বনানী ট্রাজেডি : ‘পুড়ে মরার চেয়ে তার বেয়ে নামাই ভালো’
নিউজ ডেস্ক।। ‘চোখের সামনে আগুনের কুণ্ডলী ধেয়ে আসছে ফ্লোরের দিকে। পুরো ঘর অন্ধকার। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। চিন্তা করলাম- ডু অর ডাই। ভাবলাম, আগুনে পুড়ে মরার চেয়ে ভবনের গায়ে জড়ানো তার বেয়ে নেমে পড়ি। যদি আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখেন। এগারো তলা থেকে তার বেয়ে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ফোন করলাম এফ আর টাওয়ারের সামনে পার্ক প্লাজার ম্যানেজার মোস্তাফিজকে। ও আমার আপন ভাই। তাকে জানালাম- তার বেয়ে নামতে যাচ্ছি, পারলে নামার দৃশ্যটা ভিডিও করিস। যাতে আমি মরে যাওয়ার পর আমার ছেলেমেয়েকে দেখিয়ে বলতে পারিস, আমি বাঁচার জন্য কম চেষ্টা করিনি। ওদের সঙ্গে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার তৃষ্ণা ছিল আমার। এটুকু জানিয়ে জানালার গ্লাস ভেঙে তার বেয়ে নিচে নামতে শুরু করি।’
আগুনের মুখ থেকে বাঁচতে এফ আর টাওয়ারের এগারো তলা থেকে তার বেয়ে নেমে প্রাণে বেঁচে গেছেন মামুনুর রশিদ মামুন। ওই ভবনের স্কাইওয়েল ফ্রেইড অ্যান্ড লজিস্টিক প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন তিনি।
গতকাল শনিবার মামুন এসেছিলেন পুড়ে যাওয়া এফ আর টাওয়ারের সামনে। তার সঙ্গে ছিলেন একই প্রতিষ্ঠানের আরও কয়েক কর্মী। সেখানে ছিলেন তার প্রতিষ্ঠানের বিদেশি প্রতিনিধিরাও। যারা অগ্নিকাণ্ডের তথ্য পেয়ে সহকর্মীদের খোঁজ নিতে বাংলাদেশে এসেছেন। তাদের প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে তা দেখতে এফ আর টাওয়ারের সামনে হাজির হয়েছিলেন সবাই। প্রায় সব সহকর্মী মামুনকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমিই প্রথম ব্যক্তি যে এফ আর টাওয়ার থেকে তার বেয়ে লাফিয়ে পড়েছি। কেবল নেটওয়ার্কের তার বেয়ে তিনতলা পর্যন্ত আসার পর দেখি শরীরের আশপাশ দিয়ে ভাঙা কাচ পড়ছে। তাৎক্ষণিক মনে হয়েছে, যে কোনো একটি কাচ গায়ে লাগলে বাঁচার উপায় থাকবে না। হঠাৎ তিনতলা থেকে গতিপথ পরিবর্তন করে তার বেয়ে পাশের বিল্ডিংয়ের দিকে চলে যাই। পরে সেই ভবনের তার বেয়ে নিচে নেমে আসি। মাটিতে নামার পরপরই আমার ভাইসহ পরিচিতরা এগিয়ে এসে উদ্ধার করেন আমাকে।’
মামুন আরও বলেন, ‘বয়স ৬০ বছর পেরিয়েছে। এই বয়সে তার বেয়ে নেমে বাঁচতে পারব, এটা কল্পনায়ও ছিল না। এখন সত্যিই বোনাস লাইফ পার করছি। প্রথম দিন শরীরে তীব্র ব্যথা ছিল। সামান্য ওষুধ খাওয়ার পর সেটা কেটে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার সময় আমাদের কার্যালয়ে ২২ জন লোক ছিলেন। তাদের মধ্যে আমার সহকর্মী আমিনা, পারভেজ, পলি, শ্রীলংকার নাগরিক নিরেস ও আতিক- এই পাঁচজনকে আমরা হারিয়েছি। দশজন তার বেয়ে নেমে বাঁচতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে দু’জন নারী। বাকিরা কে কীভাবে বেঁচে রয়েছেন জানি না।’
মামুন যখন তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ এফ আর টাওয়ারের ম্যানেজার মোজাম্মেল হোসেনের দিকে চোখ পড়ে তার। তাকে দেখেই রেগে উত্তেজিত হয়ে হুঙ্কার ছাড়েন মামুন- ‘কোথায় ছিলেন সেদিন! আগুন লাগার ৩০ মিনিট পর জানতে পারলাম। কোনো ফায়ার অ্যালার্ম বাজানো হলো না কেন? গাফিলতির কারণেই সহকর্মীদের হারাতে হয়েছে। যখন তারে ঝুলছিলাম, তখনও শরীরের পাশ দিয়ে কয়েকজনকে ছিটকে পড়ে মরতে দেখেছি।’ মামুনের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জে। দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তার ছোট্ট পরিবার। বেঁচে যাওয়ার পর সন্তানদের কথা ভেবেই আনন্দ পেয়েছেন তিনি। বছরখানেক আগে মামুনের স্ত্রী মারা গেছেন। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করেন। মেজ ছেলে গ্রামে থাকেন। ছোট ছেলে সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটিতে পড়ছেন। তাকে নিয়েই মামুন নিকুঞ্জে বসবাস করে আসছিলেন।
একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সাইফুর রহমান। তিনিও তার বেয়ে নিচে নেমে জীবন বাঁচিয়েছেন। তবে তার বেঁচে থাকার গল্পটি ভিন্ন। সাইফুর বলেন, ‘এগারো তলা থেকে তার বেয়ে কিছুদূর নামার পর হঠাৎ হাত ফসকে তার ছুটে যায়। এ সময় ভাগ্যক্রমে এসির ফ্রেমের সঙ্গে আটকে ঝুলতে থাকি। কত তলার কাছাকাছি আটকে ছিলাম, তা বলতে পারব না। হঠাৎ পাশের ভবনের জানালার গ্লাস ভেঙে কিছু লোক আমাকে ভেতরে নিয়ে আসেন। যখন তারা আমাকে উদ্ধার করলেন, তখন মনে হলো সত্যিকার অর্থে তারা দেবদূত। না হলে কেন এভাবে প্রাণে বেঁচে যাব আমি!’
তিনি আরও বলেন, ‘২৫ মিনিট পর ভবনে আগুন লাগার বিষয়টি টের পেয়েছি। কোনো ফায়ার অ্যালার্ম বাজানো হয়নি। আমরা অপেক্ষা করছিলাম ফায়ার সার্ভিসের লোকজন আমাদের উদ্ধার করবেন। ৪০ মিনিট পর্যন্ত কেউ আসেনি। আগুনের তাপ সহ্য করেও অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম দশতলা থেকে আগুন আমাদের অফিসের দিকে আসছে, দিশেহারা হয়ে যাই। তার বেয়ে নেমে পড়ি তখনই।’ উৎস: সমকাল।




