276041

বাদশাহর স্বপ্ন ও কারাগার থেকে ইউসুফ (আঃ) এর ব্যাখ্যা দান

কারাগারের জীবন : বালাখানা থেকে জেলখানায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর এক করুণ অভিজ্ঞতা শুরু হ’ল ইউসুফের জীবনে। মনোকষ্ট ও দৈহিক কষ্ট, সাথে সাথে স্নেহান্ধ ফুফু ও সন্তানহারা পাগলপরা বৃদ্ধ পিতাকে কেন‘আনে ফেলে আসার মানসিক কষ্ট সব মিলিয়ে ইউসুফের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। কেন‘আনে ভাইয়েরা শত্রু, মিসরে যুলায়খা শত্রু। নিরাপদ আশ্রয় কোথাও নেই। অতএব জেলখানাকেই আপাতত: জীবনসাথী করে নিলেন এবং নিজেকে আল্লাহর আশ্রয়ে সমর্পণ করে কয়েদী সাথীদের মধ্যে দ্বীনের দাওয়াতে মনোনিবেশ করলেন। ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে যে, ইউসুফকে আল্লাহ স্বপ্ন ব্যাখ্যা দানের বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলেন (ইউসুফ ১২/৬)। দ্বীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও তাঁর জন্য সহায়ক প্রমাণিত হয়।

জেলখানার সাথীদের নিকটে ইউসুফের দাওয়াত : ইউসুফ কারাগারে পৌঁছলে সাথে আরও দু’জন অভিযুক্ত যুবক কারাগারে প্রবেশ করে। তাদের একজন বাদশাহকে মদ্য পান করাতো এবং অপরজন বাদশাহর বাবুর্চি ছিল। ইবনু কাছীর তাফসীরবিদগণের বরাত দিয়ে লেখেন যে, তারা উভয়েই বাদশাহর খাদ্যে বিষ মিশানোর দায়ে অভিযুক্ত হয়ে জেলে আসে। তখনও মামলার তদন্ত চলছিল এবং চূড়ান্ত রায় বাকী ছিল। তারা জেলে এসে ইউসুফের সততা, বিশ্বস্ততা, ইবাদতগুযারী ও স্বপ্ন ব্যাখ্যা দানের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারে। তখন তারা তাঁর নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হয় এবং তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধুতে পরিণত হয়।

বন্ধুত্বের এই সুযোগকে ইউসুফ তাওহীদের দাওয়াতে কাজে লাগান। তাতে প্রতীতি জন্মে যে, সম্ভবতঃ কারাগারেই ই্উসুফকে ‘নবুঅত’ দান করা হয়। ইউসুফের কারা সঙ্গীদ্বয় এবং তাদের নিকটে প্রদত্ত দাওয়াতের বিবরণ আল্লাহ দিয়েছেন নিম্নোক্তভাবে:

وَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَيَانَ قَالَ أَحَدُهُمَا إِنِّي أَرَانِي أَعْصِرُ خَمْراً وَقَالَ الآخَرُ إِنِّي أَرَانِي أَحْمِلُ فَوْقَ رَأْسِيْ خُبْزاً تَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْهُ نَبِّئْنَا بِتَأْوْيلِهِ إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِيْنَ- قَالَ لاَ يَأْتِيكُمَا طَعَامٌ تُرْزَقَانِهِ إِلاَّ نَبَّأْتُكُمَا بِتَأْوِيلِهِ قَبْلَ أَن يَأْتِيكُمَا ذَلِكُمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي إِنِّي تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لاَّ يُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَهُم بِالآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ- وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَآئِـي إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ مَا كَانَ لَنَا أَن نُّشْرِكَ بِاللهِ مِن شَيْءٍ ذَلِكَ مِن فَضْلِ اللهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلَـكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لاَ يَشْكُرُونَ- (يوسف ৩৬-৩৮)-
‘ইউসুফের সাথে কারাগারে দু’জন যুবক প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি মদ নিঙড়াচ্ছি। অপরজন বলল, আমি দেখলাম যে, আমি মাথায় করে রুটি বহন করছি। আর তা থেকে পাখি খেয়ে নিচ্ছে। আমাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিন। কেননা আমরা আপনাকে সৎকর্মশীলগণের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাচ্ছি’ (৩৬)। ‘ইউসুফ বলল, তোমাদেরকে প্রত্যহ যে খাদ্য দান করা হয়, তা তোমাদের কাছে আসার আগেই আমি তার ব্যাখ্যা বলে দিতে পারি। এ জ্ঞান আমার পালনকর্তা আমাকে দান করেছেন। আমি ঐসব লোকদের ধর্ম ত্যাগ করেছি, যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস পোষণ করে না এবং আখেরাতকে অস্বীকার করে’(৩৭)। ‘আমি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক্ব ও ইয়াকূবের ধর্ম অনুসরণ করি। আমাদের জন্য শোভা পায় না যে, কোন বস্ত্তকে আল্লাহর অংশীদার করি। এটা আমাদের প্রতি এবং অন্য সব লোকদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না’ (ইউসুফ ১২/৩৬-৩৮)। অতঃপর তিনি সাথীদের প্রতি তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে বলেন,

يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُوْنَ خَيْرٌ أَمِ اللهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ- مَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِهِ إِلاَّ أَسْمَاءٌ سَمَّيْتُمُوْهَا أَنتُمْ وَآبَآؤُكُمْ مَّا أَنزَلَ الله ُبِهَا مِنْ سُلْطَانٍ، إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ ِللهِ أَمَرَ أَلاَّ تَعْبُدُواْ إِلاَّ إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّيْنُ الْقَيِّمُ وَلَـكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لاَ يَعْلَمُوْنَ- (يوسف ৩৯-৪০)-
‘হে কারাগারের সাথীদ্বয়! পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ’? ‘তোমরা আল্লাহ্কে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের পূজা করে থাক। যেগুলো তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা সাব্যস্ত করে নিয়েছ। এদের পক্ষে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। আল্লাহ ব্যতীত কারু বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে ব্যতীত তোমরা অন্য কারু ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না’ (ইউসুফ ১২/৩৯-৪০)। এভাবে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার পর তিনি স্বীয় কারা সাথীদ্বয়ের প্রশ্নের জওয়াব দিতে শুরু করলেন।-

يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَمَّا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبَّهُ خَمْراً وَأَمَّا الآخَرُ فَيُصْلَبُ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِن رَّأْسِهِ قُضِيَ الأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ- وَقَالَ لِلَّذِي ظَنَّ أَنَّهُ نَاجٍ مِّنْهُمَا اذْكُرْنِي عِندَ رَبِّكَ فَأَنسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِينَ- (يوسف ৪১-৪২)-
‘হে কারাগারের সাথীদ্বয়! তোমাদের একজন তার মনিবকে মদ্যপান করাবে এবং দ্বিতীয়জন, তাকে শূলে চড়ানো হবে। অতঃপর তার মস্তক থেকে পাখি (ঘিলু) খেয়ে নিবে। তোমরা যে বিষয়ে জানতে আগ্রহী, তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে’। ‘অতঃপর যে ব্যক্তি সম্পর্কে (স্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী) ধারণা ছিল যে, সে মুক্তি পাবে, তাকে ইউসুফ বলে দিল যে, তুমি তোমার মনিবের কাছে (অর্থাৎ বাদশাহর কাছে) আমার বিষয়ে আলোচনা করবে (যাতে আমাকে মুক্তি দেয়)। কিন্তু শয়তান তাকে তার মনিবের কাছে বলার বিষয়টি ভুলিয়ে দেয়। ফলে তাকে কয়েক বছর কারাগারে থাকতে হ’ল’ (ইউসুফ ১২/৪১-৪২)।

