দুই যুগ শিক্ষকতা করেও গেজেটে নাম নেই রহিমার!
২ যুগ নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে শিক্ষকতা করেও শিক্ষক গেজেট নাম নেই রহিমা খাতুনের। রহিম খাতুন রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার জাবরকাকোল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শিক্ষক গেজেট থেকে বাদ পড়া শিক্ষকের দাবী তার এবং তার স্বামীর অজ্ঞতা এর জন্য দায়ী। তবে তদন্ত পূর্বক শিক্ষক জাতীয়করণ গেজেটে নাম অর্ন্তভুক্তির অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জাবরকোল গ্রামটি বালিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত হলেও ২ কিলোমিটারের মধ্যে কোন বিদ্যালয় ছিল না। এলাকার শিক্ষা প্রসার ঘটানোর উদ্দেশ্যে ১৯৯৬ সালে সালে জাবরকোল বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নিরবিচ্ছিন্নভাবে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেন রহিমা খাতুন। যোগদানের পর থেকেই বিনা বেতনে এলাকার শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যালয়ে দায়িত্বপালন করেন।
২০১৩ সালে বিদ্যালয় জাতীয়করনের জন্য উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য নাম প্রস্তাব করে। সেখানে শিক্ষক সংক্রান্ত তথ্যেও নিয়ম অনুযায়ী রহিমা খাতুন ও তার স্বামীসহ ৫ জনের নাম কর্মরত শিক্ষক হিসেবে দেখানো হয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক সংখ্যা এবং শিক্ষকের বয়স সংক্রান্ত একটি নীতিমালা জারী করে।
ওই নীতিমালায় রহিমা খাতুনের স্বামী ফেরদৌস রহমান বাদ পড়ে শিক্ষক তালিকা থেকে। এ কারনেই ফেরদৌস তার স্ত্রীকে চাপ দেয় বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করতে। সে তার স্বামীর চাপে স্বামীসহ আলাদা ভাবে ভিন্ন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে। ২০১৮ সালে ৩য় ধাপে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণহয়। গত ৭ অক্টোবর শিক্ষক গেজেটে রহিম খাতুন বাদে ৩জন শিক্ষকের নামে অফিস আদেশ হয়।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রথম শ্রেণীতে ১৫জন, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ১৭জন, ৩য় শ্রেণীতে ১৫জন, চতুর্থ শ্রেণীতে ১৬জন এবং পঞ্চম শ্রেণীতে ১০জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
এ বিষয়ে রহিমা খাতুন বলেন, আমার স্বামীর অজ্ঞতায় আজ আমার জাতীয়করণকৃত শিক্ষক গেজেট নাম নেই। যা হোক আমি তো নিয়মিত স্কুলে ছিলাম। বিনা বেতনে আজ ২৪ বছর শিক্ষকতা করছি। আমার স্বামীর বয়সের বাধায় সে অনেক আগেই শিক্ষক তালিকা থেকে বাদ পড়ে। সেই ক্ষোভে সে আমাকে বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে বাধা হয়ে দাড়ায়। তবে বিদ্যালয়ে যাতায়াত কিংবা ক্লাসে কোন বাধা দেননি তিনি। আমার ধারণা সেই ভুলেই জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের শিক্ষক গেজেট থেকে নাম বাদ পড়ে আমার।
২৪টি বছর শিক্ষকতা করছি। বিদ্যালয় থেকে কিছু শিক্ষকের আগমন-প্রস্থান ঘটেছে। আর্থিক সুবিধা না পাওয়ায় তারা ধৈর্য্য হারিয়েছে, অন্যত্র চলে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে কোন আর্থিক সুবিধা না পেলেও এলাকার কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাদানে নিরবিচ্ছিন্ন ছিলাম। সম্প্রতি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হয়েছে। শিক্ষক গেজেটও প্রকাশ হয়েছে, সেখানে নাম নেই আমার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়কে বিষয়টি সরেজমিন পূণ: তদন্ত পূর্বক নাম গেজেট অর্ন্তভুক্তির দাবীও জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) দিপ্তী রায় বলেন, স্কুলের আমিসহ আরো ২জন শিক্ষক খোদেজা খাতুন ও শিখা খাতুনের জাতীয়করণ হয়েছে। তবে রহিমা বেগমের জাতীয়করণ হয়নি। সে নিয়মিত স্কুলে আসত কিন্তু বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করত না।
স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সজিব কুমার বিশ্বাস, রিহাদ মন্ডল, ইভা খাতুন, খাদিজা খাতুন জানায়, আমরা স্কুলে ভর্তির সময় থেকেই দেখছি আমাদের রহিমা বেগম ম্যাডাম আমাদের ক্লাস নেন।
স্কুলের পার্শ্ববর্তী সাবেক বিদ্যুৎসাহী সদস্য আ. রহিম মন্ডলের স্ত্রী আমেনা বেগম বলেন, স্কুল প্রতিষ্ঠার পর পরই রহিমা বেগম শিক্ষকতা শুরু করেন। আজ পর্যন্ত তিনি নিয়মিত স্কুলে ক্লাস নিয়ে আসছেন। রিজিয়া খাতুন, আবুল মন্ডল, ইলিয়াছ মন্ডলসহ এলাকাবাসী আমেনা বেগমের সাথে সুর মিলিয়ে বলেন, রহিমা বেগমের চাকুরী জাতীয়করণ হয়নি, সেটা অফিসে খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল। তবে তার চাকুরী জাতীয়করণ করা উচিত। সে স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিনা বেতনে ক্লাস নিয়ে আসছেন।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো: আশরাফুল হক বলেন, আমি যাচাই-বাছাইকালীন এখানে ছিলাম না। তবে স্থানীয় ভাবে ও বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পেরেছি রহিমা খাতুন নিয়মিত স্কুলে আসত। সে তার স্বামীর সাথে ভিন্ন প্যানেলে থাকায় শিক্ষক গেজেট বাদ পড়েছেন। এটা তারই ভুল। তবে রহিমা খাতুন উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করতে পারেন। আমি তার আবেদন ফরওর্য়াডিং করে পাঠাবো, তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন রহিমা খাতুনের বিষয়ে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হোসনে ইয়াসমিন করিমী বলেন, রহিমার নিজের ভুলেই আজ এই ঘটনাটি ঘটেছে। সে নিয়মিত স্কুল করলেও বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করত না। চাহিত তথ্যেও সে কর্মরত শিক্ষকদের সাথে না থেকে স্বামীর সাথে আলাদা প্যানেল করে। আমরা বিভিন্ন সময় তাকে অনুরোধ করেছি মূল শিক্ষকের সাথে তথ্য প্রদানের জন্য কিন্তু সে কথা মানেন নাই। উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে বিয়ষটি উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারে সে। তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।




