310848

ভারত থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেসে আসছে মৃত গরু

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে গরুর প্রতি অমানবিকতা কোনভাবেই কমছে না। দু’দেশের সীমান্তে নজরদারী বাড়ায় চোরাকারবারীরা গরু পাচারে বেছে নিয়েছেন ভিন্ন কৌশল। তারা রাতের অন্ধকার আর ঘন কুয়াশাকে কাজে লাগিয়ে কলাগাছ অথবা কাশ-খড়ের ভেলার সাথে ৮-১০টি করে গরুর পা বেঁধে একত্রে ভাসিয়ে দিচ্ছেন ব্রহ্মপুত্রের পানির স্রোতে।

গত এক মাস ধরে সীমান্তের ওপার থেকে ভেসে আসা গরুর মধ্যে শত শত গরু মরে পড়ে আছে কুড়িগ্রামের ব্রক্ষপুত্র নদের চরে। দূষিত হয়ে পড়েছে নদের পানিসহ পরিবেশ। এ অবস্থায় পরিবেশ রক্ষাসহ গরুর প্রতি এমন নির্মমতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।

দৃশ্যটি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রারপুর ইউনিয়ের উপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদের ডুবোচরের। শুধু একটি দুটি চর নয়, নদের বুকে জেগে ওঠা ১০ থেকে ১২টি ডুবোচরে পড়ে আছে শতশত মৃত গরু।

বেশি লাভের আশায় ভারতীয় চোরাকারবারীরা ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবেশ মুখ ভারতের কালাইয়ের চর উজান থেকে বাংলাদেশি চোরাকারবারীদের কাছে স্রোতে ভাসিয়ে দেয় এসব গরু। রাতের অন্ধকার এবং ঘন কুয়াশায় দু’দেশের সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব গরু প্রবেশ করছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। কিছু গরু এ দেশের চোরাকারবারীরা উদ্ধার করলেও দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়া গরুগুলো অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় মারা পড়ছে। এসব মৃত গরু আটকা পড়ছে ব্রহ্মপুত্রর বিভিন্ন ডুবো চরে। আর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে মৃত গরুর পচা গন্ধ।

সরেজমিনে কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের চর যাত্রাপুর, চিরা খাওয়া, ঝুনকার চর, অষ্টআশির চর, রলাকাটার চরসহ বেশকিছু চরে ঘরে দেখা গেছে, নদের দুই পাড়ের এসব ডুবোচরের কোনোটিতে ৪০টি, কোনোটিতে ২০টি, কোনোটিতে ১০টি, কোনোটিতে ১৫টি, এভাবে অগনিত মৃত গরু পড়ে আছে। এসব গরুর কোন কোনটির চামড়া নিয়ে গেছে স্থানীয় মুচিরা।

চর যাত্রাপুরের নৌকার মাঝি কোবাদ মোল্লা জানান, চর যাত্রাপুরের ডুবোচরে গত চার-পাঁচ দিনে মৃত ৯টি গরু আটকা পড়েছে। উজানের চরগুলোতে আরো অসংখ্য মৃত গরু আটকে আছে।

একই এলাকার নৌকার আরেক মাঝি শাহ্ আলম মিয়া জানান, আগে কাটাতারের ওপর দিয়ে চাঙ্গে করে গরু পাচার হয়ে আসতো। এখন কড়া পাহারা ও বিএসএফ গুলির ভয়ে তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের উজান থেকে গরুর পা বেঁধে কাশিয়ার বোঝার মধ্যে বেঁধে রাতে কুয়াশার মধ্যে নদের পানির স্রোতে ছেড়ে দিয়ে গরু পাচার করছে চোরাকারবারীরা। এসব গরুর যেগুলো বাংলাদেশের চোরাকারবারীরা ধরতে পারছে সেগুলো বেচে যাচ্ছে। আর যেগুলো ধরতে পারছে না সেগুলো পানিতে ডুবে ঠাণ্ডায় মারা যাচ্ছে।

চর ভগবতীপুরের জলিল মোল্লা জানান, তার বাড়ির পাশের দুইটি ডুবোচরে শতাধিক মৃত গরু পড়ে আছে। প্রতিদিনই এর সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব মরা গরু পচে পানি যেমন দূষিত হচ্ছে, তেমনি মারাত্মক দুর্গন্ধে বাড়িতে থাকা যাচ্ছে না। আগে নদীর পানিতে গোসলসহ বিভিন্ন কাজ সারলেও এখন নদের পাড়েই আসা যাচ্ছে না।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জানান, যাত্রাপুর ইউনিয়নের অন্তত ১০-১২টি ডুবোচরে অসংখ্য মৃত গরু আটকা পড়ে আছে। এতে করে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এমন অমানবিকভাবে গরুর পা বেঁধে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে গরু পাচার রোধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি মৃত গরুগুলো অপসারণ করে পরিবেশ রক্ষারও দাবি জানান তিনি।

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম ২২ বিজিবি’র পরিচালক মোহাম্মদ জামাল হোসেন বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কড়া নজরদারির মাঝেও নদীপথে ভিন্ন কৌশলে দু’দেশের চোরাকারবারীরা গরু পাচার করায় অনেক গরু মারা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা সচেতন রয়েছি।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন জানান, এমন নির্দয়ভাবে গরু পাচার এবং গরুর মৃত্যুর ঘটনাটি শুনেছি। এ ব্যাপারে গরু পাচার রোধের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

ad

পাঠকের মতামত