ইউসুফের দাওয়াতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ : (১) দাওয়াত দেওয়ার সময় নিজের পরিচয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা আবশ্যক। যাতে শ্রোতার মনে কোনরূপ দ্বৈত চিন্তা ঘর না করে। ইউসুফ তাঁর দাওয়াতের শুরুতেই বলে দিয়েছেন যে, আমি ঐসব লোকের ধর্ম পরিত্যাগ করেছি, যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস পোষণ করে না এবং আখেরাতে জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করে না’ (ইউসুফ ১২/৩৭)।

(২) দাওয়াত দেওয়ার সময় নিজের অভিজাত বংশের পরিচয় তুলে ধরা মোটেই অসমীচীন নয়। এতে শ্রোতার মনে দাওয়াতের প্রভাব দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ইউসুফ (আঃ) সেকারণ নিজের নবী বংশের পরিচয় শুরুতেই তুলে ধরেছেন’ (ইউসুফ ১২/৩৮)।

(৩) শ্রোতার সম্মুখে অনেক সময় নিজের কোন বাস্তব কৃতিত্ব তুলে ধরাও আবশ্যক হয়। যেমন ইউসুফ (আঃ) স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার আগে নিজের আরেকটি মু‘জেযার কথা বর্ণনা করেন যে, কয়েদীদের খানা আসার আগেই আমি তার প্রকার, গুণাগুণ, পরিমাণ ও আসার সঠিক সময় বলে দিতে পারি (ইউসুফ ১২/৩৭)।

(৪) নিজেকে কোনরূপ অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী কিংবা ভবিষ্যদ্বক্তা বলে পেশ করা যাবে না। সেকারণ ইউসুফ সাথে সাথে বলে দিয়েছিলেন যে, ‘এ জ্ঞান আমার পালনকর্তা আমাকে দান করেছেন’ (ইউসুফ ১২/৩৭)।

(৫) প্রশ্নের জওয়াব দানের পূর্বে প্রশ্নকারীর মন-মানসিকতাকে আল্লাহমুখী করে নেওয়া আবশ্যক। সেকারণ ইউসুফ তাঁর মুশরিক কারাসঙ্গীদের জওয়াব দানের পূর্বে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন (১২/৩৯)।

(৬) প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শ্রোতার মস্তিষ্ক যাচাই করে দাওয়াত দেওয়া একটি উত্তম পদ্ধতি। সেজন্য ইউসুফ (আঃ) তাঁর কারা সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, না পরাক্রমশালী একক উপাস্য ভাল’? (ইউসুফ ১২/৩৯)।

(৭) শিরকের অসারতা হাতেনাতে ধরিয়ে দিয়ে মুশরিককে প্রথমেই লা-জওয়াব করে দেওয়া আবশ্যক। সেকারণ ইউসুফ (আঃ) বললেন, তোমরা আল্লাহ্কে ছেড়ে নিছক কিছু নামের পূজা কর মাত্র। এদের পূজা করার জন্য আল্লাহ কোন আদেশ প্রেরণ করেননি’ (ইউসুফ ১২/৪০)।

(৮) তাওহীদের মূল কথা সংক্ষেপে বা এক কথায় পেশ করা আবশ্যক, যাতে শ্রোতার মগয সহজে সেটা ধারণ করতে পারে। সেজন্য ইউসুফ (আঃ) সোজাসুজি এক কথায় বলে দিলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া কারু কোন বিধান নেই… এবং এটাই সরল পথ’ (ইউসুফ ১২/৪০)।

(৯) বিপদ হ’তে মুক্তি কামনা করা ও সেজন্য চেষ্টা করা আল্লাহর উপরে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। সেজন্য ইউসুফ (আঃ) কারাগার থেকে মুক্তি চেয়েছেন এবং নিরপরাধ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে যে কারাগারে দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে হচ্ছে, সে বিষয়টি বাদশাহর কাছে তুলে ধরার জন্য মুক্তিকামী কারা সাথীকে বলে দিলেন (ইউসুফ ১২/৪২)।

(১০) বান্দা চেষ্টা করার মালিক। কিন্তু অবশেষে তাক্বদীর জয়লাভ করে। সেকারণ ইউসুফের মুক্তিপ্রাপ্ত কয়েদী বন্ধু বাদশাহর কাছে তার কথা বলতে ভুলে গেল এবং কয়েক বছর তাকে কয়েদখানায় থাকতে হ’ল। কুরআনে بضع سنين শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে (ইউসুফ ১২/৪২)। যা দ্বারা তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যা বুঝানো হয়। অধিকাংশ তাফসীরবিদগণ তাঁর কারাজীবনের মেয়াদ সাত বছর বলেছেন। এভাবে অবশেষে তাক্বদীর বিজয়ী হ’ল। কারণ আল্লাহর মঙ্গল ইচ্ছা বান্দা বুঝতে পারেনা।

বাদশাহর স্বপ্ন ও কারাগার থেকে ইউসুফের ব্যাখ্যা দান : মিসরের বাদশাহ একটি স্বপ্ন দেখলেন এবং এটিই ছিল আল্লাহর পক্ষ হ’তে ইউসুফের কারামুক্তির অসীলা। অতঃপর বাদশাহ তার সভাসদগণকে ডেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু কেউ জবাব দিতে পারল না। অবশেষে তারা বাদশাহকে সান্ত্বনা দেবার জন্য বলল, এগুলি ‘কল্পনা প্রসূত স্বপ্ন’ (أضغاث أحلام ) মাত্র। এগুলির কোন বাস্তবতা নেই। কিন্তু বাদশাহ তাতে স্বস্তি পান না। এমন সময় কারামুক্ত সেই খাদেম বাদশাহর কাছে তার কারাসঙ্গী ও বন্ধু ইউসুফের কথা বলল। তখন বাদশাহ ইউসুফের কাছে স্বপ্ন ব্যাখ্যা জানার জন্য উক্ত খাদেমকে কারাগারে পাঠালেন। সে স্বপ্নব্যাখ্যা শুনে এসে বাদশাহকে সব বৃত্তান্ত বলল। উক্ত বিষয়ে কুরআনী বর্ণনা নিম্নরূপ:

وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَى سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنْبُلاَتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ، يَا أَيُّهَا الْمَلأُ أَفْتُوْنِيْ فِي رُؤْيَايَ إِنْ كُنتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُونَ- قَالُوا أَضْغَاثُ أَحْلاَمٍ وَمَا نَحْنُ بِتَأْوِيلِ الأَحْلاَمِ بِعَالِمِيْنَ- (يوسف ৪৩-৪৪)-
‘বাদশাহ বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটা-তাজা গাভী, এদেরকে সাতটি শীর্ণ গাভী খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি সবুজ শিষ ও অন্যগুলো শুষ্ক। হে সভাসদবর্গ! তোমরা আমাকে আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দাও, যদি তোমরা স্বপ্ন ব্যাখ্যায় পারদর্শী হয়ে থাক’। ‘তারা বলল, এটি কল্পনা প্রসূত স্বপ্ন মাত্র। এরূপ স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই’ (ইউসুফ ১২/৪৩-৪৪)।

