ফেনীর ম্যাজিস্ট্রেটের মুখে সন্ত্রাসের তথ্য!
ডেস্ক রিপোর্ট : ‘আমি করব আওয়ামী লীগ, আর তোরা করবি হাজারী লীগ’ এটা ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলোচিত গডফাদার জয়নাল হাজারীর ডায়ালগ! ১৯৯৬-২০০১ সালে জয়নাল হাজারীর প্রতাপে এই জেলাকে মৃত্যু উপত্যকা ও লেবানন বলে দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করে। ২০১৯ সালে এসেও আলোচনার বাইরে নেই সন্ত্রাসের জনপদ খ্যাত এই জেলা। সমপ্রতি দিনদুপুরে এইচএসসি পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পরীক্ষাকেন্দ্রে পুড়িয়ে মারা হয়। এরপরই ফের দেশ-বিদেশে আবারো আলোচনায় আসে পুরনো সন্ত্রাসের জনপদ ফেনী। এর আগে শতশত মানুষের সামনে ফেনীর একাডেমি রোড, বিলাসী সিনেমা হলের সামনে ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামুল হক একরামকে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে আগুনে পুড়িয়ে দেহ পর্যন্ত অঙ্গার করা হয়। মানুষ একরামের কথা মনে পড়লে শিহরিত হয়ে উঠে! স্থানীয়দের মত, এখন ফেনীর সন্ত্রাস পুরনো স্টাইলে চলছে। দিনদুপুরে চুরি, ছিনতাই, অপহরণ, গুম, টেন্ডারবাজি, বালুমহাল লুট, বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারে অস্ত্রের মহড়া, স্বর্ণ দোকানে ডাকাতি, ব্যাংকের টাকা ছিনতাই ও খুন ফেনীতে এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ড্রিল মেশিন দিয়ে মানুষ ছিদ্র করার রেকর্ড কমলেও পুড়িয়ে মানুষ হত্যা থেকে রেহাই পাচ্ছে না ফেনী জেলার নাগরিকরা। কখনো একরাম, কখনো নুসরাত, এর পর হয়তো আমি অথবা আপনি এমন কথাই ফেনীর মানুষের মুখে মুখে।
তবে এবার ফেনীর সন্ত্রাস নিয়ে মুখ খুলেছেন ফেনীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানা! তিনি প্রকাশ করেছেন- কাদের ছত্রছায়ায় ফেনীর সন্ত্রাসীরা লালিত-পালিত হয়! সন্ত্রাসীদের মূল খুঁটিতে কারা? সন্ত্রাস থেকে দায়মুক্তি হতে সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর। পরীক্ষাকেন্দ্রে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার পর থেকে একের পর এক সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসীর অভিভাবকদের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। নুসরাতকে আগুন দেয়ার পর ১১ এপ্রিল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানা লিখেছেন- হত্যাকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা করল কারা? কারা এটাকে অত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করল? কারা হত্যাকারীদের পালাতে সহায়তা করল? কোন অদৃশ্য হাত লম্পট অধ্যক্ষকে বাঁচানোর চেষ্টা করল? এখনো কারা ষড়যন্ত্রকারীদের আশ্র?য় দিয়ে রেখেছে? এগুলো লিখতে পারবেন সাংবাদিক ভাইয়েরা…! লিখুন এদের বিচার ছাড়া আপনারা বিচার মানবেন না! আপনাদের সাথে তো প্রধানমন্ত্রীও আছেন। লিখুন…এই অদৃশ্য হাতই অনেক অপরাধের মূল নিয়ন্ত্রক! এই অদৃশ্য হাতের বন্ধনে সবার হাত আবদ্ধ। অথচ এই হাত কিছুই না, চোখের নিমিষে ছুড়ে ফেলা যায়। আপনার প্রজ্ঞা, সততা আর সাহস দিয়ে। আফসোস বুদ্ধিহীন, অসৎ আর কলিজাহীন শকুনগুলোর জন্য। আফসোস এদের অভিনয়সর্বস্ব জীবনের জন্য। তার এই লেখায় দুই হাজারের উপরে লাইক, কয়েক শত শেয়ার ও কমেন্টস পড়তে দেখা গেছে। গত ১১ এপ্রিল ফেনীর সাংবাদিক উদ্দেশ্য করে আরেকটি লেখা লিখেন সোহেল রানা। এতে তিনি লিখেছেন- ইতিহাস নিজ হাতে লিখেন! সাংবাদিক ভাইয়েরা বলে দেন, কার হুকুমে মামলা নিয়ে নয়ছয় হলো? কারা অধ্যক্ষকে সমর্থন করেছে? কারা হত্যাকারীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে…।
