273928

ভারতের বৃটিশ বধূ ফ্রিদা বেদী, দুঃসাহসী এক প্রেমিকা ও বিপ্লবী

কবীর বেদী। নামটা বললেই বেশির ভাগ মানুষের মুখে একটা আলো খেলে যাবে, যার মানে হচ্ছে, তাকে তো চিনি। হ্যাঁ চেনারই কথা। বলিউডের শক্তিমান অভিনেতা। তার বড়ো ভাই রাঙ্গা বেদী। আর দু’জনের মাঝখানে একমাত্র বোন গুলহিমা বেদী। বাবার নাম বাবা পিয়ারে লাল বেদী। সবাই সংক্ষেপ করে বলে, বিপিএল। কবীর বেদীর পর বাকি নামগুলো নিয়ে বেশিরভাগ মানুষেরই খুব একটা আগ্রহ নেই, থাকার কথাও না। কিন্তু যারা ইতিহাসের পাতায় মন রাখেন, তারা আরেকটি নাম শোনার জন্যে উন্মুখ থাকবেন, থাকেনও। নামটি হলো ফ্রিদা বেদী। কবীর বেদীর মা। এটা আদপেই তার পরিচয়-সূত্র নয়। তার আসল পরিচয়, তিনি অক্সফোর্ডের প্রথম বৃটিশ ছাত্রী, যিনি সমাজ সংসার সব ছেড়ে ভালোবেসেছিলেন ভারতীয় নাগরিক বিপিএল-কে। বিয়ে করে একেবারে চলে আসেন ভারতে। শুধু তাই নয়, ভারতের মুক্তিসংগ্রামে বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন স্বামীর সহযোদ্ধা হয়ে। আমাদের এই কাহিনী তাকে নিয়েই। বিবিসি।

ফ্রিদার জীবনটা গতানুগতিক ছিলো না। ইংল্যান্ডের ছোট্ট একটি শহরে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি, ১৯১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। অক্সফোর্ডে পড়ার সময় পরিচয় হয় বাবা পিয়ারে লাল বেদির সাথে। এই শিখ তরুণকে বন্ধুরা ডাকতো বিপিএল বলে। বিপিএল-এর প্রেমে পড়ে দেশ ছেড়ে ভারত চলে আসেন, অংশ নেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে। ইতিহাস সৃষ্টি করা এই অমর প্রেমকাহিনী লিখছেন ফ্রিদার জীবনীকার অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেড।

বিপিএল-এর সাথে ফ্রিদার প্রেমের কাহিনী জন্ম নেয় ১৯৩০ সালের শুরুর দিকে। সেই সসময় ভিন্ন ধর্মের বা ভিনদেশি কারো সাথে কোনো বৃটিশের প্রেমের কথা ভাবাও যেতো না। বিয়ে তো পরের কথা। ফ্রিদা যে পরিবারের সন্তান, তার পক্ষে শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে মুখে কলঙ্কতিলক আঁকার তো কোনো সুযোগই ছিলো না। কিন্তু সমাজ-সংস্কার আর আভিজাত্যকে পায়ে ঠেলে ভালোবাসাকেই বরণ করার সিদ্ধান্ত নেন এই বৃটিশ তরুণী।

ফ্রিদার জন্ম ইংল্যান্ডের পূর্ব মিডল্যান্ডের ডারবি শহরে, বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপরের তলায় অবস্থিত বাসভবনে। তার বাবা জুয়েলারি রিপেয়ারিং-এর ব্যবসা করতেন। তিনি ছিলেন একজন সৈনিকও। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি অংশ নেন মেশিনগান বাহিনীর সদস্য হিসেবে। সে সময় এই বাহিনীতে হতাহতের ঘটনা এতো বেশি ঘটতো যে , মেশিনগান বাহিনীর নাম দেয়া হয়েছিলো ‘স্যুইসাইড ক্লাব’। যুদ্ধেই মারা যান তিনি, উত্তর ফ্রান্সে, তখন তার মেয়ে ফ্রিদার বয়স মাত্র ৭।

বাবার মৃত্যু আমার শৈশবটাকে কালো ছায়ায় ঢেকে দিয়েছিলো, এভাবেই বলেছেন ফ্রিদা। বাবার জীবনদর্শন ও কর্ম তাকে রাজনৈতিক আনুগত্য ও আধ্যাত্মবাদে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। যদিও বাবার কথা খুব সামান্যই মনে করতে পারেন তিনি, বরং বাবার না থাকাটাই যেনো বাবার উপস্থিতির স্মারক হয়ে যায় ছোট্ট মেয়েটির জীবনে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ফ্রিদার কাছে ছিলো পৃথিবীর প্রবেশদ্বার। তিনি বৃটেনের সেই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করতেন, যারা হতাশায় আচ্ছন্ন ছিলেন। বিশ্বজোড়া সংকট, ব্যাপক বেকারত্ব ও ফ্যাসিবাদের উত্থানের কারণে সেই সময়কার তরুণদের মাঝে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্রিদা শুরু থেকেই বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন এমন কিছু মেয়ের সাথে যারা প্রকৃতিগতভাবেই বিদ্রোহী ছিলেন। এই বন্ধুদের সাথে তিনি লেবার ক্লাব ও কমিউনিস্ট অক্টোবর ক্লাবের সভায় যেতেন। ফ্রিদার মন ছিলো অনুসন্ধিৎসু, আর সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যারা লড়াই করতেন, তাদের প্রতি সহানুভূতি ছিলো তার। এই দুই কারণেই অক্সফোর্ডে তিনি বিপ্লবীদের সাপ্তাহিক সভায় যেতে শুরু করেন। এসব সভায় ভারতীয় ছাত্ররা তাদের দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কথা তুলে ধরতেন। পাঞ্জাবী বিপিএল ছিলেন সুদর্শন ও আমুদে মানুষ, তিনি নিয়মিত যেতেন ওই মজলিশে। কয়েক মাসের মধ্যেই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয় এবং তা বিয়েতে গড়ায়।