‘তখন দু’জন কারাবন্দীর মধ্যে যে ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছিল, দীর্ঘকাল পরে তার (ইউসুফের কথা) স্মরণ হ’ল এবং বলল, আমি আপনাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দেব, আপনারা আমাকে (জেলখানায়) পাঠিয়ে দিন’। ‘অতঃপর সে জেলখানায় পৌঁছে বলল, ইউসুফ হে আমার সত্যবাদী বন্ধু! (বাদশাহ স্বপ্ন দেখেছেন যে,) সাতটি মোটাতাজা গাভী, তাদেরকে খেয়ে ফেলছে সাতটি শীর্ণ গাভী এবং সাতটি সবুজ শিষ ও অন্যগুলি শুষ্ক। আপনি আমাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিন, যাতে আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তা জানাতে পারি’ (ইউসুফ ১২/৪৫-৪৬)। জবাবে ইউসুফ বলল,

قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِيْنَ دَأَباً فَمَا حَصَدتُّمْ فَذَرُوهُ فِي سُنْبُلِهِ إِلاَّ قَلِيلاً مِّمَّا تَأْكُلُونَ- ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلاَّ قَلِيلاً مِّمَّا تُحْصِنُونَ- ثُمَّ يَأْتِيْ مِن بَعْدِ ذَلِكَ عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ- (يوسف ৪৭-৪৯)-
‘তোমরা সাত বছর উত্তমরূপে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যখন ফসল কাটবে, তখন খোরাকি বাদে বাকী ফসল শিষ সমেত রেখে দিবে’ (৪৭)। ‘এরপর আসবে দুর্ভিক্ষের সাত বছর। তখন তোমরা খাবে ইতিপূর্বে যা রেখে দিয়েছিলে, তবে কিছু পরিমাণ ব্যতীত যা তোমরা (বীজ বা সঞ্চয় হিসাবে) তুলে রাখবে’ (৪৮)। ‘এরপরে আসবে এক বছর, যাতে লোকদের উপরে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং তখন তারা (আঙ্গুরের) রস নিঙড়াবে (অর্থাৎ উদ্বৃত্ত ফসল হবে)’ (ইউসুফ ১২/৪৭-৪৯)। ঐ খাদেমটি ফিরে এসে স্বপ্ন ব্যাখ্যা বর্ণনা করলে বাদশাহ তাকে বললেন,

وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِيْ بِهِ فَلَمَّا جَاءَهُ الرَّسُولُ قَالَ ارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ اللاَّتِي قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ- (يوسف৫০)-
‘তুমি পুনরায় কারাগারে ফিরে যাও এবং তাকে (অর্থাৎ ইউসুফকে) আমার কাছে নিয়ে এস। অতঃপর যখন বাদশাহর দূত তার কাছে পৌঁছলো, তখন ইউসুফ তাকে বলল, তুমি তোমার মনিবের (অর্থাৎ বাদশাহর) কাছে ফিরে যাও এবং তাঁকে জিজ্ঞেস কর যে, নগরীর সেই মহিলাদের খবর কি? যারা নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিল। আমার পালনকর্তা তো তাদের ছলনা সবই জানেন’ (ইউসুফ ১২/৫০)।

বাদশাহর দূতকে ফেরৎ দানের শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ : (১) দীর্ঘ কারাভোগের দুঃসহ যন্ত্রণায় অতিষ্ট হয়ে ইউসুফ (আঃ) নিশ্চয়ই মুক্তির জন্য উন্মুখ ছিলেন। কিন্তু বাদশাহর পক্ষ থেকে মুক্তির নির্দেশ পাওয়া সত্ত্বেও তিনি দূতকে ফেরত দিলেন। এর কারণ এই যে, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ কারামুক্তির চাইতে তার উপরে আপতিত অপবাদ মুক্তিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ইউসুফ (আঃ) সেকারণেই ঘটনার মূলে যারা ছিল, তাদের অবস্থা জানতে চেয়েছিলেন।

(২) তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, জেল থেকে বের হওয়ার আগেই বাদশাহ বা গৃহস্বামী ‘আযীযে মিছর’ তাঁর ব্যাপারে সন্দেহ মুক্ত কি-না সেটা জেনে নেওয়া এবং ঐ মহিলাদের মুখ দিয়ে তার নির্দোষিতার বিষয়টি প্রকাশিত হওয়া।

(৩) ইউসুফ তার বক্তব্যে ‘মহিলাদের’ কথা বলেছেন। আযীয-পত্নী যুলায়খার কথা নির্দিষ্টভাবে বলেননি। অথচ সেই-ই ছিল ঘটনার মূল। এটার কারণ ছিল এই যে, (ক) ঐ মহিলাগণ সবাই যুলায়খার কু-প্রস্তাবের সমর্থক হওয়ায় তারা সবাই একই পর্যায়ে চলে এসেছিল (খ) তাছাড়া আরেকটি কারণ ছিল- সৌজন্যবোধ। কেননা নির্দিষ্টভাবে তার নাম নিলে আযীযের মর্যাদায় আঘাত আসত। এতদ্ব্যতীত আযীয ছিলেন ইউসুফের আশ্রয়দাতা ও লালন-পালনকারী। তার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধের আধিক্য ইউসুফকে আযীয-পত্নীর নাম নিতে দ্বিধান্বিত করেছে। ইউসুফ (আঃ)-এর এবম্বিধ উন্নত আচরণের মধ্যে যেকোন মর্যাদাবান ব্যক্তির জন্য শিক্ষণীয় বিষয় লুকিয়ে রয়েছে।

(৪) ইউসুফ চেয়েছিলেন এ সত্য প্রমাণ করে দিতে যে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে মন্দপ্রবণতা থাকলেও তা নেককার মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের কারণে। যদি আমি সেই অনুগ্রহ না পেতাম, তাহ’লে হয়ত আমিও পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম। অতএব আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর অনুগ্রহ লাভে সদা সচেষ্ট থাকাই বান্দার সর্বাপেক্ষা বড় কর্তব্য। বস্ত্ততঃ এইরূপ পবিত্র হৃদয়কে কুরআনে ‘নফসে মুত্বমাইন্নাহ’ বা প্রশান্ত হৃদয় বলা হয়েছে (ফাজর ৮৯/২৭)। যা অর্জন করার জন্য সকলকেই সচেষ্ট হওয়া উচিত। নবীগণ সবাই ছিলেন উক্ত প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে ইউসুফ (আঃ)ও অনুরূপ পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন বাদশাহও তাঁর পবিত্রতা সম্পর্কে নিশ্চিত হৌন।

(৫) পবিত্রতার অহংকারঃ বাদশাহর দূতকে ফিরিয়ে দেবার মধ্যে ইউসুফের হৃদয়ে পবিত্রতার যে অহংকার জন্মেছিল, তা প্রত্যেক নির্দোষ মানুষের মধ্যে থাকা উচিত। ইউসুফের এই সাহসী আচরণে অভিভূত হয়ে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) বলেন,

