ভাড়াটে খুনির জবানবন্দি : ‘এই নে ইয়াবা আর চাকু খুন করে ফিরবি’
নিউজ ডেস্ক।। ‘এই নে ইয়াবা আর চাকু, তোরা পারভেজকে খুন করে ফিরবি’- এ কথা বলে মাদকসম্রাজ্ঞী পিংকি থ্রি গিয়ারের তিনটি চাকু বের করে পিচ্ছি সজলকে একটা, আমাকে একটা এবং জুয়েলকে একটা দেয়। হোন্ডাবাবুকে দেয় ২০ পিস বাবা (ইয়াবা)। পিংকি বলে, পারভেজকে দাওয়াত করে এনে ইয়াবার আসরে বসিয়ে খুন করবি। এরপর পিচ্চি সজল আমাকে বুঝিয়ে দেয় কীভাবে পারভেজকে খুন করতে হবে। আমাকে দুইটার বেশি ইয়াবা খেতে বারণ করে সে। পারভেজ এলে পেছন দিয়ে ঘাই (ছুরিকাঘাত) দিতে বলে। এভাবেই বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোরশেদ আল মামুন ভূঁইয়ার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় ভাড়াটে কিলার মো. সজল (২৪)।
২০১৫ সালের ১০ অক্টোবর কদমতলীর বড়ইতলা মোড়ে ক্লুলেস রাসেল হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই একটি ভাড়াটে খুনিচক্রের সন্ধান পায়। ওই চক্রের অন্যতম সদস্য সজল। মো. সজল আদালতকে জানায়, সে জুরাইন বালুর মাঠ এলাকায় একটি সেলাই মেশিনের ওয়ার্কশপে কাজ করত।
পাশেই ভাড়াটে কিলার পিচ্চি সজলের ভাইয়ের কবুতরের খাঁচার দোকান। ২০১৫ সালের ১০ অক্টোবর পিচ্ছি সজল আমাকে (মো. সজলকে) ফোন দিয়ে বলে, একটা কাজ আছে তাড়াতাড়ি কদমতলী ব্রিজের কাছে আয়। ওখানে যাওয়ার পর জিজ্ঞাস করলাম কী কাজ? বলল, একজনকে খুন করতে হবে, বিনিময়ে তুই দুই লাখ টাকা পাবি। এরপর কদমতলী ব্রিজ থেকে হেঁটে যেতে দুই মিনিট লাগে এমন দূরত্বের একটি বাসায় যাই আমরা। গিয়ে দেখি, মাদকসম্রাজ্ঞী পিংকি, তার স্বামী ছানু, আমাদের গ্রুপের হুন্ডা বাবু, জুয়েল ও পিচ্ছি সজলের পরিচিত রাসেল বসে আছে। আমি রাসেলকে চিনতাম না। তাকে (রাসেল) খুলনা থেকে নিয়ে এসেছে বলে সজল পরিচয় করিয়ে দেয়। আমরা পিংকির কাছ থেকে চাকু ও ইয়াবা বুঝে নিই। এরপর হোন্ডাবাবু পারভেজকে ফোন দেয়। এর ২০-২৫ মিনিট পর বড়ইতলা এলাকায় পারভেজ আল আমিন আসে।
এরপর সবাই মিলে বাবা (ইয়াবা) খেতে বসি। আমি দুইটা বাবা খাই। আমাদের দূর থেকে প্রত্যক্ষ করছিল মাদকসম্রাজ্ঞী পিংকি ও তার স্বামী ছানু। পারভেজ একের পর এক বাবা খাচ্ছিল। এমন অবস্থায় আমি পেছন থেকে চাকু দিয়ে তাকে পার (আঘাত) দেই। পারভেজ সঙ্গে সঙ্গে ওঠে দাঁড়ায়। এ সময় পিচ্ছি সজল এবং জুয়েলও তাকে আঘাত করা শুরু করে। হোন্ডাবাবু মোবাইলে টর্চ জ্বালিয়ে রাখছিল।
আমরা যখন পারভেজকে ছুরিকাঘাত করছিলাম, তখন হোন্ডাবাবু হঠাৎ মোবাইল ফোনের টর্চ অফ করে দেয়। এ সময় শোর-চিৎকার শুরু হলে পিংকি ও ছানু চলে যায়। উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতের সময় রাসেল বলতেছিল তার ঘাই (আঘাত) লেগেছে। পরে পিচ্ছি সজল ও আমি (মো. সজল) রাসেলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে রাসেল মারা যায়। মো. সজল আদালতকে বলে, ‘আমার মনে হয় পিচ্ছি সজলের ঘাই (ছুরিকাঘাত) খেয়েই রাসেল মারা গেছে।’
পিবিআইর ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে জানান, নিহত রাসেলের বাড়ি খুলনা জেলার রূপসা থানার শিরগতি গ্রামে। একই গ্রামে ভাড়াটে কিলার পিচ্ছি সজলের শ্বশুরবাড়ি। পিচ্ছি সজল অপরাধ করে গা ঢাকা দিত শ্বশুরবাড়িতে। সেই সুবাদে তার সঙ্গে রাসেলের পরিচয়। সে রাসেলকে একটি টায়ার কোম্পানিতে চাকরি দেয়ার কথা বলে ২০১৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিয়ে আসে। ওই বছরের ১০ অক্টোবর রাত ১১টায় রাসেলের মা ফোনে জানতে পারেন তার ছেলে ঢাকায় খুন হয়েছে।
