গাজীপুর যেভাবে হয়ে উঠল করোনার ‘হটস্পট’
নিউজ ডেস্ক।। করোনাভাইরাসের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে গাজীপুর। রবিবার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় মৃত এক শিশুসহ ১০৭ জনের করোনা পজিটিভ এসেছে। এ নিয়ে জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৮০ জন। তাদের মধ্যে লক্ষণ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে দুজনের। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে সাতজন চিকিৎসকও রয়েছেন। সোমবার দুপুরে সিভিল সার্জন ডা. খায়রুজ্জামান এসব তথ্য জানান।
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গাজীপুরে ১৬ মার্চ প্রথম ইতালিফেরত এক ব্যক্তির মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ে। তিনি মূলত নরসিংদীর বাসিন্দা। এরপর ২৯ মার্চ গাজীপুরের বারবৈকা এলাকায় আরেকজন শনাক্ত হন। তিনি ইতালিফেরত এক আত্মীয়ের সংস্পর্শে এসেছিলেন। এরপর থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ওই জেলায় নতুন সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। ১০ এপ্রিল আক্রান্ত রোগী বেড়ে হয় ৬। এরপর রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা লোকজনই গাজীপুরে করোনার বিস্তার ঘটিয়েছে- এমনটিই ধারণা করছে গাজীপুরের প্রশাসনসহ সচেতন মহল। সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স প্রধানমন্ত্রীকে এমনটিই জানিয়েছেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার।
নারায়ণগঞ্জের মতো গাজীপুরও ভারী ও পোশাক শিল্প অধ্যুষিত এলাকা। ঘনবসতিপূর্ণ এ জেলায় প্রায় ৪০ লাখ মানুষের বাস। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ রয়েছে।
সংক্রমণ ঠেকাতে ১১ এপ্রিল গাজীপুর জেলা পুরোপুরি লকডাউন ঘোষণা করা হয়। তবে লকডাউন পুরোপুরি কার্যকর হয়নি এখনো। লকডাউন ঘোষণার পর থেকে বরং সংক্রমণের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত গাজীপুরে করোনায় আক্রান্ত ১২ জন শনাক্ত হয়েছিলেন। রবিবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা ২৮০ জন। শনিবারও এ সংখ্যা ছিল ১৭৩।
আর এক দিনে ১০৭ জন করোনায় আক্রান্তের ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ।
গাজীপুর জেলার মধ্যে কাপাসিয়া উপজেলায় সংক্রমণের হার বেশি। ওই উপজেলায় অবস্থিত একটি কৃষিপণ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকের মধ্যেও সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গাজীপুরে স্বাস্থ্য সেবায় জড়িত ৪৮ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে এর মধ্যে সাতজন চিকিৎসক, সাতজন নার্স, ৩৪ জন টেকনিশিয়ান।
এ জেলায় ছয় পুলিশ, এক সাংবাদিক ও এক পোশাক শ্রমিকের মধ্যে এ সংক্রমণ ধরা পড়ে। এর মধ্যে বিদেশফেরতও আছেন আটজন। আক্রান্তদের বয়স ২৫ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে।
সোমবার এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. খায়রুজ্জামান বলেন, ‘গাজীপুরের অনেক গার্মেন্টস খোলা। অনেক গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ বেতন না দেওয়ায় শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে। তাদের মাধ্যমে করোনাভাইস জেলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন প্রতিদিন দুই’শ লোকের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। অধিক পরিমাণে নমুনা সংগ্রহের কারণে অধিক পরিমাণে করোনা পজিটিভ পাওয়া গেছে’।
লাফিয়ে লাফিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনায় গাজীপুরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
মো. খায়রুজ্জামান জানান, রবিবার ১৬৩ জনের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। সোমবার সকালে পাওয়া রিপোর্টে দেখা গেছে ১০৭ জনের করোনা পজিটিভ। তাদের মধ্যে নগরীর বোর্ড বাজার এলাকার করোনা লক্ষণ নিয়ে মারা যাওয়া এক শিশুর নমুনাও ছিল। তারও করোনা পজিটিভ এসেছে। তাকে নিয়ে জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা দুজনে দাঁড়াল। এ ছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে সিটি করপোরেশনের কাশিমপুরে অবস্থিত শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক ও চিকিৎসক, নার্সসহ আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ জন।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার জেলায় সর্বাধিক ৩৭, শুক্রবার ৩১ ও শনিবার ১১ আক্রান্ত হয়েছিলেন। রবিবার ১০৭ জন আক্রান্তের মধ্যে দিয়ে নতুন রেকর্ড হলো গাজীপুর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এরই মধ্যে গাজীপুরকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে গাজীপুরে অধিক সংখ্যক আক্রান্ত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
প্রায় ৪০ লাখ মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ শহরটিকে নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি বিবেচনায় শহর লকডাউন করা হলেও এখন পর্যন্ত শতভাগ ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়নি। মানুষ ঘরে থাকছেই না। নানা অজুহাতে মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তাদের নিবৃত্ত করতে পারছেন না।
সূত্র জানায়, গাজীপুরের যেসব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। যার সংখ্যা তিন হাজার ৫৮৩ জন। কিন্তু পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবীদের পরিবারও ঝুঁকিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে জন্য তাদের আলাদা থাকার ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই ১০ হোটেল ও রিসোর্ট বুকিং দিয়েছেন গাজীপুরের মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম। এ অবস্থায় আরো সতর্কতার জন্য সবাইকে ঘরে থাকার জন্য প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উৎস: দেশ রুপান্তর।