إنَّ الكريمَ ابنَ الكريمِ ابنِ الكريمِ بنِ الكريمِ: يوسفُ بنُ يعقوبَ بنِ اسحاقَ بنِ إبراهيمَ، وَلَو لبِثْتُ فى السجن مالبثَ ثم جاءنى الرسولُ لأَجَبْتُ ثم قرأ (فَلَمَّا جَاءَهُ الرَّسُوْلُ قَالَ ارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ اللاَّتِي قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ) ، رواه الترمذى بسند حسن-
‘নিশ্চয়ই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির পুত্র সম্ভ্রান্ত, তার পুত্র সম্ভ্রান্ত, তার পুত্র সম্ভ্রান্ত- (তাঁরা হ’লেন) ইবরাহীমের পুত্র ইসহাক্ব, তাঁর পুত্র ইয়াকূব ও তাঁর পুত্র ইউসুফ। যদি আমি অতদিন কারাগারে থাকতাম, যতদিন তিনি ছিলেন, তাহ’লে বাদশাহর দূত প্রথমবার আসার সাথে সাথে আমি তার প্রস্তাব কবুল করতাম’। এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সূরা ইউসুফ ৫০ আয়াতটি পাঠ করেন’।[22]

বাদশাহর দরবারে ইউসুফ (আঃ) : কারাগার থেকে পাঠানো ইউসুফের দাবী অনুযায়ী মহিলাদের কাছে বাদশাহ ঘটনার তদন্ত করলেন। আল্লাহ বলেন, বাদশাহ মহিলাদের ডেকে বলল, قَالَ مَا خَطْبُكُنَّ إِذْ رَاوَدتُّنَّ يُوْسُفَ عَن نَّفْسِهِ ‘তোমাদের খবর কি যখন তোমরা ইউসুফকে কুকর্মে ফুসলিয়েছিলে? তারা বলল, حَاشَ ِللهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوْءٍ ‘আল্লাহ পবিত্র। আমরা তাঁর (ইউসুফ) সম্পর্কে মন্দ কিছুই জানি না’। আযীয-পত্নী বলল, الآنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَاوَدتُّهُ عَنْ نَّفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ ‘এখন সত্য প্রকাশিত হ’ল। আমিই তাকে ফুসলিয়েছিলাম এবং সে ছিল সত্যবাদী’ (ইউসুফ ১২/৫১)। ইতিপূর্বে একবার শহরের মহিলাদের সম্মুখে যুলায়খা উক্ত স্বীকৃতি দিয়ে বলেছিল, لَقَدْ رَاوَدتُّهُ عَن نَّفْسِهِ فَاسَتَعْصَمَ ‘আমি তাকে ফুসলিয়েছিলাম। কিন্তু সে নিজেকে সংযত রেখেছিল’ (ইউসুফ ১২/৩২)।

অতঃপর আযীয-পত্নী বলল, ذَلِكَ لِيَعْلَمَ أَنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ وَأَنَّ اللهَ لاَ يَهْدِي كَيْدَ الْخَائِنِيْنَ ‘এটা (অর্থাৎ এই স্বীকৃতিটা) এজন্যে যেন গৃহস্বামী জানতে পারেন যে, তার অগোচরে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। বস্ত্ততঃ আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না’ (৫২)। ‘আর আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না। নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দপ্রবণ। কেবল ঐ ব্যক্তি ছাড়া যার প্রতি আমার প্রভু দয়া করেন। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (৫৩)।

এভাবে আযীয-পত্নী ও নগরীর মহিলারা যখন বাস্তব ঘটনা স্বীকার করল, তখন বাদশাহ নির্দেশ দিলেন, ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এস। কুরআনের ভাষায়- وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُوْنِيْ بِهِ أَسْتَخْلِصْهُ لِنَفْسِيْ فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مِكِيْنٌ أَمِيْنٌ- (يوسف ৫৪)-

‘বাদশাহ বলল, তাকে তোমরা আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে আমার নিজের জন্য একান্ত সহচর করে নেব। অতঃপর যখন বাদশাহ ইউসুফের সাথে মতবিনিময় করলেন, তখন তিনি তাকে বললেন, নিশ্চয়ই আপনি আজ থেকে আমাদের নিকট বিশ্বস্ত ও মর্যাদাপূর্ণ স্থানের অধিকারী’ (ইউসুফ ১২/৫৪)।

ইউসুফের অর্থমন্ত্রীর পদ লাভ এবং সাথে সাথে বাদশাহীর ক্ষমতা লাভ : কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এসে বাদশাহর সাথে কথোপকথনের এক পর্যায়ে বাদশাহ যখন দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় দক্ষ ও বিশ্বস্ত লোক কোথায় পাবেন বলে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করছিলেন, তখন ইউসুফ (আঃ) নিজেকে এজন্য পেশ করেন। যেমন আল্লাহর ভাষায়-

قَالَ اجْعَلْنِيْ عَلَى خَزَآئِنِ الأَرْضِ إِنِّيْ حَفِيْظٌ عَلِيْمٌ- (يوسف ৫৫)-
‘ইউসুফ বলল, আপনি আমাকে দেশের ধন-ভান্ডারের দায়িত্বে নিয়োজিত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও (এ বিষয়ে) বিজ্ঞ’ (ইউসুফ ১২/৫৫)।

তাঁর এই পদ প্রার্থনা ও নিজের যোগ্যতা নিজ মুখে প্রকাশ করার উদ্দেশ্য নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও অহংকার প্রকাশের জন্য ছিল না। বরং কুফরী হুকূমতের অবিশ্বস্ত ও অনভিজ্ঞ মন্ত্রী ও আমলাদের হাত থেকে আসন্ন দুর্ভিক্ষ পীড়িত সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য ও তাদের প্রতি দয়ার্দ্র চিত্ততার কারণে ছিল। ইবনু কাছীর বলেন, এর মধ্যে নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়ার দলীল রয়েছে ঐ ব্যক্তির জন্য, যিনি কোন বিষয়ে নিজেকে আমানতদার ও যোগ্য বলে নিশ্চিতভাবে মনে করেন’।[23] কুরতুবী বলেন, যখন কেউ নিশ্চিতভাবে মনে করবেন যে, এ ব্যাপারে তিনি ব্যতীত যোগ্য আর কেউ নেই, তখন তাকে ঐ পদ বা দায়িত্ব চেয়ে নেওয়া ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে যদি অন্য কেউ যোগ্য থাকে, তবে চেয়ে নেওয়া যাবে না। মিসরে ঐ সময় ইউসুফের চাইতে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় যোগ্য ও আমানতদার কেউ ছিল না বিধায় ইউসুফ উক্ত দায়িত্ব চেয়ে নিয়ে ছিলেন’।[24] আত্মস্বার্থ হাছিল বা পাপকাজে সাহায্য করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।