১৯৩০ সাল তখন, যে সময়টা যৌনভাবনার দিক দিয়ে অন্ধকার যুগেই ছিলো বৃটেন। কোন ছাত্রীর রুমে কোন ছাত্র চা পানের জন্য গেলে সেখানে ছাত্রীর একজন সহচর অবশ্যই উপস্থিত থাকতেন। দরোজা পুরো খোলা রাখতে হতো আর ঘরের বিছানাটিকে সরিয়ে নেয়া হতো করিডোরে। ফ্রিদার কলেজ এই কঠোর নিয়মের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করতো, তাতে করে ফ্রিদা ও বিপিএল-এর সম্পর্কটা ভেস্তে যাবারই কথা। কিন্তু ফ্রিদা কোন সহচর ছাড়াই বিপিএল-এর সাথে দেখা দিতেন, কারণ ছেলেমেয়ের সাক্ষাতের ওই প্রচলিত নিয়মটাকে তিনি বর্ণষৈম্য বলে মনে করতেন। আর ফ্রিদার বন্ধুভাগ্যও ছিলো অসাধারণ। বন্ধুদের একজন বারবারা ক্যাসল, যিনি পরবর্তীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হয়েছিলেন। এই বারবারাকে ফ্রিদা গোপনে জানান, তিনি ছেলেবন্ধু বিপিএল-কে বিয়ে করতে চান। শুনেই বিস্ময়ে ফেটে পড়েন বারবারা এবং ফ্রিদাকে বলেন, ‘অন্তত এটুকু বলো, তুমি নিশ্চয় শহরতলীর গৃহবধূতে পরিণত হবে না!’

ফ্রিদার পরিবার বিপিএল-এর সাথে সম্পর্ককে ভালোভাবে নেয়নি। ভারতীয় শিখ তরুণ যখন তাদের বাড়ি গিয়ে ফ্রিদার মায়ের মনজয় করতে চাইলো, তাতেও খুশি হতে পারেননি বৃটিশ পরিবারটির কোন সদস্য। দু’জনের সম্পর্ক ও বিয়ে, পুরো ঘটনাতেই পরিবার ও সমাজের চরম আপত্তি ছিলো। অনেকেই প্রকাশ্যে তাদের অসন্তোষের কথা জানান। অক্সফোর্ডের কোন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট বৃটিশ মেয়ে ভারতীয় কোন সহপাঠীকে বিয়ে করার ঘটনা এটিই প্রথম। তারা এতোটাই বৈরি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন যে, বিয়ে পড়ানোর পর ম্যারেজ রেজিস্ট্রার বরের সাথে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানান।

বিয়ের পর থেকেই ফ্রিদা নিজেকে ভারতীয় ভাবতে আনন্দ পেতেন, ভারতীয় পোশাক পড়তেন। বিয়ের বছরখানেক পর চার মাসের বাচ্চা রাঙ্গাকে নিয়ে ভারত চলে আসেন এই সাড়াজাগানো দম্পতি। মুম্বাই পর্যন্ত দু’সপ্তাহের জাহাজযাত্রা সুখকর ছিলো না। ফ্রিদা জানান, রান্নাঘর থেকে দুধ আনতে যাওয়া আমার জন্য সবচেয়ে বড়ো দুঃস্বপ্ন ছিলো। কারণ রাতে জাহাজের রান্নাঘরে হাজার হাজার তেলাপোকা বিচরণ করতো।

ভারতে রওয়ানা হওয়ার আগেই এই দম্পতিকে তাদের ছাত্র রাজনীতির কারণে বিপ্লবী এবং ‘ঝামেলা পাকানো’ হিসেবে চিহ্নিত করে বৃটিশ সরকার। জাহাজে ওঠার আগে সাত ঘণ্টা ধরে তাদের মালপত্র পরীক্ষা করা হয়, সন্দেহ করা হচ্ছিলো, তারা হয়তো বামপন্থী প্রচারপত্র বহন করছেন। ফ্রিদা বলেন, ‘তারা এমনকি আমার শিশু রাঙ্গার ন্যাপকিন পর্যন্ত খুলে দেখেছে, নিশ্চিত হতে চেয়েছে, তাতে কোন বার্তা লুকানো আছে কি না!’

