307400

ভারতে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নিহত ২ কিশোরকে ‘শহীদ’ তকমা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক- একজন মায়ের নিষেধ না-মেনে বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়েছিল। অন্যজন সমাবেশ থেকে ফেরার সময় মাকে সাবধান করেছিল। দুই ছেলেই আর ঘরে ফিরল না। ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নিহত ১৭ বছরের দুই কিশোরকে ‘শহীদ’ ঘোষণা করল অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু)।

ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজার জানায়, গুয়াহাটির হাতিগাঁওয়ের বাসিন্দা নবম শ্রেণির ছাত্র স্যাম স্ট্যাফোর্ড বৃহস্পতিবার লতাশিলের মাঠের সমাবেশে যোগ দিতে গিয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে। তার মা জানান, হেঁটে ফেরার সময়ে বাড়ির কাছেই রাজধানী মসজিদের সামনে গন্ডগোল দেখে ছেলে তাঁকে ফোন করে বলে, ‘‘বাইরে বেরিয়ো না। খুব ঝামেলা হচ্ছে। প্রায় পৌঁছে গিয়েছি। আমার জন্য পোলাও আর মাংস করে রাখ।’’

তার মিনিট দশেকের মধ্যে ফোন আসে, শঙ্কর পথে ছেলের গলায় গুলি লেগেছে। হাসপাতালের পথে রাস্তাতেই মারা গিয়েছে স্যাম।

এদিকে গুয়াহাটির সৈনিক ভবনে কাজ করা ছয়গাঁওয়ের দীপাঞ্জল দাস বৃহস্পতিবার সকালেই মাকে ফোন করে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার কথা জানায়। মা কবিতা দাস জানান, ছেলেকে গন্ডগোলের মধ্যে যেতে নিষেধ করেছিলেন তিনি। কিন্তু অনড় দীপাঞ্জলের যুক্তি ছিল, প্রতিবাদে শামিল হওয়া তার নৈতিক দায়িত্ব। লতাশিলের সমাবেশ থেকে ফেরার সময়ে আচমকা একটি গুলি তার তলপেটে এসে লাগে।

পুলিশের গুলি থেকে বাঁচেনি হাসপাতালও। গুয়াহাটির একটি বেসরকারি হাসপাতাল সূ্ত্রে জানানো হয়, গণেশগুড়ি সেতুর সামনে বিক্ষোভ চলার সময় পুলিশ শূন্যে গুলি ছুড়ছিল। তখনই দু’টি গুলি হাসপাতালের আইসিইউয়ের জানলা ভেদ করে দেওয়ালে এসে লাগে।

রাজ্যের পরিস্থিতি আজ অনেকটা স্বাভাবিক হলেও ইন্টারনেটের উপরে নিষেধাজ্ঞা সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বাতিল হয়েছে রবিবারের ইউজিসি নেট পরীক্ষা। পরীক্ষা হবে না মেঘালয়েও। অসমে আজ বিকেল চারটে পর্যন্ত কার্ফু শিথিল হওয়ায় পেট্রল পাম্পগুলি খোলে। ছিল দীর্ঘ লাইন। কাল থেকে কার্ফু তুলে নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা।

তবে আজও গুয়াহাটির পশু চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে চলে সত্যাগ্রহ, অনশন। বিক্ষোভ চলেছে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে। গুয়াহাটি, ডিমাপুর-সহ বিভিন্ন স্টেশনে গত কয়েকদিনে আটকে পড়েছেন বহু যাত্রী। উজানি অসমে যাওয়া সব ট্রেন বাতিল হওয়ায় তিনসুকিয়া, ডিব্রুগড়ে থাকা বহু যাত্রী তিন-চারদিন ধরে স্টেশনেই আটকে রয়েছেন। তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করছে রেল কর্তৃপক্ষ।

এর মধ্যেই হিংসায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে আলোচনাপন্থী আলফা নেতা জিতেন দত্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সূত্রের খবর, ধৃত কৃষক নেতা অখিল গগৈয়ের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা রুজু করতে পারে এনআইএ।

এদিকে, ডিজিপি ভাস্করজ্যোতি মহন্ত আজ জানান, এখনও পর্যন্ত ৮৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আটক সহস্রাধিক। মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, আন্দোলনের নামে যারা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, সম্পত্তি নষ্ট করছে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্য দিকে, নয়া আইনকে চ্যালেঞ্জ করে কংগ্রেস সাংসদ আব্দুল খালেক, বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়ারা আজ সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছেন।

উল্লেখ্য, চরম বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন বিল-সিএবি’ পাস হওয়ার দিন থেকেই ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে গোটা ভারত। প্রথমে উত্তর-পূর্ব রাজ্য আসাম ও ত্রিপুরায় প্রতিবাদ হলেও এখন তা ছড়িয়ে গেছে অন্যান্য রাজ্যেও।

আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে কারফিউ ভেঙে মানুষ যখন রাস্তায় নেমে আসে তখন পশ্চিমবঙ্গেও সিএবি-এনআরসি প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর রাজধানী দিল্লিও প্রতিরোধের ডাক দেয়। এরপর একে একে পঞ্জাব, ছত্তীসগঢ়, কেরলের পরে আজ মধ্যপ্রদেশও একই ঘোষণা দিয়েছে।

এ আইনের প্রতিবাদে শুক্র ও শনিবার আগুন জ্বলেছিল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। একাধিক ট্রেনে আগুনও ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। তবে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নষ্ট করলে ছেড়ে কথা বলা হবে না। শান্তিতে আন্দোলনের আহ্বান জানান তিনি। শুক্র ও শনির সেই ঘাতক রূপ না থাকলেও রবিবারও দিকেদিকে পথ অবরোধে নাজেহাল সাধারণ মানুষ।

ad

পাঠকের মতামত