আহলে কিতাবগণের বর্ণনা মতে এই সময় বাদশাহ তাঁকে কেবল খাদ্য মন্ত্রণালয় নয়, বরং পুরা মিসরের শাসন ক্ষমতা অর্পণ করেন এবং বলেন, আমি আপনার চাইতে বড় নই, কেবল সিংহাসন ব্যতীত’। ইবনু ইসহাকের বর্ণনা মতে এ সময় বাদশাহ তাঁর হাতে মুসলমান হন। একথাও বলা হয়েছে যে, এই সময় ‘আযীযে মিছর’ ক্বিৎফীর মারা যান। ফলে ইউসুফকে উক্ত পদে বসানো হয় এবং তার বিধবা স্ত্রী যুলায়খাকে বাদশাহ ইউসুফের সাথে বিবাহ দেন।[25] জ্ঞান ও যুক্তি একথা মেনে নিলেও কুরআন এ বিষয়ে কিছু বলেনি। যেমন রাণী বিলক্বীসের মুসলমান হওয়া সম্পর্কে কুরআন স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে (নমল ২৭/৪৪)। যেহেতু কুরআন ও হাদীছ এ বিষয়ে কিছু বলেনি, অতএব আমাদের চুপ থাকা উত্তম। আর আহলে কিতাবগণের বর্ণনা বিষয়ে রাসূলের দেওয়া মূলনীতি অনুসরণ করা উচিত যে, তাওরাত ও ইনজীল বিষয়ে আমরা তাদের কথা সত্যও বলব না, মিথ্যাও বলব না বরং আমাদের নিকটে শেষনবীর মাধ্যমে যে বিধান এসেছে, কেবল তারই অনুসরণ করব।।[26]

নবী হিসাবে সুলায়মান (আঃ)-এর যেমন উদ্দেশ্য ছিল বিলক্বীসের মুসলমান হওয়া ও তার রাজ্য থেকে শিরক উৎখাত হওয়া। অনুরূপভাবে নবী হিসাবে ইউসুফ (আঃ)-এরও উদ্দেশ্য থাকতে পারে বাদশাহর মুসলমান হওয়া এবং মিসর থেকে শিরক উৎখাত হওয়া ও সর্বত্র আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়া। বাদশাহ যখন তার ভক্ত ও অনুরক্ত ছিলেন এবং নিজের বাদশাহী তাকে সোপর্দ করেছিলেন, তখন ধরে নেওয়া যায় যে, তিনি শিরকী ধ্যান-ধারণা পরিত্যাগ করে তাওহীদের অনুসারী হয়েছিলেন এবং ইউসুফকে নবী হিসাবে স্বীকার করে তাঁর শরী‘আতের অনুসারী হয়ে বাকী জীবন কাটিয়েছিলেন। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।

এভাবে আল্লাহর ইচ্ছায় ইউসুফ (আঃ) মিসরের সর্বোচ্চ পদে সসম্মানে বরিত হ’লেন এবং অন্ধকূপে হারিয়ে যাওয়া ইউসুফ পুনরায় দীপ্ত সূর্যের ন্যায় পৃথিবীতে বিকশিত হয়ে উঠলেন। আল্লাহ বলেন,

وَكَذَلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الأَرْضِ يَتَبَوَّأُ مِنْهَا حَيْثُ يَشَآءُ نُصِيْبُ بِرَحْمَتِنَا مَنْ نَشَآءُ وَلاَ نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِيْنَ- (يوسف ৫৬)-
‘এমনিভাবে আমরা ইউসুফকে সেদেশে প্রতিষ্ঠা দান করি। সে তথায় যেখানে ইচ্ছা স্থান করে নিতে পারত। আমরা আমাদের রহমত যাকে ইচ্ছা তাকে পৌঁছে দিয়ে থাকি এবং আমরা সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করি না’ (ইউসুফ ১২/৫৬)। উপরোক্ত আয়াতে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে ইউসুফের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার এবং মিসরের সর্বত্র বিধান জারি করার। ইবনু কাছীর বলেন, এই সময় তিনি দ্বীনী ও দুনিয়াবী উভয় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন’।

[23]. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৯৬। [24]. তাফসীরে কুরতুবী, ইউসুফ ৫৫। [25]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৯৬-১৯৭। [26]. বুখারী, মিশকাত হা/১৫৫ ‘কিতাব ও সুন্নাহকে অাঁকড়ে ধরা’ অনুচ্ছেদ; মির‘আত ১/২৫২। [27]. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৯৭।

ইউসুফের দক্ষ শাসন ও দুর্ভিক্ষ মুকাবিলায় অপূর্ব ব্যবস্থাপনা : সুদ্দী, ইবনু ইসহাক্ব, ইবনু কাছীর প্রমুখ বিদ্বানগণ ইসরাঈলী রেওয়ায়াত সমূহের ভিত্তিতে যে বিবরণ দিয়েছেন, তার সারকথা এই যে, ইউসুফ (আঃ)-এর হাতে মিসরের শাসনভার অর্পিত হওয়ার পর স্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রথম সাত বছর সমগ্র দেশে ব্যাপক ফসল উৎপন্ন হয়। ইউসুফ (আঃ)-এর নির্দেশক্রমে উদ্বৃত্ত ফসলের বৃহদাংশ সঞ্চিত রাখা হয়। এতে বুঝা যায় যে, আধুনিক কালের এলএসডি, সিএসডি খাদ্য গুদামের অভিযাত্রা বিগত দিনে ইউসুফ (আঃ)-এর মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল।

এরপর স্বপ্নের দ্বিতীয় অংশের বাস্তবতা শুরু হয় এবং দেশে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তিনি জানতেন যে, এ দুর্ভিক্ষ সাত বছর স্থায়ী হবে এবং আশপাশের রাজ্যসমূহে বিস্তৃত হবে। তাই সংরক্ষিত খাদ্যশস্য খুব সতর্কতার সাথে ব্যয় করা শুরু করলেন। তিনি ফ্রি বিতরণ না করে স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণের সিদ্ধান্ত নেন। সেই সাথে মাথাপ্রতি খাদ্য বিতরণের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করে দেন। তাঁর আগাম হুঁশিয়ারি মোতাবেক মিসরীয় জনগণের অধিকাংশের বাড়ীতে সঞ্চিত খাদ্যশস্য মওজূদ ছিল। ফলে পার্শ্ববর্তী দুর্ভিক্ষপীড়িত রাজ্যসমূহ থেকে দলে দলে লোকেরা মিসরে আসতে শুরু করে। ইউসুফ (আঃ) তাদের প্রত্যেককে বছরে এক উট বোঝাই খাদ্য-শস্য স্বল্প মূল্যের বিনিময়ে প্রদানের নির্দেশ দেন।[28] অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ার কারণে খাদ্য বিতরণের তদারকি ইউসুফ (আঃ) নিজেই করতেন। এতে ধরে নেওয়া যায় যে, খাদ্য-শস্যের সরকারী রেশনের প্রথা বিশ্বে প্রথম ইউসুফ (আঃ)-এর হাতেই শুরু হয়। [28]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ইউসুফ ৫৮-৬২।

ভাইদের মিসরে আগমন :মিসরের দুর্ভিক্ষ সে দেশের সীমানা পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দূর-দূরান্ত এলাকা সমূহে বিস্তৃত হয়। ইবরাহীম, ইসহাক্ব ও ইয়াকূবের আবাসভূমি কেন‘আনও দুর্ভিক্ষের করালগ্রাসে পতিত হয়। ফলে ইয়াকূবের পরিবারেও অনটন দেখা দেয়। এ সময় ইয়াকূব (আঃ)-এর কানে এ খবর পৌঁছে যায় যে, মিসরের নতুন বাদশাহ অত্যন্ত সৎ ও দয়ালু। তিনি স্বল্পমূল্যে এক উট পরিমাণ খাদ্যশস্য অভাবী ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করছেন। এ খবর শুনে তিনি পুত্রদের বললেন, তোমরাও মিসরে গিয়ে খাদ্যশস্য নিয়ে এসো। সেমতে দশ ভাই দশটি উট নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল। বৃদ্ধ পিতার খিদমত ও বাড়ী দেখাশুনার জন্য ছোট ভাই বেনিয়ামীন একাকী রয়ে গেল। কেন‘আন থেকে মিসরের রাজধানী প্রায় ২৫০ মাইলের ব্যবধান।