বৃটেনে বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলার পর ভারতেও পারিবারিক নানান ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়েছে এই দম্পতি, বিশেষ করে ফ্রিদাকে। সেও এক দীর্ঘ কাহিনী, যা অতিক্রম করে তাদের জীবন নতুন মোড় নেয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে।

দু’জনেই ক্ষুব্ধ হলেন, যখন দেখলেন, ভারত এই যুদ্ধে বৃটেনের পক্ষ নিয়েছে। পাঞ্জাবে সেনা নিয়োগ কার্যক্রমে বাধা দিতে গুপ্ত আক্রমণে অংশ নেন বিপিএল। তিনি ধরা পড়েন এবং তাকে পাঠানো হয় মরুভূমির এক বন্দিশালায়। অন্যদিকে ফ্রিদাও সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজের জন্মভূমি বৃটেনের বিরুদ্ধেই তিনি লড়বেন। তিনি মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সামিল হলেন, সত্যাগ্রহী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মাঠে নামলেন। কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিলেন স্বামীর গ্রাম, নামলেন বৃটিশবিরোধী প্রচার কাজে। কথা একটাই, আগে ভারতের মুক্তি। গণতন্ত্র পাওয়ার আগে ভারত কোনো যুদ্ধে জড়াবে না। ফ্রিদা জনমত সংগঠনে নামায় বিব্রত হয়ে পড়ে ভারতীয় পুলিশ। একজন বৃটিশ মহিলাকে দেশিয় পুলিশ দিয়ে আটকানো ঠিক হবে না, এমন চিন্তা থেকে সাদা চামড়ার ইংরেজ পুলিশ কর্মকর্তাকে সেই গ্রামে পাঠানো হলো। আটকের পর সেদিন সকালেই ফ্রিদাকে একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটও অক্সফোর্ডে ছিলেন বলে মনে হলো, রাগে তার মুখ ছিলো রক্তবর্ণ।

ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষিপ্তস্বরে ফ্রিদাকে জানালেন, তার অপ্রীতিকর কর্মকাণ্ডে কর্তৃপক্ষ বিরক্ত। জবাবে ফ্রিদা বলেন, আমি এটাকে প্রীতিকর বলেই মনে করি। এরপর ম্যাজিস্ট্রেটের কথা, তুমি কি বৃটিশ রমণী হিসেবে কোনো সুবিধা পেতে চাও? জবাবে ফ্রিদা বলেন, আমাকে ভারতীয় হিসেবে বিবেচনা করলেই আমি খুশি। এরপর কি আর কথা চলে? ১৫ মিনিটে বিচার শেষ। ছয়মাসের কারাদ-, এটা খুব অন্যায্য হয়েছে তা বলা যাবে না। তবে কারাগারে তাকে কঠোর পরিশ্রমের কাজ দেয়া হয়, যা অবশ্যই ছিলো তার প্রতি একটা প্রতিহিংসামূলক আচরণ। কিন্তু ফ্রিদার কীই বা আসে যায়? প্রিয়তম পুরুষের জন্য ভারতকেই তিনি গ্রহণ করেছিলেন ভালোবেসে। সারাটা জীবন কাটিয়ে গেছেন ভারতীয় হিসেবেই।

১৯৪৭ এ দেশভাগের পর বিপিএল সপরিবারে কাশ্মীর চলে যান। ফ্রিদা বামপন্থী সশস্ত্র বিপ্লবী দলের নারী শাখায় যোগ দেন। কাজ করেন একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য হিসেবে। ১৯৫০ সালের দিকে বেশ শক্তিমান হয়ে ওঠে তাদের দল। পরের দশকে আবার আমূল এক পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে জীবনের খোলনলচে পাল্টে ফেলেন ফ্রিদা। জাতিসংঘের একটি কাজে তিনি বার্মা গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে প্রথমবারের মতো তিনি খুব ভালোভাবে বৌদ্ধদের দেখলেন। জানলেন। বৌদ্ধধর্মের প্রতি তীব্র তার অনুরাগ জন্মে, ধর্মান্তরিত হন তিনি। ১৯৫৯ সালে চীনের অত্যাচার থেকে প্রাণ বাঁচাতে কারণে বৌদ্ধরা যখন হিমালয় পর্বতমালা পাড়ি দিচ্ছিলো, তখন সেই শরণার্থীদের সেবায় তিনি আত্মনিয়োগ করেন। যদিও ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ_এ সব নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিলো না, জীবনে আরো একবার প্রথা ভেঙ্গে তিনি ‘নান’ হয়ে গেলেন। এরপর বুদ্ধের বাণী প্রচারকেই ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেন।

আর কোনোদিন তিনি পিতৃ ও মাতৃভূমি বৃটেনে ফিরে যাননি। ১৯৭৭ সালের ২৬ মার্চ তিনি নয়াদিল্লিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ad

পাঠকের মতামত