জেকেজির প্র’তারণা থেকে ছাড় পায়নি পুলিশও!
নিউজ ডেস্ক।। করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার নামে প্র’তারণার জাল বিস্তার করে আরিফুল হক চৌধুরী ও ডা. সাবরিনা আরিফের প্রতিষ্ঠান জেকেজি হেলথ কেয়ার।
তারা করোনার জাল সনদ বিক্রিসহ নমুনা পরীক্ষার নামে প্র’তারণা করে আসছিলেন। তাদের এই প্র’তারণা থেকে ছাড় পায়নি পুলিশও। করোনার নমুনা পরীক্ষা করতে তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে স্থাপন করেছিল বুথ।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের এই প্র’তারণা বেশিদিন করতে পারেনি আরিফুল হক চৌধুরী ও ডা. সাবরিনা আরিফ। ঢাকা মহানগর পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা যখন বুঝতে পারেন প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কর্মকাণ্ড স’ন্দেহজ’নক, তখন তাদের বুথ গু’টিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শ’নাক্ত হয়। এর পর ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে আ’ক্রান্তের সংখ্যা। এপ্রিল মাসের শেষ দিক থেকে সম্মুখসারির যো’দ্ধাদের মধ্যে পুলিশে আ’ক্রান্তের ঘটনা বাড়তেই থাকে। বাড়তে থাকে মৃ’ত্যুর মিছিলও। করোনায় সবচেয়ে বেশি আ’ক্রান্ত হন ঢাকা মহানগর পুলিশের সদস্যরা। মে মাসে এ পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে ওঠে। জুনে আ’ক্রান্তের সার্বিক চিত্র পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উৎকণ্ঠিত করে তোলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ
নানা পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন। আর ঢাকার পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম তার অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের আ’ক্রা’ন্তের হাত থেকে র’ক্ষায় রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে আ’ক্রা’ন্তের চিকিৎসার পাশপাশি বেসরকারি হাসপাতালও ভাড়া করেন। কয়েকটি আবাসিক হোটেলে পুলিশ সদস্যদের জন্য কোয়ারেনন্টিন সেন্টার ও আইসোলেশন সেন্টার গড়ে তোলেন। আর করোনার লক্ষণ থাকা পুলিশ সদস্যদের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠাচ্ছিলেন আইইডিসিআরের ল্যাবে। তখন এই একটিমাত্র ল্যাবেই নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছিল। ওই ল্যাব থেকে বলে দেওয়া হয় তারা সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন পুলিশের ৩০টির বেশি নমুনা পরীক্ষা করতে পারবে না।
তখন ঢাকার পুলিশ কমিশনার চিন্তায় পড়ে যান। কীভাবে পুলিশ সদস্যদের আ’ক্রান্ত থেকে রক্ষা করবেন এই চিন্তায় তার একরকম ঘুম হা’রাম হয়ে যায়। ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদস্যদের করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহে এগিয়ে আসে আরিফুল হক চৌধুরী ও ডা. সাবরিনা আরিফের জেকেজি হেলথ কেয়ার। তারা বিনাপয়সায় নমুনা সংগ্রহ করবে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তাদের জানান। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কমিশনার তাদের প্রস্তাব লুফে নিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি প্রদান করেন।
এর পর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে প্রতিষ্ঠানটি জেকেজি বুথ স্থাপন করেন। তারা ৩ দিনে মোট ৩০০ নমুনা সংগ্রহ করেন। চতুর্থ দিনে এসে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নমুনা পরীক্ষার ফল কী আসছে তা জানতে চান। তখন আরিফুল হক চৌধুরী পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেন, তাদের সংগ্রহ করা ২০০ নমুনা ন’ষ্ট হয়ে গেছে। তখন এর কারণ জানতে চাইলে আরিফুল হক চৌধুরী রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের আরআইয়ের সঙ্গে খারাপ আ’চ’রণ করেন। এর পর বলেন, আপনাদের অফিসার পাঠান তার সাথে কথা বলবেন। এর পর এসি ফোর্সকে পাঠানো হয়। আরিফুল হক চৌধুরী তার সাথেও খা’রাপ আ’চ’রণ করেন। এবার আসেন ডিসি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। তার সাথেও খা’রাপ আ’চরণ করেন। বিষয়টি পুলিশ কমিশনারের গোচরীভূত করা হলে তিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে জেকেজির সার্বিক কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা শুরু করেন।