যথাসময়ে দশভাই কেন‘আন থেকে মিসরে উপস্থিত হ’ল। ইউসুফ (আঃ) তাদেরকে চিনে ফেললেন। কিন্তু তারা তাঁকে চিনতে পারেনি। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَجَاء إِخْوَةُ يُوْسُفَ فَدَخَلُوْا عَلَيْهِ فَعَرَفَهُمْ وَهُمْ لَهُ مُنْكِرُوْنَ- (يوسف ৫৮)-
‘ইউসুফের ভাইয়েরা আগমন করল এবং তার কাছে উপস্থিত হ’ল। ইউসুফ তাদেরকে চিনতে পারল। কিন্তু তারা তাকে চিনতে পারেনি’ (ইউসুফ ১২/৫৮)।

ইউসুফের কৌশল অবলম্বন ও বেনিয়ামীনের মিসর আগমন : সুদ্দী ও অন্যান্যদের বরাতে কুরতুবী ও ইবনু কাছীর বর্ণনা করেন যে, দশ ভাই দরবারে পৌঁছলে ইউসুফ (আঃ) তাদেরকে দোভাষীর মাধ্যমে এমনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, যেমন অচেনা লোকদের করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং পিতা ইয়াকূব ও ছোটভাই বেনিয়ামীনের বর্তমান অবস্থা জেনে নেওয়া। যেমন তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমরা ভিন্নভাষী এবং ভিনদেশী। আমরা কিভাবে বুঝব যে, তোমরা শত্রুর গুপ্তচর নও? তারা বলল, আল্লাহর কসম! আমরা গুপ্তচর নই। আমরা আল্লাহর নবী ইয়াকূব (আঃ)-এর সন্তান। তিনি কেন‘আনে বসবাস করেন। অভাবের তাড়নায় তাঁর নির্দেশে সুদূর পথ অতিক্রম করে আপনার কাছে এসেছি আপনার সুনাম-সুখ্যাতি শুনে। যদি আপনি আমাদের সন্দেহ বশে গ্রেফতার করেন অথবা শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেন, তাহ’লে আমাদের অতিবৃদ্ধ পিতা-মাতা ও আমাদের দশ ভাইয়ের পরিবার না খেয়ে মারা পড়বে।[29]

একথা শুনে ইউসুফের হৃদয় উথলে উঠল। কিন্তু অতি কষ্টে বুকে পাষাণ চেপে রেখে বললেন, তোমাদের পিতার আরও কোন সন্তান আছে কি?

তারা বলল, আমরা বারো ভাই ছিলাম। তন্মধ্যে এক ভাই ইউসুফ ছোট বেলায় জঙ্গলে হারিয়ে গেছে। আমাদের পিতা তাকেই সর্বাধিক স্নেহ করতেন। অতঃপর তার সহোদর সবার ছোট ভাই বেনিয়ামীন এখন বাড়ীতে আছে পিতাকে দেখাশুনার জন্য। সবকথা শুনে নিশ্চিত হবার পর ইউসুফ (আঃ) তাদেরকে রাজকীয় মেহমানের মর্যাদায় রাখার এবং যথারীতি খাদ্য-শস্য প্রদানের নির্দেশ দিলেন। অতঃপর বিদায়ের সময় তাদের বললেন, পুনরায় আসার সময় তোমরা তোমাদের ছোট ভাইটিকে সাথে নিয়ে এসো। এ বিষয়ে কুরআনী বর্ণনা নিম্নরূপ-

وَلَمَّا جَهَّزَهُمْ بِجَهَازِهِمْ قَالَ ائْتُونِيْ بِأَخٍ لَّكُم مِّنْ أَبِيْكُمْ أَلاَ تَرَوْنَ أَنِّيْ أُوْفِي الْكَيْلَ وَأَنَا خَيْرُ الْمُنْزِلِيْنَ- فَإِن لَّمْ تَأْتُونِيْ بِهِ فَلاَ كَيْلَ لَكُمْ عِنْدِي وَلاَ تَقْرَبُونِ- قَالُواْ سَنُرَاوِدُ عَنْهُ أَبَاهُ وَإِنَّا لَفَاعِلُونَ- (يوسف ৫৯-৬১)-
‘অতঃপর ইউসুফ যখন তাদের রসদ সমূহ প্রস্ত্তত করে দিল, তখন বলল, তোমাদের বৈমাত্রেয় ভাইকে আমার কাছে নিয়ে এসো। তোমরা কি দেখছ না যে, আমি মাপ পূর্ণভাবে দিয়ে থাকি এবং মেহমানদের উত্তম সমাদর করে থাকি’? (৫৯)। ‘কিন্তু যদি তোমরা তাকে আমার কাছে না আনো, তবে আমার কাছে তোমাদের কোন বরাদ্দ নেই এবং তোমরা আমার নিকটে পৌঁছতে পারবে না’ (৬০)। ‘ভাইয়েরা বলল, আমরা তার সম্পর্কে তার পিতাকে রাযী করার চেষ্টা করব এবং আমরা একাজ অবশ্যই করব’ (ইউসুফ ১২/৫৯-৬১)।

এরপর ইউসুফ (আঃ) কৌশল অবলম্বন করলেন। কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, দশটি উটের সমপরিমাণ খাদ্যমূল্য সংগ্রহ করতে ভাইদের সামর্থ্য নাও হ’তে পারে। অথচ ছোট ভাইকে আনা প্রয়োজন। সেকারণ তিনি কর্মচারীদের বলে দিলেন, খাদ্যমূল্য বাবদ তাদের দেওয়া অর্থ তাদের কোন একটি বস্তার মধ্যে ভরে দিতে। যাতে বাড়ী গিয়ে উক্ত টাকা নিয়ে আবার তারা চলে আসতে পারে। এ বিষয়ে কুরআনী বর্ণনা নিম্নরূপ-

وَقَالَ لِفِتْيَانِهِ اجْعَلُوْا بِضَاعَتَهُمْ فِي رِحَالِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَعْرِفُوْنَهَا إِذَا انْقَلَبُوْا إِلَى أَهْلِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُوْنَ- (يوسف ৬২)-
‘ইউসুফ তার কর্মচারীদের বলল, তাদের পণ্যমূল্য তাদের রসদ-পত্রের মধ্যে রেখে দাও, যাতে গৃহে পৌঁছে তারা তা বুঝতে পারে। সম্ভবতঃ তারা পুনরায় আসবে’ (ইউসুফ ১২/৬২)।

