‘পায়ে ধইরা প্রাণ ভিক্ষা চাইছি, হেরপরও ওরা মোর অবুঝ শিশুর সামনে স্বামীরে কোপাইয়া মারছে’
‘মোর স্বামীর কোন অপরাধ নাই। হে নৌকা থুইয়া আনারস মার্কার পক্ষ করছে এই কারণে সন্ত্রাসীরা ঘর থেইকা ধাওয়া কইরা মাঠে ফালাইয়া কোপাইয়া মারছে। মুই দুই বছরের মাইয়া জান্নাতিরে বুকে লইয়া অগো পায়ে পইড়া কানছি। স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা চাইছি। মোরে সন্তানসহ লাথি দিছে। হেরপর আমার আর অবুঝ মাইয়ার সামনে কোপাইয়া স্বামীর হাতে পায়ের রগ কাটছে। স্বামীর সারা শরীরে অরা ৪২টা কোপ দিছে। হেরপর মাঠে ফালাইয়া রাইখা সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়া কইছে হাসপাতালে নিবিনা জনি এইহানে মইরা থাকবে। হাসপাতালে নিলে তোর মাইয়া আর তোরে এইরহমভাবে জানে মাইরা ফালামু। আমার স্বামীরে যারা চোখের সামনে মারছে হেগো বিচার করেন।’
বসতঘরের উঠানে নিহত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জনি তালুকদার (২৫) এর লাশের পাশে বসে আহাজারি করছিলেন স্বামীহারা গৃহবধূ সাবিনা আক্তার (২০)। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উপজেলার হলতা গুলিসাখালী ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক জনি তালুকদারকে সোমবার সকালে বাড়ি থেকে ধাওয়া করে মাঠে ফেলে ২০/২৫ জনের একদল সন্ত্রাসী নৃশংসভাবে কুপিয়ে মাঠে ফেলে রাখে। পরে তাকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে সে মারা যায়।
বুধবার নিহত স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা জনি তালুকদারের লাশ বরিশালে ময়নাতদন্ত শেষে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। বিকাল চারটার দিকে লাশ বাড়ির উঠানে আসলে শোকার্ত গ্রামবাসী ও স্থানীয় আ.লীগের নেতা কর্মীরা সেখানে সমবেত হন। এসময় নিহতর পরিবারের স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় গুলিসাখালী জিকে ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়ে। জানাজার আগে সেখানে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। শোকসভায় বক্তব্য দেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুর রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক সেলিম মাতুব্বর, উপজেলা আ.লীগের সহ-সভাপতি আরিফ-উল-হক ও নিহত জনির চাচা স্বপন তালুকদার। শেষে নিহত জনির লাশ গুলিসাখালী বাজার সংলগ্ন বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
স্থানীয়দের সূত্রে জানাগেছে, আগামী ৩১ মার্চ মঠবাড়িয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নৌকা ও বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) আনারস প্রার্থীর সমর্থকদের মাঝে মনোনয়ন জমাদান থেকে নানা নির্বাচনী হাঙ্গামা চলে আসছিল। শনিবার রাতে গুলিসাখালী ইউনিয়ন বাজারে স্বতন্ত্র সমর্থক ইউপি সদস্য আলাউদ্দিনের ওপর হামলা চালায় নৌকার সমর্থকরা। এর জের ধরে স্বতন্ত্র (আনারস) প্রতিকের সমর্থকরা ধারলো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নৌকার প্রার্থী হোসাইন মোসারেফ সাকু ও তার সমর্থক গুলিসাখালী ইউপি চেয়ারম্যান রিয়াজুল আলম ঝনোসহ ১৯ জনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের বিবাদমান দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মাঝে উত্তেজনা দেখা দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার সকালে স্বতন্ত্র (আনারস) প্রার্থীর সমর্থক ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগ সহ-সভাপতি জনি তালুকদারকে প্রতিপক্ষ কুপিয়ে ফেলে রাখে। পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থল হতে আহত ওই স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকে উদ্ধার করে প্রথমে মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে দুপুরে তাকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নেওয়ার পথে দুপুর ১টার দিকে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
এ ঘটনায় নিহত জনির চাচা হলতা গুলিসাখালী ইউনিয়র যুবলীগের সভাপতি স্বপন তালুকদার বাদি হয়ে মঙ্গলবার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ইউপি সদস্য নৌকা সমর্থক জুনায়েদুর রহমান জুয়েলকে প্রধান আসামী করে উপজেলা আ.লীগ সভাপতি ও পৌর মেয়র রফিউদ্দিন ফেরদৌস, ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রিপন, ইউপি চেয়ারম্যান নাসির হোসেন হাওলাদার, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী শাকিল আহম্মেদ নওরোজসহ নৌকা সমর্থক নামীয় ৩৫জনকে আসামী করা হয়েছে।
মঠবাড়িয়া থানার অফিসার ইনচার্জ এমআর শওকত আনোয়ার ইসলাম মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, অজ্ঞাত আরও ২০-৩০ জনকে আসামি করে মামলাটি করা হয়েছে। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর ও হানিফ নামের দুইজনকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে তিন দিনের রিমান্ড আবেদন চাওয়া হলে বুধবার আদালত রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেছেন। এদিকে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জনি হত্যাকান্ডের পর নির্র্বাচন সুষ্ঠু ও নির্বাচনী সহিংসতা ঠেকাতে মঠবাড়িয়ায় মঙ্গলবার ৫ প্লাটুন বিজিবি, র্যাব ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।




