বনানী ট্রাজেডি : অষ্টম তলায় আগুন লাগে, বাজেনি ফায়ার অ্যালার্ম
নিউজ ডেস্ক।। বনানীর এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত অষ্টম তলার একটি বায়িং হাউস স্পেক্ট্রা এসএন থেকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির গণশুনানিতে এ তথ্য পাওয়া গেছে। রোববার এফ আর টাওয়ার সংলগ্ন সফুরা টাওয়ারে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে এ গণশুনানি হয়। গণশুনানিতে জানা গেছে, ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থারও ঘাটতি ছিল। আগুন লাগার পর ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি। ফলে কেউ সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাননি। এতে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। আগুন লাগার খবর পেয়ে ভবনে অবস্থানরত ব্যক্তিরা নামার চেষ্টা করেন। ততক্ষণে সিঁড়ি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ফায়ার এপিট সিঁড়িও ছিল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ভবনটিতে কখনও অগ্নি মহড়াও করেনি ভবন কর্তৃপক্ষ।
দুর্ঘটনার সময় ভবনে অবস্থানকারী ও আশপাশের ভবনের প্রত্যক্ষদর্শী ২৪ জন গণশুনানিতে অংশ নেন। পরে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফয়জুর রহমান গণশুনানিতে পাওয়া এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, গণশুনানিতে অংশগ্রহণকারীদের ভাষ্য থেকে জানা গেছে, ভবনের অষ্টম তলার স্পেক্ট্রা এসএন বায়িং হাউসের অফিস থেকে বিদ্যুতের শর্ট সার্কিটে আগুন লাগে। তবে আগুন লাগার পর কোনো ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি। নিচে থেকে আগুন ওপরে উঠতে দেখা গেছে। তবে এসব চূড়ান্ত কোনো মতামত নয়। তদন্ত কমিটি আরও অনেক যাচাই-বাছাই করে রিপোর্ট দেবে।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে এই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, ভবনটির বিভিন্ন অফিসে কর্মরত অনেকেরই সেখানে টাকা-পয়সা, ব্যাংকের চেকবই, ল্যাপটপ, পাসপোর্টসহ মূল্যবান কাগজপত্র রয়েছে। সেগুলো তারা আনতে পারছেন না। পুলিশ তাদের স্বাধীনভাবে অফিসে যাতায়াত করতে দিচ্ছে না। এতে তাদের মারাত্মক অসুবিধা ও ক্ষতি হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের ২৩ তলা এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের পর ২৬ জন মারা যান। আহত হন অর্ধশতাধিক। ভবনটিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এতে।
ভবনটির দশম তলার টেকনো সার্ভিস লিমিটেডের ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম জানান, মানুষের চিৎকার শুনতে পেয়ে তিনি জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে শত শত লোককে দেখেন। তার পর বিষয়টি বুঝতে পেরে ফায়ার এপিট দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু পারেননি। ফায়ার এপিট আর সিঁড়িতে ছিল ধোঁয়ার কুণ্ডলী। মানুষজনও ভিড় করে ছিল। পরে তিনি সিঁড়ি দিয়ে ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা দেখতে পান।
তিনি আরও জানান, তাদের অফিসের ভেতর তিনটি ওয়াশরুম আছে। এর একটির জানালা বেশ বড়। ওই জানালার প্রায় সরাসরি আহমেদ টাওয়ারেরও একটি জানালা আছে। প্রথমে তিনি তাদের ওয়াশরুমের জানালাটা লোহার রড দিয়ে ভেঙে ফেলেন। পাশাপাশি পরিচিতজনদের ফোন দিয়ে আহমদ টাওয়ারের ওয়াশরুমের ওই জানালাটা ভাঙতে বলেন। তারা আহমদ টাওয়ারে উঠে সেই জানালার গ্রিল ভেঙে দেন। এর পর তাদের অফিসের ৩০-৪০ জন আহমদ টাওয়ারে গিয়ে সেটির সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসেন।
এফ আর টাওয়ারের ২১ তলায় অবস্থিত কাশেম ড্রাইসেলের কর্মী সালাহউদ্দিন বলেন, আগুন লাগার খবর পেয়ে দরজা খুলতেই দেখি সিঁড়ি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। তার মধ্য দিয়েই ছাদে চলে যাই। ছাদ হয়ে পাশের ভবনে লাফিয়ে পড়ি। এ সময় হুড়োহুড়িতে অফিসের একজন মারা যান। এফ আর টাওয়ারের পাশের ভবন আওয়াল টাওয়ারের অষ্টম তলার একটি অফিসে কর্মরত অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান তালুকদার বলেন, অষ্টম তলাতেই প্রথম আগুন দেখতে পাই। আগুন ধরার আধাঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস আসে। তবে পানি না পাওয়ায় আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে কিছু সময় লাগে।
বনানীর বিটিএ টাওয়ারের নিরাপত্তাকর্মী আসলাম হোসেন বলেন, আগুন লাগার সময় কোনো শব্দ পাওয়া যায়নি। বাইরে থেকে নয়; ভবনের ভেতর থেকেই আগুন শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ভবনটিতে কখনও অগ্নিকাণ্ডের মহড়া দেখা যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনের মধ্যেই ছিলেন ইবনে হাসনাত। তিনি বলেন, ভবনের সিঁড়িতে বা ভেতরে যেভাবে আগুন নেভানোর সামগ্রী থাকার কথা, সে রকম ছিল না। ফায়ার এপিট রুটও কেউ খুঁজে পায়নি। অনেকে জানতই না ভবনটির কোথায় ফায়ার এপিট রুট আছে। এ জন্য সবাই সিঁড়িতে জড়ো হয়। ভবনটির নয় তলার ইম্পায়ার গ্রুপের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এমএম কামাল জানান, আট তলায় আগুন দেখতে পেয়েই তিনি সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত ছাদে চলে যান এবং লাফ দিয়ে অন্য ভবনে গিয়ে পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শী আসলাম বলেন, ভবনটির আট তলায় থাকা এসির পাইপে ধোঁয়া বেরুতে দেখার পরপরই আট তলার গ্লাস ভেঙে পড়ে।
এফ আর টাওয়ারের ১১ তলার ইইউ সার্ভিস বিডি লিমিটেডে কর্মরত আমিনুল ইসলাম জানান, তিনি শুরুতেই ছাদ দিয়ে অন্য ভবন হয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। পরে ভবনের সবাইকে ফোনে জানান। কিন্তু ধোঁয়া ও অন্ধকারের কারণে তার অফিসের সবাই নামতে পারেননি। একজন নারী ও চারজন পুরুষ কর্মী মারা গেছেন।
ভবনটির ১৩ তলার ডার্ড নামে একটি পোশাক কারখানার কর্মী শফিকুল বলেন, নিরাপত্তাকর্মীদের বাঁশির শব্দ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে প্রথমে নিচে নামার চেষ্টা করি। কিন্তু সাত-আট তলার কাছে গিয়ে দেখি আর নামার মতো অবস্থা নেই। পরে ওপরে উঠে যাই। তরিকুল ইসলাম নামে আরেকজন বলেন, আগুন লাগার পর ছাদে চলে যাই। কয়েক ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে যখন বেরিয়ে আসি, তখন সিঁড়িতেই কয়েকটি লাশ পড়ে থাকতে দেখি। পাশের একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী সুমন বলেন, দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে আগুন লাগে। সাত তলায় আগুন জ্বলতে দেখি। এর পরই ওই তলার কাচ ভেঙে পড়ে। উৎস: সমকাল।