ঢাকার পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল আমাদের সময়কে বলেন, জেকেজির কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ করার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে যখন এটি বুঝতে পারলেন, তখনই সিদ্ধান্ত নেন আর জেকেজিকে নমুনা সংগ্রহ করতে দেওয়া হবে না।
পুলিশ কমিশনার বলেন, তা ছাড়া তারা আমার সহকর্মীদের সাথেও খারাপ আ’চরণ করেছে। এসব ঘটনা বিচার বিশ্লেষণ করেই আমরা জেকেজিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠ থেকে বের করে দিয়েছি।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জেকেজি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের সন্দেহভাজন করোনা আ’ক্রান্ত’দের নমুনা সংগ্রহের জন্য পৃথক পৃথক স্থানে মোট ৪৪টি বুথ স্থাপন করেন। এর পর শুরু করেন নমুনা সংগ্রহের কাজ। এর পর তারা নমুনা সংগ্রহ করে কিছুদিন ল্যাবে পাঠাচ্ছিলেন। কিন্তু যখনই বুঝতে পারেন তাদের নমুনা সংগ্রহ ঠিকমতো হচ্ছে না তখনই তারা সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা না করেই ফেলে দেওয়া শুরু করেন। নমুনা সংগ্রহের জন্য তারা যেসব কর্মী নিয়োগ করেছিলেন তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না দিয়েই মাঠে নামানো হয়েছিল। পুলিশের সংগ্রহ করা নমুনা তারা পরীক্ষা না করে ফেলে দেন বলে অ’ভিযোগ রয়েছে।
জেকেজিকে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়ার আগে স্বাস্ব্য অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক পরিকল্পনা ও গবেষণা অধ্যাপক ডা. মো. ইকবাল কবীর, মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের উপস্থিতিতেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। যারা নমুনা সংগ্রহ করবেন তাদের কীভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, কীভাবে নমুনা সংগ্রহ করবেন- এসব বিষয়ে শুরুতেই প্রশ্ন তোলেন আরিফুল হকের কাছে। কিন্তু তার এই সন্দেহ ও প্রশ্ন করে কোনো ফায়দা হয়নি। জেকেজি ঠিকই করোনার নমুনা সংগ্রহের অনুমতি বাগিয়ে নেয়। পরে ল্যাব থেকে এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানানো হয় জেকেজির সংগ্রহ করা অধিকাংশ নমুনা নেগেটিভ আসছে। কারণ নমুনা সংগ্রহে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে করা হচ্ছে না। তিনি বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে এ ব্যাপারে চুপ থাকতে বলা হয়েছিল। পরে অবশ্য জেকেজির করোনা সনদ জা’লিয়া’তির ঘটনা ধরা পড়ে যায় পুলিশের হাতে।
এ ঘটনায় কিছুদিন আগে জেকেজির আরিফুল হক চৌধুরী ও তার স্ত্রী ডা. সাবরিনা আরিফ গ্রে’প্তার হয়ে ঢাকা মহানগর গো’য়েন্দা পুলিশের রি’মান্ডে আসে। জি’জ্ঞাসাবাদে তারা করোনা স’নদ জা’লিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করেন। বর্তমানে জেকেজির এই দুই কর্ণধার কা’রাগারে আছেন। প্র’তারণার দায়ে তাদের বি’রু’দ্ধে দায়েরকৃত মা’মলার ত’দন্ত করছে ঢাকা মহানগর গো’য়েন্দা পুলিশ।
গো’য়েন্দা পুলিশের ডিসি তেজগাঁও গোলাম মোস্তফা রাসেল আমাদের সময়কে বলেন, তাদের তদন্ত শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই আদালতে চার্জশিট জমা দেবেন। তবে কতজনের বি’রুদ্ধে এই চার্জশিট দেওয়া হবে তা তদ’ন্ত শেষে বলা যাবে।
জেকেজিকে করোনার নমুনা পরীক্ষার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে পুলিশের ত’দন্তকারীরা জানতে চান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের কাছে। তবে গতকাল পর্যন্ত তার বক্তব্য নিতে পারেনি পুলিশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তাই জেকেজিকে করোনার নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছিলেন। উৎস: দৈনিক আমাদের সময়।






