবেকবান কেউ আরব আমিরাতের এ ভণ্ড আচরণ কখনোই ভুলবে না ক্ষমা করবে না।

আমিরাতের উচিৎ ছিল ২০০২ সালে আরব লিগ উত্থাপিত শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে পদক্ষেপ নেয়া। ত্রিপক্ষীয় ঘোষণায় ফিলিস্তিনিদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া অপরিহার্য ছিল। কিন্তু তা না করে আমিরাত মারাত্মক ভয়ংকর এ সিদ্ধান্ত নিল। তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

যুক্তরাজ্য: ইসরাইল-সংযুক্ত আরব আমিরাতের চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাজ্য।

টুইট বার্তায় জনসন বলেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ইসরাইল-আমিরাতের চুক্তি অত্যন্ত ভালো খবর। আমি ব্যাপকভাবে আশাবাদী পশ্চিমতীর আত্মসাতসহ ইসরাইলের সংযোজন পরিকল্পনা আর সামনে এগুবে না। একইসঙ্গে চুক্তির আওতায় মধ্যপ্রাচ্যে আরো শান্তি প্রতিষ্ঠার পর সুগম হবে।

ফ্রান্স: ঐতিহাসিক চুক্তির আওতায় দখলকৃত পশ্চিমতীর সংযোজন পরিকল্পনা বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ফ্রান্স। একে ইতিবাচক পদক্ষেপ অভিহিত করেছে প্যারিস।

ইসরাইলের সংযোজন পরিকল্পনা প্রত্যাহারে চূড়ান্ত পদক্ষেপের আহ্বান জানান ফরাসী পররাষ্ট্র মন্ত্রী জিন-ইয়ভেস লে ড্রিয়ান।

বলেন, চুক্তির মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে আলোচনার পথ সুগম হবে। আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় দ্বিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে একমাত্র উপায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জো বাইডেন: এক বিবৃতিতে ডেমোক্রেট দলীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জো বাইডেন বলেন, ইসরাইলেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আমিরাতের অতিজরুরি, সাহসী এবং রাষ্ট্রনায়োকোচিত পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসন এ ধারা অব্যাহত রাখতে সহযোগিতা করবে।’

জাতিসংঘ: জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে দু’পক্ষের সমঝোতা ফিলিস্তিনকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে বলে আমি আশাবাদী।

এক বিবৃতিতে মহাসচিকের মুখপাত্র জানান, জাতিসংঘ মহাসচিব চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। জাতিসংঘের প্রস্তাবনা, আন্তর্জাতিক আইন এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী দ্বিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে অর্থবহ আলোচনার পথ তৈরি করবে আমিরাতের চুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদী।

শান্তি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় পুনরায় আলোচনার পথ তৈরিতে সবপক্ষের সঙ্গে মহাসচিব অব্যাহত যোগাযোগ আরো জোরদার করবেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। উৎস: সময়নিউজ।

ad

পাঠকের মতামত