২০১১ যেন উনিশে এলো ফিরে
২০১১ সালের ঘটনাটি মনে আছে? বিশ্বকাপের দল ঘোষণা হলো। কিন্তু দলে নেই সে সময়কার সেরা ডানহাতি পেস বোলার মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ খেলতে না পারার বেদনা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। দেশবাসী প্রমাণ পেয়েছিলেন টেলিভিশনে তার সাক্ষাতকার দেখে। কেঁদেছিলেন আজকের দেশ সেরা অধিনায়ক। চোট থেকে ফিরে জাতীয় দলে নিজেকে অন্তর্ভূক্ত করতে কী না করেছিলেন তিনি।
২০১৯ সালের আজকের দিনটিও হয়তো মনে থাকবে দেশের ক্রিকেট পাগল সমর্থকদের। বলা চলে দেশের অন্যতম সেরা পেসার তাসকিন আহমেদের ভক্তদের। কারণটা কিন্তু একই, চোটের কারণে দলের বাইরে গিয়ে আর ফিরতে না পারা। ঘোষণা হয়ে গেছে বিশ্বকাপের অংশগ্রহণ করার জন্য গড়া জাতীয় দলের স্কোয়াড। দলে নেই তাসকিন। হৃদয় ভেঙেছে এই পেসারের। তিনিও কেঁদেছেন সেই দিনকার মাশরাফির মতোই।
চলুন ফিরে যাই ২০১১ সালে। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ। জাতীয় দল ঘোষণা হবে। মিরপুরের শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে এসেছেন মাশরাফি। দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাবেন ভেবে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন সেদিন। স্টেডিয়ামের একাডেমি মাঠে বোলিং অনুশীলন করেছিলেন। এর মাঝেই শুরু হলো সংবাদ সম্মেলন। ঘোষণা হলো বাংলাদেশ জাতীয় দল। সাকিব-তামিম সবাই ছিলেন। নেই শুধু একজনের নাম। মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা কৌশিক।
ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল, ইমরুল কায়েস, জুনায়েদ সিদ্দিক, রকিবুল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহ, নাজমুল হোসেন, নাঈম ইসলাম, রুবেল হোসেন, শফিউল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক, সোহরাওয়ার্দী শুভ ও শাহরিয়ার নাফীসও। কিন্তু দলের মূল পেস স্তম্ভ মাশরাফি ছিলেন না স্বপ্নের সেই দলে। খবর পেয়ে ঘরের পানে হাঁটলেন মাশরাফি। স্টেডিয়াম চত্বর পার হচ্ছিলেন, ছুঁটে এলেন টেলিভিশন ও বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সাংবাদিকরা। সবার মুখে প্রশ্ন একটাই; ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ। অথচ আপনি নাই। খেলতে না পারা অনুভূতি কেমন?
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মাশরাফি। মুখের প্রথম কথাটার পর শুধু কান্না। পাশের সাংবাদিকদের মনটাও যেন মলিন হয়ে গেল। ১০ মিনিট পর কান্না থামিয়ে আজকের অধিনায়ক বললেন, ‘নির্বাচকরা হয়তো মনে করেছে আমি ফিট নই। জানি না আর কখনো ফিরতে পারব কি না। তবে আর দশটা মানুষের মতোই বাংলাদেশকে সমর্থন দিব। দলে যারা সুযোগ পেয়েছে তাদের শুভেচ্ছা।’
আসুন আজকের দিনটা দেখি; মিরপুর স্টেডিয়ামের আউটডোরের মাঠে বোলিং অনুশীলন করতে আসেন তাসকিন আহমেদ। সম্মেলন কক্ষে জাতীয় দল ঘোষণার কার্যক্রম চলছে। কিছুক্ষণ পর আসবে ঘোষণা। কিছুটা অনুমিত হয়ত ছিল তাসকিনের। তবুও আশা ছিল অন্তর্ভূক্ত হবেন দলে। বিপিএলের পারফরম্যান্সের পর নিজের কড়া অনুশীলনের ওপর ভরসা করে ভেবেছিলেন ত্রিদেশীয় সিরিজে রাখা হবে তাকে। বিশ্বকাপের আয়োজন তো বড়। কিন্তু ঘোষণায় যখন আয়ারল্যান্ড সফরেও নিজের নাম খুঁজে পেলেন না, পুরোদস্তুর অবাক হয়ে গিয়েছেন এই পেসার।
