295640

সৌদি আরবের জেদ্দায় পাশবিক নির্যাতন মুক্তিপণে ছাড়া পেলেন সেবিনা

প্রবাস ডেস্ক।। সৌদি আরবের জেদ্দায় তালাবদ্ধ একটি ঘরে বন্দি রেখে চালানো হয় নির্যাতন। এরপর মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। ওখানে নিয়েও চালানো হয় দফায় দফায় নির্যাতন। মুক্তির কথা বলে দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে  ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এখন নিঃস্ব হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের সৌদি ফেরত রাসিদা আক্তার সেবিনা। ঋণের দায়ে জর্জরিত। দেশে ফিরে অভিযুক্ত দুই জনের বিরুদ্ধে সামাজিক বিচার চেয়েও পাননি। অবশেষে ৮ই এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা করেছেন সেবিনা। খবর: মানবজমিন।

আদালত তার অভিযোগ গ্রহন করে মামলাটি তদন্তের জন্য হবিগঞ্জের পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই। মামলার বাদী হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার ইছবপুর গ্রামের আরজ আলী স্ত্রী রাসিদা আক্তার সেবিনা। আর আসামি একই এলাকার নজিরপুর গ্রামের ক্ষিতিশ দাসের ছেলে কৃপেন্দ্র দাস ও চানপুর গ্রামের আব্দুল মোছাব্বির চৌধুরীর ছেলে টিপু চৌধুরী।

এজাহার দাখিলের পর হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক কাজী আব্দুল হান্নান পিবিআইকে ৭ কার্য দিবসের মধ্যে সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ সহ রিপোর্ট দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার এজাহারে সেবিনা বেগম উল্লেখ করেন- তার স্বামী একজন সহজ-সরল প্রকৃতির কৃষক। প্রধান আসামি কৃপেন্দ্র দাস তাদের গ্রামের পাশের স্কুলের শিক্ষক। সেই সুবাদে গত বছরের এপ্রিল মাসে কৃপেন্দ্র ও টিপু দুজন মিলে তার বাড়িতে আসেন। এসে তাকে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তাব দেন। বলেন- ৮০ হাজার টাকা দিয়ে দিলেই তাকে সৌদি আরবে পাঠানো হবে। সেখানে ভালো চাকরি হবে। আর মাসে বেতন হবে ৫০ হাজার টাকা। তাদের এই প্রস্তাবে সেবিনাসহ তাদের পরিবারের সদস্যরা সাড়া দেন। অভাব-অনটনের সংসার থাকার পরও তারা ধার-কর্জ করে ওই বছরের ৭ই এপ্রিল কৃপেন্দ্র ও টিপুর হাতে কথা মতো ৮০ হাজার টাকা তুলে দেন। টাকা দেয়ার কিছু দিনের মধ্যে ২১শে এপ্রিল কৃপেন্দ্র ও দুলাল তাদের বাড়িতে আসে। এবং সৌদি পাঠাতে সেবিনাকে নিয়ে যায়।

ঢাকার একটি হোটেলে দুই দিন রাখার পর ২৩ শে এপ্রিল সেবিনাকে হযরত শাহজালাল (রহ.) আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর থেকে তাদের সৌদি আরবে ফ্লাইট দেয়া হয়। সৌদির রাজধানী রিয়াদের নেয়ার পর তাকে পরদিনই জেদ্দায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে একটি কক্ষে ময়মনসিংহের এক মহিলার সঙ্গে রেখে দেয়। ওই বাসা থেকে বাংলাদেশী কয়েকজন যুবক তাদের আরো একটি বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে নেয়ার পর অজ্ঞাত কয়েকজন বাংলাদেশী যুবক তাদের উপর পাশবিক নির্যাতন করে। এক পর্যায়ে প্রতিবাদ করলে সেবিনা বেগমের উপর শারীরিক নির্যাতন শুরু হতো। এই অবস্থায় প্রতিবাদী আত্মহত্যার হুমকি দেন সেবিনা। এতে ভয় পেয়ে যায় ওই যুবকরা। তাকে পাহারা দিয়ে রাখে। জেদ্দার ওই বাসায় আটকে রেখে কয়েক মাস নির্যাতনের এক পর্যায়ে সেবিনা বেগমকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয় বলে এজাহার উল্লেখ করেন তিনি। জানান- ওই মাফিয়া চক্র আমাকে কিনে নিয়ে আরো একটি বাসায় বন্দি করে রাখে। সেখানে তার উপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। আর এই নির্যাতনের প্রতিবাদ করলেই শারীরিক নির্যাতন শুরু হতো। এই পাশবিকতায় মানসিকভাবে পির্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। এই অবস্থায় কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এক বাঙালি যুবক তার মুক্তিপণ হিসেবে ৩ লাখ টাকা দাবি করেন।