একেবারে গোড়াসহ লিখেন। ওসির ওই ব্যবহারের পেছনে কে বা কারা কাজ করেছে? কারা মূল মদদদাতা আর কারা তাদের বাঁচাতে চায়। নুসরাত দিয়েই শুরু হোক। ভবিষ্যতের ইতিহাস লিখেন…। নুসরাত আগুনে পোড়ার দিনগুলো লম্বা হলো, কিন্তু ফেনীর কোনো সাংবাদিক সত্য ঘটনা লিখেনি। অবশেষে মুখ খুললেন ফেনীর ওই ম্যাজিস্ট্রেট! সন্ত্রাসী কারা? আর সন্ত্রাসীদের ছায়াদানকারী কারা, তাদেরও পরিচয় তুলে ধরলেন তিনি। গতকাল তিনি বললেন, আপনারা সবই জানেন, তাও বলি, সত্য সূর্যের মতোই…দিনেদুপুরে ছিনতাই হয়েছে বিজয়সিং দীঘিতে। ছিনতাইয়ের শিকার যুবকের করা মামলা নেয়নি ওসি রাশেদ চৌধুরী। মামলা নিতে চাপ প্রয়োগ করতে হয়েছে। তারপরও নেয়নি মামলা। এরপর, অন্তত ১০টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আমি থানায় পাঠিয়েছি ভিকটিমকে। ওসি মামলা নেয়নি। জিডি করতে বাধ্য হয়েছে ভিকটিমরা। আমার জিজ্ঞাসা কেন মামলা নেয়নি ওসি? ছিনতাইয়ের কি জিডি হয়? তিনি আরো বলেন, ফেনীতে দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে জায়গা দখল করেছে এক কাউন্সিলর, অন্যখানে আরেকজন প্রভাবশালী নেতা। তাকে জায়গা দখলে সুরক্ষা দিয়েছে স্বয়ং সদর থানার ওসি। আমি বাধা দিতে চেয়েছি, আমাকে থামানো হয়েছে। কে থামাতে চেয়েছে, সেটা আর না-ই বললাম। ফেনী শহরজুড়ে অনেকগুলো পতিতালয় আছে। যেখানে মানুষকে নিয়ে ভিকটিম বানিয়ে পুলিশকে খবর দেয়া হয় এবং তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে টাকা উদ্ধার করা হয়। এরকম ঘটনা আমার কাছে এসেছে অসংখ্য। এসব পতিতালয়ের নিয়ন্ত্রক কারা? প্রকাশ্যে জনিকে অস্ত্রসহ ধরার পর পুলিশকে আসতে বলি স্পটে।
সেখানে পুলিশ আসে এবং আমাকে সাহায্য করে। আমি পুলিশকে অস্ত্র আইনে মামলা করতে বলি, পুলিশ মামলা করতে অপারগতা জানায়। কেন? আমাকে পুলিশ এও বলে যে, আমি ধরেছি আমাকেই মামলা করতে হবে। অথচ পুলিশ আমার সাথেই ছিল। হাস্যকর না! ওই ম্যাজিস্ট্রেট আরো বলেন, ফেনীর এক চেয়ারম্যান আমাকে চোরাচালানের তথ্য দেয়ার জন্য রাজনৈতিক বড় নেতা থেকে শুরু করে সিন্ডিকেটের সবাই তাকে শাসিয়েছে। ডিবির এএসপি আমিনুল তাকে বলেছে- সে কিভাবে নির্বাচন করে সেটা সে দেখে নেবে। ফেনীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষিজমির মাটি কাটা নিয়ে শুরু করে, মাদক, স্বর্ণ চোরাচালান, প্রায় প্রতিটি বিষয়ে যতটা না অপরাধীদের সাথে; তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে এই সিন্ডিকেটের সাথে। ফেনীর বালুমহাল নিয়ন্ত্রকদের শাস্তি প্রদানে কাজ করতে পারিনি আমি। একটা বছর ধরে পুরো সিন্ডিকেট মিলে আমাকে পদে পদে বাধা দিয়েছে। নির্বাচনে আমার গাড়ি থেকে প্রটেকশন উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। সারারাত জেগে আমার পরিবারকে পাহারা দিতে হয়েছে। এই শহরের প্রতিটি ইঞ্চি আমি চিনি। শহরের প্রতিটি ইটের ভাষাও আমি জানি। সংগ্রামটা অবিশ্বাস্য হলেও শুধু আমার একারই ছিল, আমি ভয়ানক একাই ছিলাম। শুধু আমার দু’-একজন বস আর ফেনীর সাধারণ মানুষ ছিল সাথে। তাদের কারণেই এক ইঞ্চি মাঠও ছাড়িনি। তবে অনেক সময়ই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারি না, থামিয়ে দেয়া হয়েছে। এ জন্য নিজেকে প্রায়ই অপরাধী মনে হয়।