‘ঘরে খাবার নেই, কানে আসে গুলির শব্দ’
আওলাদ শেখ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এই মুসলিম তরুণ কর্মসূত্রে থাকেন দিল্লিতে, যেখানে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে চলছে দাঙ্গা। সেই দাঙ্গায় বন্দী জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আওলাদ শেখ বলেন, ‘বছর ছয়েক ধরে আমি দিল্লির জাফরাবাদ সংলগ্ন গন্ডাচক এলাকার একটি কারখানায় ইলেকট্রিক ফ্যানের কনডেন্সার তৈরির কাজ করি। ঈদ বা অন্য উৎসবে বাড়ি আসি। বছরের বেশির ভাগ সময় দিল্লিতেই কাটে। কারখানা থেকে কিছুটা দূরে একটি বাড়িতে আমাদের এলাকার ১২ থেকে ১৩ জন বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। সবকিছু ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ এমন কাণ্ড হবে, তা কখনো ভাবিনি। ’
এই তরুণ বলেন, ‘গত রোববার আমরা কারখানায় কাজ করছিলাম। শুনলাম, কিছু একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। অতশত ভাবিনি। সোমবার সকাল থেকে শুনতে পেলাম গন্ডগোল শুরু হয়েছে। আমরা যেখানে কাজ করি এবং থাকি সেই এলাকার রাস্তার ধারের অনেক দোকানপাট ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যেই শুরু হয় ইট-পাথর বৃষ্টি। পুলিশের সামনেই আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র, লোহার রড, লাঠি-সোটা নিয়ে দাপাদাপি করে কিছু উন্মত্ত মানুষ।’
দিল্লির দাঙ্গার বর্ণনা দিতে গিয়ে আওলাদ শেখ বলেন, ‘বিকেল ৫টার সময় মালিক এসে বলল, বাইরে হাঙ্গামা শুরু হয়েছে। গোলমালের আওয়াজের পাশাপাশি কানে আসে গুলির শব্দ। কারখানা ভেতর থেকে তালাবন্ধ করে আমরা ভয়ে বসেছিলাম। সেদিন রাতটা চা-বিস্কুট খেয়েই কাটিয়েছিলাম। মঙ্গলবার মালিক তার একটি বাড়িতে আশ্রয় দেন। সকালে পাঁচ তলার ছাদে উঠে দেখি রাস্তা-গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পাথর, ইটের টুকরা। লোকজন অস্ত্রশস্ত্র, লাঠি নিয়ে ছোটাছুটি করছে। সমস্ত বাড়ির ছাদে পাথর, ইটের টুকরা মজুদ করা হয়েছে। আমরা কারও টার্গেট হয়ে যেতে পারি, এই ভয়ে তাড়াতাড়ি নিচে নেমে আসি। এরপর ঘরে খিল দিয়েই কাটে। মোবাইলে খবর দেখে জানতে পারি, আমরা যে এলাকায় আছি তারই চারপাশে হিংসার আগুন ছড়িয়েছে।’
আওলাদ বলেন, ‘এলাকার সমস্ত দোকানপাট বন্ধ থাকায় আমাদের না খেয়েই থাকতে হয়। একদিকে ক্ষুধার জ্বালায় পেট ছটফট করছে। এর মাঝেই বন্ধু মোহাম্মদ কালাম আমাদের দুর্দশার কথা লিখে ফেসবুকে একটি পোস্ট করে। বুধবার দুপুর থেকে অনেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমাদের উদ্ধার করার কথা বলে। কিন্তু ভয়ে আমরা বেরোতে পারিনি। এ দিন দুপুরেই কোনো ক্রমে চোরের মতো মালিকের ঘর থেকে আমরা নিজেদের ভাড়া ঘরে আসি। তখন পর্যন্ত পেটে একটি দানাও পড়েনি। ঘরে কিছু চাল, আর আলু সেদ্ধ করে আমরা লবণ ছিটিয়ে আধপেটা করে ফ্যান-ভাত খাই। সন্ধ্যায় কিছুটা চাল ভেজে খেয়েছি। মাঝে মধ্যে কানে আসে হল্লা, গুলির আওয়াজ। টিয়ার গ্যাস ফাটানো হয় আমাদের ঘরের সামনেই। ভয় আরও বাড়তে থাকে।’
এই তরুণ বলেন, ‘রাত ১১টা নাগাদ আমাদের ভাড়া বাড়িতে পুলিশ এসে আমাদের উদ্ধার করে নিয়ে যেতে চায়। তারা আসলে পুলিশ কি না, সন্দেহ হচ্ছিল। তবে ফোন আসে যে, তারা সত্যিই পুলিশ। পুলিশের দুটি গাড়িতে আমরা ১৩ জন উঠে পড়ি। জাফরাবাদ থানার পুলিশ আমাদের পৌনে ১টা নাগাদ পৌঁছে দেয় পুরাতন দিল্লি স্টেশনে। সেখান থেকে কলকাতার ট্রেনে উঠেছি। শেষ পর্যন্ত বাড়ি পৌঁছেছি। কিন্তু এখনো গায়ে কাঁটা দিচ্ছে সে দিনের কথা ভেবে।’
প্রসঙ্গত, ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদ ঘিরে গেল সপ্তাহে রাজধানী দিল্লিতে হিন্দু-মুসলিম সহিংসতায় ৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।