এবং টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে বলে জানান তিনি। তার কথামতো টাকা দিতে দেশে থাকা স্বজনদের কাছে আকুতি করেন। তাকে জীবিত দেখতে চাইলে দ্রুত টাকা দেয়ার তাগিদ দেন তিনি। তার এই আকুতি শুনে দেশে থাকা স্বজনরা জমি জমা বিক্রি করে সৌদিতে অবস্থানকারী ওই বাঙ্গালি যুবকদের কথামতো কৃপেন্দ্র ও টিপুর হাতে টাকা তুলে দেন। টাকা পাওয়ার পর সৌদি আরবের জেদ্দায় বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান সেবিনা বেগম। মাফিয়া চক্রের সদস্যরা তাকে সৌদির একটি পুলিশ ক্যাম্পের সামনে ফেলে দিয়ে আসে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। এক পর্যায়ে সেবিনাকে সৌদি আরবের কারাগারে প্রেরণ করা হয়। সেখানে থাকাকালে দেশ থেকে আরো ২২ হাজার টাকা নিয়ে তিনি বিমান ভাড়া বাবদ পরিশোধ করে দেশে ফিরে আসেন। গতকাল সবিনা বেগম মানবজমিনকে জানিয়েছেন- দেশের আসার পর কিছু দিন তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে পির্যস্ত ছিলেন। তার উপর যে পাশবিক নির্যাতন হয় তাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সুস্থ হওয়ার পর আত্মীয়-স্বজনদের কাছে তার উপর চলা নির্মম পাশবিকতার বিষয়টি জানান। এ সময় তার আত্মীয়স্বজনরা বিষয়টি সামাজিকভাবে সমাধানের চেষ্টা চালান। প্রথমে আসামিরা যাবতীয় ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ্বাস প্রদান করে মামলা না করার অনুরোধ করে।

কিন্তু আসামিরা ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলে সময় অতিবাহিত করে। পরে কোনো ক্ষতিপূরণ না পেয়ে আদালতে মামলা করেন বলে জানান। তিনি জানান- ‘আমার শরীরের উপর যে অত্যাচার গেছে তা বলার ভাষা নেই। এর বিচার চাই। পাশাপাশি আমাকে পাচারের নামে এবং পরবর্তীতে মুক্তিপণের নামে টাকা গ্রহণ করা হয়েছে তাও ফেরত চাই।’ হবিগঞ্জ জেলা পিবিআইয়ের ইন্সপেক্টর শরিফ রেজাউল করিম গতকাল মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ‘আদালতের নির্দেশে মামলা পাওয়ার পর আমি তদন্ত শুরু করেছি। কিছু কিছু কাজ এগিয়ে রেখেছি। আদালতের নির্দেশনা মতো সটিক তদন্ত পূর্বক আদালতে রিপোর্ট করা হবে।’ তবে- রাসিদা আক্তার সেবিনার অভিযোগকে অস্বীকার করেন মামলার প্রধান আসামি কৃপেন্দ্র দাস। তিনি বলেন- একটি পক্ষের প্ররোচনায় সেবিনা বেগম তাকে মামলার আসামি করেছেন। সেবিনাকে সৌদি আরবে পাঠানোর ব্যাপারে তার কিংবা টিপুর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বিষয়টি মিথ্যা বলেই এলাকাবাসী তাদের পক্ষে রয়েছেন বলে দাবি করেন কৃপেন্দ্র। সেবিনা বেগম জানান- মামলা দায়েরের পর এখন তিনি সহ তার পরিবার নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন। মামলা তুলে নিতে আসামি পক্ষ ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

ad

পাঠকের মতামত