ইউসুফের ভাইয়েরা যথাসময়ে বাড়ী ফিরে এল। বস্তা খুলে পণ্যমূল্য ফেরত পেয়ে তারা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। তারা এটাকে তাদের প্রতি আযীযে মিছরের বিশেষ অনুগ্রহ বলে ধারণা করল। এক্ষণে তারা পিতাকে বলল, আববা! আমরা যখন পণ্যমূল্য পেয়ে গেছি, তখন আমরা সত্বর পুনরায় মিসরে যাব। তবে মিসররাজ আমাদেরকে একটি শর্ত দিয়েছেন যে, এবারে যাওয়ার সময় ছোট ভাই বেনিয়ামীনকে নিয়ে যেতে হবে। তাকে ছেড়ে গেলে খাদ্যশস্য দিবেন না বলে তিনি স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। অতএব আপনি তাকে আমাদের সাথে যাবার অনুমতি দিন। জবাবে পিতা ইয়াকূব (আঃ) বললেন, তার সম্পর্কে তোমাদের কিভাবে বিশ্বাস করব? ইতিপূর্বে তোমরা তার ভাই ইউসুফ সম্পর্কে বিশ্বাসভঙ্গ করেছ’। অতঃপর পরিবারের অভাব-অনটনের কথা ভেবে তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়ে তিনি বেনিয়ামীনকে তাদের সাথে যাবার অনুমতি দিলেন। ঘটনাটি কুরআনের ভাষায় নিম্নরূপ-

فَلَمَّا رَجَعُوْا إِلَى أَبِيْهِمْ قَالُوْا يَا أَبَانَا مُنِعَ مِنَّا الْكَيْلُ فَأَرْسِلْ مَعَنَا أَخَانَا نَكْتَلْ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ- قَالَ هَلْ آمَنُكُمْ عَلَيْهِ إِلاَّ كَمَا أَمِنتُكُمْ عَلَى أَخِيْهِ مِن قَبْلُ فَاللهُ خَيْرٌ حَافِظاً وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِيْنَ- وَلَمَّا فَتَحُوْا مَتَاعَهُمْ وَجَدُوْا بِضَاعَتَهُمْ رُدَّتْ إِلَيْهِمْ قَالُوْا يَا أَبَانَا مَا نَبْغِي هَـذِهِ بِضَاعَتُنَا رُدَّتْ إِلَيْنَا وَنَمِيْرُ أَهْلَنَا وَنَحْفَظُ أَخَانَا وَنَزْدَادُ كَيْلَ بَعِيْرٍ ذَلِكَ كَيْلٌ يَسِيْرٌ- قَالَ لَنْ أُرْسِلَهُ مَعَكُمْ حَتَّى تُؤْتُوْنِ مَوْثِقاً مِّنَ اللهِ لَتَأْتُنَّنِيْ بِهِ إِلاَّ أَن يُّحَاطَ بِكُمْ فَلَمَّا آتَوْهُ مَوْثِقَهُمْ قَالَ اللهُ عَلَى مَا نَقُوْلُ وَكِيْلٌ- (يوسف ৬৩-৬৬)-
‘অতঃপর তারা যখন তাদের পিতার কাছে ফিরে এল, তখন বলল, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য খাদ্যশস্যের বরাদ্দ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অতএব আপনি আমাদের সাথে আমাদের ভাইকে প্রেরণ করুন, যাতে আমরা খাদ্যশস্যের বরাদ্দ আনতে পারি। আমরা অবশ্যই তার পুরোপুরি হেফাযত করব’ (৬৩)। ‘পিতা বললেন, আমি কি তার সম্পর্কে তোমাদের সেইরূপ বিশ্বাস করব, যেরূপ বিশ্বাস ইতিপূর্বে তার ভাই সম্পর্কে করেছিলাম? অতএব আল্লাহ উত্তম হেফাযতকারী এবং তিনিই সর্বাধিক দয়ালু’ (৬৪)। ‘অতঃপর যখন তারা পণ্য সম্ভার খুলল, তখন দেখতে পেল যে, তাদেরকে তাদের পণ্যমূল্য ফেরত দেওয়া হয়েছে। তারা (আনন্দে) বলে উঠলো, হে আমাদের পিতা! আমরা আর কি চাইতে পারি? এইতো আমাদের দেওয়া পণ্যমূল্য আমাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা আবার আমাদের পরিবারের জন্য খাদ্যশস্য আনব। আমরা আমাদের ভাইয়ের হেফাযত করব এবং এক উট খাদ্যশস্য বেশী আনতে পারব এবং ঐ বরাদ্দটা খুবই সহজ’ (৬৫)। ‘পিতা বললেন, তাকে তোমাদের সাথে পাঠাব না, যতক্ষণ না তোমরা আমার নিকটে আল্লাহর নামে অঙ্গীকার কর যে, তাকে অবশ্যই আমার কাছে পৌঁছে দেবে। অবশ্য যদি তোমরা একান্তভাবেই অসহায় হয়ে পড় (তবে সেকথা স্বতন্ত্র)। অতঃপর যখন সবাই তাঁকে অঙ্গীকার দিল, তখন তিনি বললেন, আমাদের মধ্যে যে কথা হ’ল, সে ব্যাপারে আল্লাহ মধ্যস্থ রইলেন’ (ইউসুফ ১২/৬৩-৬৬)।

উপরের আলোচনায় মনে হচ্ছে যে, দশভাই বাড়ী এসেই প্রথমে তাদের পিতার কাছে বেনিয়ামীনকে নিয়ে যাবার ব্যাপারে দরবার করেছে। অথচ তারা ভাল করেই জানত যে, এ প্রস্তাবে পিতা কখনোই রাযী হবেন না। দীর্ঘদিন পরে বাড়ী ফিরে অভাবের সংসারে প্রথমে খাদ্যশস্যের বস্তা না খুলে বৃদ্ধ পিতার অসন্তুষ্টি উদ্রেককারী বিষয় নিয়ে কথা বলবে, এটা ভাবা যায় না। পণ্যমূল্য ফেরত পাওয়ায় খুশীর মুহূর্তেই বরং এরূপ প্রস্তাব দেওয়াটা যুক্তিসম্মত।

উল্লেখ্য যে, কুরআনী বর্ণনায় আগপিছ হওয়াতে ঘটনার আগপিছ হওয়া যরূরী নয়। যেমন মূসা (আঃ)-এর কওমের গাভী কুরবানীর ঘটনা বর্ণনা (বাক্বারাহ ৬৭-৭১) শেষে ঘটনার কারণ ও সূত্র বর্ণনা করা হয়েছে (বাক্বারাহ ৭২-৭৩)। এমন বিবরণ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়। এখানেও সেটা হয়েছে বলে অনুমিত হয়।

ছেলেদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়ে বেনিয়ামীনকে তাদের সাথে পাঠাবার ব্যাপারে সম্মত হওয়ার পর পিতা ইয়াকূব (আঃ) পরিষ্কারভাবে বলেন, فَاللهُ خَيْرٌ حَافِظاً ‘আল্লাহ্ই উত্তম হেফাযতকারী’ (ইউসুফ ১২/৬৪)। অর্থাৎ তিনি বেনিয়ামীনকে আল্লাহর হাতেই সোপর্দ করলেন। আল্লাহ তার বান্দার এই আকুতি শুনলেন। অতঃপর ইয়াকূব (আঃ) ছেলেদেরকে কিছু উপদেশ দেন, যার মধ্যে তাঁর বাস্তববুদ্ধি ও দূরদর্শিতার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি তাদেরকে একসাথে একই প্রবেশদ্বার দিয়ে মিসরের রাজধানীতে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। বরং তাদেরকে পৃথক পৃথক ভাবে বিভিন্ন দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে বলেন। কেননা তিনি ভেবেছিলেন যে, একই পিতার সন্তান সুন্দর ও সুঠামদেহী ১১ জন ভিনদেশীকে একত্রে এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে দেখলে অনেকে মন্দ কিছু সন্দেহ করবে। দ্বিতীয়তঃ প্রথমবার সফরে মিসররাজ তাদের প্রতি যে রাজকীয় মেহমানদারী প্রদর্শন করেছেন, তাতে অনেকের মনে হিংসা জেগে থাকতে পারে এবং তারা তাদের ক্ষতি করতে পারে। তৃতীয়তঃ তাদের প্রতি অন্যদের কুদৃষ্টি লাগতে পারে। বিষয়টি আল্লাহ বর্ণনা করেন এভাবে,