তিনি আরো বলেন, পুরো প্রশাসন হয় উদাসীন, নয় অপরাধের সাথে জড়িত, সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত, অন্যায়ের সাথে, দুর্নীতির সাথে জড়িত। উদাসীনও এক ধরনের অপরাধ। এদের মুখে বঙ্গবন্ধুর কথা শুনলে আমার থুথু দিতে ইচ্ছে হতো। এগুলো কিছুই সাংবাদিকরা লিখেনি। আমি লিখতে বলেছি, তারা ভয়ে লিখেনি। রয়েছে এমন শত শত ঘটনা। এসব ঘটনা বলার কারণ, এগুলো অন্যায়, ভয়াবহ অন্যায়। এই সমাজ এই অন্যায়গুলোর ধারক ও বাহক। এদের কাছে আপনি কিভাবে নুসরাত হত্যার বিচার পাবেন? স্বেচ্ছায় বিদেশে এসেছি পড়তে, দেশে ফিরব পড়াশোনা করে। সরকার চাইলে কাজ করব, নাহলে চাকরি ছেড়ে দেবো। প্রত্যয় এটুকুই- যুদ্ধের জীবন চলছে, চলবে। তার এই সাহসী ভূমিকার লেখা এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সবার ওয়ালে ঘুরছে। করা হয়েছে হাজার হাজার শেয়ার। গতকাল প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান করে আরেক লেখা লিখেছেন সমপ্রতি আলোচিত সোহেল রানা। তিনি বলেছেন- নুসরাতের হত্যা নিয়ে আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে বলে মনে হয়েছিল। হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী ফেনীর সিন্ডিকেট ভেঙে দেবেন বলে মনে হয়েছিল। তাও হবে কি না জানি না। অনলাইনে আমাকে আক্রমণ করছেন অনেকে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জিয়াউল আলম মিস্টার। ওই মিস্টার তিনটি মাদক তালিকাতেই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তালিকা (২০১৪) ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুটি তালিকা ( ২০১৬ ও ২০১৭) এই তিন তালিকাতেই স্পষ্ট করে লেখা- মিস্টার ফেনী সদর উপজেলার মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রক। এই মিস্টারের প্রধান সহযোগী মাসুদের ওখানে যখন আমি অভিযান পরিচালনা করি, তখন সে আমার বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিয়েছিল, বলেছিল- মাসুদ ও সে চক্রান্তের শিকার। আমার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। অথচ, ওই মাসুদের দেড় কেজি হেরোইন ও ২৯ পিস বুলেটসহ আমি আটক করি, যা সম্ভবত ফেনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চালান। সে আদালতে স্বীকারোক্তিও দিয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি খবর নিন, মিস্টারদের বিরুদ্ধে সোহেলরানা ছাড়া গত তিন বছরে আর কেউ অভিযান পরিচালনা করেছেন কি না? কোনো পুলিশি অভিযান হয়েছে কি না? এই মিস্টার এখন বিভিন্ন জনকে ওসি রাশেদের পোস্ট শেয়ার করার জন্য বলছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, যতদিন এসব লোক বঙ্গবন্ধুর নামে স্লোগান দেবে, ততদিন এই দেশ স্বাধীন বলে আমি বিশ্বাস করি না। ফেনীতে এদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না। এরা আমাকে অপমান করে করুক, আমার কিছু আসে যায় না। তবে, আপনি খতিয়ে দেখুন, দুর্নীতিবাজ অফিসারদের নিয়ে এদের আস্ফাালন, কি দানবাকৃতি। যদি আমি ভুল হই, তবে আমাকে চাকরিচ্যুত করুন। আর যদি আমি ঠিক হই, আপনি রক্ষা করুন ফেনীকে। দয়া করে জিজ্ঞেস করুন, মাদক তালিকায় যারা শীর্ষে তাদের বিরুদ্ধে কেন কোনো অভিযান নেই? আর তা না হলে, আরো অনেক নুসরাতের মতো পরিণতি দেখার প্রস্তুতি আমাদের নিতে হবে। উৎস : আমার সংবাদ ও আমাদের সময়.কম।




