ছাত্রীরাই ব্যবধান গড়ে দিলেন
নিউজ ডেস্ক।। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচনে ব্যবধান গড়ে দিয়েছে পাঁচটি ছাত্রীহলের ভোট। যদিও ডাকসুতে পূর্ণাঙ্গ প্যানেলের মধ্যে শুধু ভিপি ও একটি সম্পাদকীয় পদ ছাড়া সব পদেই জয়লাভ করেছে ছাত্রলীগ। কিন্তু ছাত্রী হলগুলোর মধ্যে রোকেয়া হল ছাড়া অন্য সব হলে জয়লাভ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমর্থক বলে পরিচিত। এর বাইরে তিনটি ছাত্র হলেও ভিপি ও জিএস পদে জয়লাভ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। অতীতে, ডাকসু নির্বাচনে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে প্রতিযোগিতা হলেও এবারই প্রথম ছাত্রলীগের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের।
এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯.০৫ শতাংশ। প্রায় ৪৪ হাজার ভোটারের মধ্যে ২৫ হাজার ৭৫০ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি পদের মধ্যে ২৩টি পদেই বড় জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। শুধু ভিপি পদে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর এবং সমাজসেবা সম্পাদক পদে একই সংগঠনের আকতার হোসেন জয়লাভ করেছেন।
এক সময়ের প্রতাপশালী ছাত্র সংগঠন এবং ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেউই এবার জয়ের দেখা পাননি। শুধু কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ছাত্রদলের প্রার্থী কানেতা ইয়া লাম-লাম শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছেন ছাত্রলীগের লিপি আক্তারের সঙ্গে। ডাকসুতে এক সময় আধিপত্য বিস্তারকারী বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেউই কেন্দ্রীয় সংসদে কোনো পদে জয় পাননি। দুটি হল সংসদে তাদের তিনজন প্রার্থী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এর বাইরে এক সময় ডাকসুতে প্রতিনিধিত্ব করা জাসদ ছাত্রলীগও গড়ে তুলতে পারেনি ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
মূলত এবার চমক দেখিয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীরা’। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে অনেকেই বিবেচনা করছেন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে অরাজনৈতিক সংগঠনের লড়াই হিসেবে। ফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ডাকসুর ভিপি পদে ১১ হাজার ৬২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফরম সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থী নূরুল হক নূর। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন পেয়েছেন ৯ হাজার ১২৯ ভোট আর বাম জোটের লিটন নন্দী পেয়েছেন ১ হাজার ২১৬ ভোট। জিএস পদে ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী ১০ হাজার ৪৮৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কোটা সংস্কার আন্দোলনের রাশেদ খান পেয়েছেন ৬ হাজার ০৬৩ ভোট; স্বতন্ত্র প্রার্থী এআরএম আসিফুর রহমান পেয়েছেন ৪ হাজার ৬২৮ ভোট।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জিএস পদে একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী থাকায় ছাত্রলীগবিরোধী ভোটারদের ভোট ভাগাভাগি হয়ে যায়। ফলে বাড়তি সুবিধা পান ছাত্রলীগের জিএস প্রার্থী গোলাম রাব্বানী। ভিপি ও জিএস পদে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রার্থীদের কেউই ৫শ-এর বেশি ভোট টানতে পারেননি। এজিএস পদে জয়ী হয়েছেন সাদ্দাম হোসেন, পেয়েছেন ১৫ হাজার ৩০১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ফারুক হোসেন পেয়েছেন ৫ হাজার ৮৯৬ ভোট। আর সম্পাদকীয় পদগুলোর মধ্যে সমাজসেবা সম্পাদক পদে জয়ী হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের আকতার হোসেন। এর বাইরে কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ৮ হাজার ৫২৪ ভোট পেয়ে ছাত্রলীগের বিএম লিপি আক্তার জয়ী হয়েছেন। এ পদে ৭ হাজার ১১৯ ভোট পেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন ছাত্রদলের প্রার্থী কানেতা ইয়া লাম-লাম।
এর বাইরে সদস্য পদে নির্বাচিত সবাই ছাত্রলীগ প্যানেলের। এদিকে ১৮টি হল সংসদের মধ্যে ভিপি পদে ১২টিতে, জিএস পদে ১৪টি জয় পেয়েছে ছাত্রলীগ। অন্যদিকে ভিপি পদে ৬টিতে, জিএস পদে ৪টিতে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। আর ৫টি ছাত্রীহলের মধ্যে একমাত্র রোকেয়া হলে ভিপি-জিএসসহ অধিকাংশ পদে জয় পেয়েছে ছাত্রলীগ, অন্য হলগুলোয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভালো ফল করেছেন। এর বাইরে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ভিপি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী রিকি হায়দার আশা জয়লাভ করেছেন। আর জিএস ও এজিএস পদে জয় পেয়েছে ছাত্রলীগ। এর বাইরে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ভিপি পদে সুস্মিতা দে এবং জিএস পদে সাগুফ্তা বুশরা মিশমাসহ অধিকাংশ পদেই জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। শামসুন্নাহার হলেও ভিপি পদে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি ও জিএস পদে আফসানা ছপাসহ পূর্ণ প্যানেলে জয়লাভ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
কবি সুফিয়া কামাল হলে ভিপি পদে তানজিলা আক্তার সোমা এবং জিএস পদে মনিরা শারমিনসহ বেশিরভাগ পদে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। মূলত ভিপি পদে ছাত্রলীগ প্যানেলের প্রার্থীদের হারেও মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে ছাত্রীহলের ভোটাররা। অন্যদিকে ছাত্রহলের মধ্যে ৩টিতে ভিপি ও জিএস পদে হেরেছে ছাত্রলীগ। প্রার্থী বাছাইয়ে অপরিপক্বতাই এর কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ভিপি পদে সাইফুল্লাহ আব্বাসি অনন্ত জয়লাভ করেছেন। যদিও এ হলে ছাত্রলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সোলায়মান মুন্না নির্বাচনের আগের দিন জানান নির্বাচন না করার কথা।
এ হলে এজিএস পদে জয়লাভ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তৌফিকুল ইসলাম। এ হলে ছাত্রলীগ প্যানেলের প্রার্থী ছিলেন রিফাত উদ্দিন। অমর একুশে হলে ভিপি পদে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মেহেদী হাসান সুমন। ফজলুল হক মুসলিম হলে ভিপি পদে নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদুল হাসান তমাল। মূলত ছাত্রহলভিত্তিক ভোটের রাজনীতিতে আঞ্চলিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে জহুরুল হক হল ও অমর একুশে হলে মাদারীপুর জেলার দুই প্রার্থী ছিলেন ছাত্রলীগ প্যানেলের। দুজনই হেরে গেছেন। এ দুই হলে জয় পেয়েছেন ময়মনসিংহ ও বরিশাল অঞ্চলের প্রার্থীরা। এসব হলের শিক্ষার্থীর মধ্যে বেশিরভাগই এ দুই অঞ্চলের, মাদারীপুরের শিক্ষার্থীর সংখ্যা হাতেগোনা।