তিনি ঢাকায় এসে ঢামেক মর্গে তার ছেলের লাশ শনাক্ত করেন। তাকে জানানো হয়, কদমতলীর বড়ইতলা মোড়ে কে বা কারা ছুরিকাঘাত করে রাসেলকে হত্যা করেছে। এলাকার লোকজন তখন ধারণা করছিল ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে রাসেল মারা গেছে। রাসেলের মা রাশিলা বেগম কদমতলী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ঘাতক শনাক্ত করতে না পেরে পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। রাসেলের মা এতে নারাজি দেন। এরপর আদালত মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন পিবিআইকে।
এ পর্যন্ত ভাড়াটে কিলার গ্রুপের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ মার্চ কেরানীগঞ্জ থেকে সজলকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ৯ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করা হয় পিচ্ছি সজল ও হোন্ডাবাবুকে। তারাও আদালতের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
রাসেল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মেট্রোর উপপুলিশ পরিদর্শক মো. আল আমিন শেখ যুগান্তরকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে সজল, পিচ্ছি সজল ও হোন্ডাবাবু জানিয়েছে, কদমতলী এলাকায় মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার একটি বড় সিন্ডিকেট পরিচালনা করে পিংকি। একই এলাকায় অস্ত্র ও মাদকের আরেক সিন্ডিকেট রয়েছে পারভেজ ও তার ভাই সবুজের। পিংকি পারভেজকে তার অন্যতম প্রতিপক্ষ মনে করে। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বও দীর্ঘদিনের। এ অবস্থায় পিংকি সিদ্ধান্ত নেয় পারভেজকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার।
এজন্য পিংকি পিচ্ছি সজল এবং হুন্ডা বাবুর সঙ্গে ৫ লাখ টাকায় চুক্তি করে। বায়না দেয় ১৭ হাজার টাকা। বাকি টাকা অপারেশন সাকসেসের পর দেয়ার কথা। এদিকে ঢাকায় নিয়ে এলেও চাকরি দিতে না পারায় সজলের সঙ্গে বিরোধ চলছিল রাসেলের। পিংকির সঙ্গে পারভেজকে খুনের চুক্তির সঙ্গে সঙ্গে রাসেল মনে মনে ফন্দি আঁটে এক ঢিলে দুই শিকারের। অর্থাৎ পারভেজকে খুনের সময় কৌশলে রাসেলকেও খুন করতে হবে।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন ইয়াবার আসরে পারভেজকে খুনের সময় রাসেলকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে দু’জনকেই চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসারত অবস্থায় রাসেল মারা যায়। কিন্তু অসংখ্য ছুরিকাঘাতের পরও বেঁচে যায় পারভেজ। তবে সে এ ঘটনা চেপে গিয়ে শুধু তার ওপর হামলার বিষয়ে একটি মামলা করে। পারভেজ অপর একটি মামলায় কারাগারে রয়েছে। তাকে মামলায় সাক্ষী করা হবে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআইর বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, রাসেল হত্যাকাণ্ডটি একেবারেই ক্লুলেস ছিল। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে ঘটনার সাড়ে ৩ বছর পর রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে। খুনের নির্দেশদাতা পিংকি এবং তার স্বামী ছানুকে গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। উৎস: যুগান্তর।