সাংবাদিকরা এলেন। তাদের প্রশ্ন ছিল; বিশ্বকাপ দলে তো নেই আপনি, আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে কেন নেই? নিজেকে শক্ত করে উত্তর দিলেন, ‘না ঠিক আছে। সবাই তো ভালই চায়। দলের খারাপ কেউই চায় না। সামনে আরও সুযোগ আছে। আমি চেষ্টা করবো। প্রিমিয়ার লিগ, সুপার লিগ আছে ভাল করার চেষ্টা করবো। আমার কিছু বলার নাই। তারা (নির্বাচক) যা ভালো মনে করেছে তাই করেছে। এই আড়াই মাস আমি যা কষ্ট করেছি, আমি আর কখনো এমন কষ্ট করি নাই।’
মাশরাফির উত্তরসূরী নিজেও পারলেন না বুকের কষ্টগুলোকে বেঁধে রাখতে। অঝরে কেঁদে দিলেন তাসকিন। কান্না থামাতে না পেরে শেষমেস চলেই যান ড্রেসিং রুমে। এবারের দলে আছেন তামিম ইকবাল, লিটন দাস, সৌম্য সরকার, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মোহাম্মদ মিঠুন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাব্বির রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান, রুবেল হোসেন, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মেহেদী হাসান মিরাজ, আবু জায়েদ রাহী ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত।
২০১১ সালে মাশরাফি যদি দলে থাকতেন জয়ের পাল্লাটা হয়ত একটু বেশি ভারী হতো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। ২০১৯ সালে যদি তাসকিন থাকতেন হয়তো দলের জন্য বেশ ভালোই হতো। সেবার মাশরাফিকে দলে নেওয়া হয়নি ইনজুরির জন্যই। বিশ্বকাপের মাস তিনের আগে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলতে গিয়ে ইনজুরিতে পড়েছিলেন তিনি। পুনর্বাসনের পর ৮০ ভাগ ফিট হয়ে ফিরেছিলেন। কিন্তু ‘সম্পূর্ণ ফিট না হওয়ার’ কারণ দেখিয়ে তাকে নেওয়া হয়নি দলে। কিন্তু আজ দেখুন সেই মাশরাফিই পাল্টে দিয়েছেন দলের চেহারা। যারা ক্রিকেট দেখেন, তাদের হয়ত বলে দিতে হবে না দলের জন্য কী করেছেন মাশরাফি।
২০১৯ সালে তাসকিনের গল্পটাও অনেকটা সেরকম। পুরোপুরি না মিললেও অনেকটা কাছাকাছি। প্রায় ১৮ মাস যাবত দলের বাইরে এই পেসার। ইনজুরি কাটিয়ে ফিরলেও আবারও মুখ দেখেন ইনজুরির। বিপিএলে দুর্দান্ত পারফরম করে স্বদর্পে ফেরার আভাস দিয়েছিলেন। আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিও ছিলেন তিনি। তাকে দলে পেতে আশায় বুক বেঁধেছিলেন মাশরাফিরা। কারণটা ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ। সেবার পুরো সফরে ৯টি উইকেট পেয়েছিলেন। বিপিএলে ১২ ম্যাচে ১৪.৪৫ গড়ে পেয়েছিলেন ২২টি উইকেট।
তিনি যে দলে থাকতে চাইবেন তা তো অনুমেয় তার সতীর্থদের। কিন্তু আবারও ইনজুরির আঘাত ডানা কাটল তাসকিনের। বিপিএলে নিজেদের শেষ ম্যাচে চিটাগং ভাইকিংসের বিপক্ষে ফিল্ডিং করার সময় চোট পান গোড়ালিতে। ইনজুরি কাটিয়ে গত মাস থেকেই পুনর্বাসন শুরু করেছিলেন। খেলেছিলেন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে দুটি ম্যাচও। কিন্তু তার চেনা ছন্দ ও বোলিংয়ের ধার দেখাতে পারেননি নির্বাচকদের। ফলাফল স্বপ্নের বিশ্বকাপ দলে তো নেই, থাকছেন না ত্রিদেশীয় সিরিজের দলেও।
তাসকিনের আক্ষেপটা থাকবে। কিন্তু কখনও যদি তার মাশরাফি হয়ে ওঠা হয়; দেশবাসী হয়তো দেখতে পাবেন নান্দনিক ক্রিকেট। এই তাসকিনই একদিন বিশ্বকাপে দলের পেস বোলিংয়ের নেতৃত্ব দেবেন। হয়তো শিরোপাটাও ছুঁতে পারেন।