وَقَالَ يَا بَنِيَّ لاَ تَدْخُلُواْ مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُواْ مِنْ أَبْوَابٍ مُّتَفَرِّقَةٍ وَمَا أُغْنِيْ عَنكُم مِّنَ اللهِ مِنْ شَيْءٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ ِللهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُوْنَ- (يوسف ৬৭)-
‘ইয়াকূব বললেন, হে আমার সন্তানেরা! তোমরা সবাই একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না। বরং পৃথক পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ কর। তবে আল্লাহ থেকে আমি তোমাদের রক্ষা করতে পারি না। আল্লাহ ব্যতীত কারু হুকুম চলে না। তাঁর উপরেই আমি ভরসা করি এবং তাঁর উপরেই ভরসা করা উচিত সকল ভরসাকারীর’ (ইউসুফ ১২/৬৭)।

অতঃপর পিতার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে বেনিয়ামীন সহ ১১ ভাই ১১টি উট নিয়ে মিসরের পথে যাত্রা করল। পথিমধ্যে তাদের কোনরূপ বাধা-বিঘ্ন ঘটেনি। মিসরে পৌঁছে তারা পিতার উপদেশ মতে বিভিন্ন দরজা দিয়ে পৃথক পৃথকভাবে শহরে প্রবেশ করল। ইয়াকূবের এ পরামর্শ ছিল পিতৃসূলভ স্নেহ-মমতা হ’তে উৎসারিত। যার ফল সন্তানেরা পেয়েছে। তারা কারু হিংসার শিকার হয়নি কিংবা কারু বদনযরে পড়েনি। কিন্তু এর পরেও আল্লাহর পূর্ব নির্ধারিত তাক্বদীর কার্যকর হয়েছে। বেনিয়ামীন চুরির মিথ্যা অপবাদে গ্রেফতার হয়ে যায়। যা ছিল ইয়াকূবের জন্য দ্বিতীয়বার সবচেয়ে বড় আঘাত। কিন্তু এটা ইয়াকূবের দো‘আর পরিপন্থী ছিল না। কেননা তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহ থেকে আমি তোমাদের রক্ষা করতে পারি না। আল্লাহ ব্যতীত কারু হুকুম চলে না’ (ইউসুফ ১২/৬৭)। অতএব পিতার নির্দেশ পালনকরলেও তারা আল্লাহর পূর্বনির্ধারণ বা তাক্বদীরকে এড়াতে পারেনি। আর সেই তাক্বদীরের ফলেই ইয়াকূব (আঃ) তার হারানো দু’সন্তানকে একত্রে ফিরে পান। ইয়াকূবের গভীর জ্ঞানের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন, وَإِنَّهُ لَذُوْ عِلْمٍ لِّمَا عَلَّمْنَاهُ وَلَـكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لاَ يَعْلَمُوْنَ، ‘ইয়াকূব বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। যা আমরা তাকে দান করেছিলাম। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না’ (ইউসুফ ১২/৬৮)।

বলা বাহুল্য, ইয়াকূবের সেই ইল্ম ছিল আল্লাহর সত্তা ও তাঁর গুণাবলীর ইল্ম, আল্লাহর অতুলনীয় ক্ষমতার ইল্ম। আর এটাই হ’ল মা‘রেফাত বা দিব্যজ্ঞান, যা সূক্ষ্মদর্শী মুত্তাক্বী আলেমগণ লাভ করে থাকেন। সেজন্যেই তিনি নিজের দেওয়া কৌশলের উপরে নির্ভর না করে আল্লাহর উপরে ভরসা করেন ও তাঁর উপরেই ছেলেদের ন্যস্ত করেন। সেকারণেই আল্লাহ তাঁর নিজস্ব কৌশল প্রয়োগ করে ছেলেদেরকে সসম্মানে পিতার কোলে ফিরিয়ে দেন। ফালিল্লাহিল হাম্দ। উক্ত বিষয়গুলি কুরআনে বর্ণিত হয়েছে নিম্নরূপে:

وَلَمَّا دَخَلُوْا مِنْ حَيْثُ أَمَرَهُمْ أَبُوْهُمْ مَّا كَانَ يُغْنِيْ عَنْهُم مِّنَ اللهِ مِنْ شَيْءٍ إِلاَّ حَاجَةً فِيْ نَفْسِ يَعْقُوْبَ قَضَاهَا وَإِنَّهُ لَذُوْ عِلْمٍ لِّمَا عَلَّمْنَاهُ وَلَـكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لاَ يَعْلَمُوْنَ- وَلَمَّا دَخَلُواْ عَلَى يُوْسُفَ آوَى إِلَيْهِ أَخَاهُ قَالَ إِنِّي أَنَاْ أَخُوْكَ فَلاَ تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ- (يوسف ৬৮-৬৯)-
‘তারা যখন তাদের পিতার নির্দেশনা মতে শহরে প্রবেশ করল, তখন আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে তা তাদের বাঁচাতে পারল না (অর্থাৎ তাদের সে কৌশল কাজে আসল না এবং বেনিয়ামীন গ্রেফতার হ’ল)। কেবল ইয়াকূবের একটি প্রয়োজন (অর্থাৎ ছেলেদের দেওয়া পরামর্শে) যা তার মনের মধ্যে (অর্থাৎ, স্নেহ মিশ্রিত তাকীদ) ছিল, যা তিনি পূর্ণ করেছিলেন বস্ত্ততঃ তিনি তো ছিলেন একজন জ্ঞানী, যে জ্ঞান আমরা তাকে শিক্ষা দিয়েছিলাম (অর্থাৎ আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান)। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না’। ‘অতঃপর যখন তারা ইউসুফের নিকটে উপস্থিত হ’ল, তখন সে তার ভাই (বেনিয়ামীন)-কে নিজের কাছে রেখে দিল এবং (গোপনে তাকে) বলল, নিশ্চয়ই আমি তোমার সহোদর ভাই (ইউসুফ)। অতএব তাদের (অর্থাৎ সৎ ভাইদের) কৃতকর্মের জন্য দুঃখ করো না’ (ইউসুফ ১২/৬৮-৬৯)। [29]. তাফসীর কুরতুবী, ইবনু কাছীর, ইউসুফ ৫৮-৫৯।

১ম পর্ব:  শিশুকালে ইউসুফ (আঃ) দশ ভাইয়ের দ্বারা অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনা
২য় পর্ব : হযরত ইউসুফ আঃকে মিসরের তৎকালীন অর্থ ও রাজস্বমন্ত্রী ক্বিৎফীর ক্রয় করে স্ত্রীর হাতে সমর্পণ করলেন…

ad

পাঠকের মতামত