বিএনপিতে গণপদত্যাগের আভাস
নিউজ ডেস্ক।। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করছেন সাবেক এমপিসহ প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা। এর ধারাবাহিকতায় এখন স্থায়ী কমিটির এক সদস্যসহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতারা গণপদত্যাগ করতে পারেন বলেও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। তৃণমূলের গণপদত্যাগের গুঞ্জনে শীর্ষ নেতৃত্ব চিন্তিত হলেও কৌশলে পরিস্থিতি মোকাবেলার কথা ভাবা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ের কিছু নেতা পারস্পরিক যোগাযোগ করে একযোগে পদত্যাগের আওয়াজ দিচ্ছেন। বিএনপির নির্বাহী কমিটির একটি বড় অংশ এবং জেলা পর্যায়ের এক-তৃতীয়াংশ সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক এ গণপদত্যাগে অংশগ্রহণ করতে পারেন। সম্মিলিত এ কার্যক্রমে কেউ ভেতর থেকে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন, এ বিষয়টি মাথায় রেখে গোপনীয়তাও অবলম্বন করা হচ্ছে। শীর্ষ নেতৃত্ব গণপদত্যাগের উদ্যোগ ঠেকাতে না পারলে উপজেলা নির্বাচনের পরপরই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক যুগ ধরে মামলা-হামলা-নির্যাতনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও হয়রানির শিকার হতে পারেন- এমন শঙ্কায় নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বেশিরভাগ নেতা। ব্যবসা-বাণিজ্য রক্ষা, রাজনৈতিক হয়রানি থেকে নিষ্কৃতি পেতেই তারা পদত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন। এর বাইরে পদ-পদবি নিয়ে অসন্তোষ ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে মূল্যায়ন না করার কারণে কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করতে পারেন। মূলত ব্যক্তিগত এসব অসুবিধা ও অভিমানের কারণে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেও গণপদত্যাগের উদ্যোক্তারা অন্য কয়েকটি কারণ সামনে আনতে পারেন। এগুলো হচ্ছে- জিয়ার আদর্শ থেকে দলের বিচু্যতি, দল পরিচালনার নানা ত্রম্নটি, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কার্যকর উদ্যোগ না নেয়া, নির্বাচন পরিচালনায় সমন্বয়হীনতা, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে অতিমাত্রায় প্রাধান্য দেয়া এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তৃণমূলের কথা না শোনা ইত্যাদি।
তৃণমূল বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, উপজেলা নির্বাচন নিয়ে কোনোরকম যাচাই-বাছাই কিংবা গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করেই গণবহিষ্কারে ফুঁসে উঠছে তৃণমূল বিএনপি। সেখান থেকে এ গণপদত্যাগের ধারণাটি এসেছে।
আলাপকালে পদত্যাগে আগ্রহী একাধিক নেতা বলেন, গত ১ যুগে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি সহায়-সম্বল হারিয়ে একরকম সর্বশান্ত হয়ে গেছেন। নিজের মামলা চালিয়ে যাওয়া যদি একমাত্র কাজ হতো তাহলে কোনো বিষয় ছিল না। প্রতিটি নেতাকর্মীর মামলা চালানো, কারাগারে দেখভালের পাশাপাশি কর্মীদের সংসার পর্যন্ত চালাতে হচ্ছে। আইনি লড়াইয়ে দলীয় আইনজীবীদের কাছ থেকে পর্যন্ত অর্থকড়ির কোনো ছাড় পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রীয়ভাবে দল বলতে গেলে কোনো সহযোগিতা করেনি। এরপরও দলকে ভালোবেসে আবারও সুসংগঠিত হওয়ার কথা ভাবলেও কেন্দ্রীয় কিছু নেতার স্বার্থের কারণে তা সম্ভব হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখছেন না। সঙ্গত কারণে পদত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন।
বিএনপি সূত্রমতে, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সহ-অর্থবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাবউদ্দিন, নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য আলী আসগার লবী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শাহ আলম পদত্যাগের পর গণপদত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে সিনিয়র নেতারা আলোচনা করেন। আলোচনায় উঠে আসে, যারা পদত্যাগ করেছে তাদের নিয়ে চিন্তিত নয় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সরকারের চাপে দুর্বলচিত্তের কেউ কেউ দল ছাড়লেও তাদের নিয়ে না ভাবারও সিদ্ধান্ত হয়। তবে দলীয় কোনো ভুল সিদ্ধন্তের কারণে নেতাকর্মীরাও যাতে দল না ছাড়ে সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হাইকমান্ড সংশ্লিষ্ট নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
বিএনপির সিনিয়র এক নেতা জানান, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ থাকবে, এটা স্বাভাবিক। এখন বিএনপিতে সুবিধা নেই। এ জন্য কেউ কেউ দল ছাড়তে পারে। পদত্যাগ বা গণপদত্যাগের বিষয়ে যেসব নেতার নাম শোনা যাচ্ছে তাদের অনেকেই সুবিধাবাদী হিসেবে চিহ্নিত। বিএনপির মতো বড় দলে সুবিধাবাদী কিছুু নেতা চলে গেলে দলের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু যারা সত্যিকারের ত্যাগী নেতাকর্মী তারা দল ছেড়ে যায়নি, যাবেও না। সুবিধাবাদীদের বিএনপির দরকার নেই। ত্যাগীদেরই দরকার। এজন্য ত্যাগী নেতাকর্মীরা যাতে ভুল বুঝে অন্যকোনো পথে পা না বাড়ান সেই উদ্যোগ বিএনপিতে সব সময় ছিল, আছে এবং থাকবে।
এই নেতা বলেন, সিনিয়র নেতাদের মধ্যে কয়েকজন নেতা আগে থেকেই পদত্যাগের কথা বলে আসছেন শুধু নিজের বয়স এবং তরুণদের নেতৃত্বে আনতে। দলকে ভালোবেসেই শীর্ষ দুই-একজন নেতা পদত্যাগের কথা ভাবছেন। সম্প্রতি পদত্যাগ এবং গণপদত্যাগের গুঞ্জনের বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকারের নানামুখী চাপের কারণে কেউ কেউ পদত্যাগপত্র দিচ্ছেন। এসব পদত্যাগে বিএনপির রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। যারা যাচ্ছেন তারা রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। আর গুঞ্জনের বিষয় আমলে নেয়ার কিছু নেই। উৎস: যায়যায়দিন




