১১ লাশ চিনে হস্তান্তর ৮, এখনো নিখোঁজ ১২
নিউজ ডেস্ক।। মদিনা গ্রুপের সিনিয়র ক্যাশ এক্সিকিউটিভ ছিলেন নাসরিন জাহান (৩২)। এই কর্মজীবী নারী ব্যবসায়ী স্বামী সালেহ আহমেদ লিপু (৩৮) এবং একমাত্র সন্তান আফতাহীকে (৭) নিয়ে পুরান ঢাকার চকবাজারের হায়দারবক্স এলাকায় থাকতেন। বাড়ির পাশের চুড়িহাট্টায় গত ২০ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজ ছিল পরিবারটির সব সদস্য। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের ভাষ্য মতে, সে রাতে নাসরিন স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে রাতের খাবার কিনেছিলেন, তারপর রিকশায় করে ফিরছিলেন বাসায়। ওই সময়ই পড়েন অগ্নিকাণ্ডের কবলে। কারো লাশই খুঁজে পায়নি স্বজনরা। মৃতদেহ ফেরত পাওয়ার আশায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ নমুনা দিয়ে অপেক্ষায় ছিল তারা। ১৪ দিন পর গতকাল বুধবার পরিচয় শনাক্ত হলো ওই দম্পতির। নাসরিনের মা কহিনুর বেগম ও লিপুর বাবা লাল মিয়ার নমুনা পরীক্ষায়ই তাঁদের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ থেকে তাঁদের দেহাবশেষ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে আজিমপুর কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়। এই দম্পতির একমাত্র শিশুসন্তানের মৃতদেহটি পাওয়ার অপেক্ষায় এখন স্বজনরা।
নাসরিনের ভাই আনোয়ার হোসেন রনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ডিএনএ পরীক্ষায় বোন আর ভগ্নিপতির পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। যেমনই হোক লাশটা তো পাইলাম। এখন কবর দিতে পারব। তবে এখনো আমাদের অপেক্ষা শেষ হয় নাই। ভাগ্নেটাকে তো পেলাম না…।’ গতকাল দুপুরে সিআইডি এক সংবাদ সম্মেলনে নাসরিন, লিপুসহ ১১ নিহতের পরিচয় শনাক্তের তথ্য জানায়। এদের দেহাবশেষ ঢাকার কয়েকটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছিল।
ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে নিয়ে স্বজনদের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করছে জেলা প্রশাসন। সন্ধ্যা পর্যন্ত শনাক্ত দুই নারী ও ছয় পুরুষের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। এ নিয়ে সরকারি হিসেবে নিহত ৭১ জনের মধ্যে ৬৩ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শনাক্ত করতে না পারা আটটি দেহাবশেষ এখনো মর্গে আছে। তবে ডিএনএ নমুনা দেওয়া স্বজনদের দাবি অনুযায়ী, এখনো নিখোঁজ আছে ১২ জন। দেহাবশেষের সংখ্যার চারজন বেশি নিখোঁজ থাকায় চুড়িহাট্টায় ৭৫ জন নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিআইডির সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার জানান, ঘটনাস্থলে নিহত ৬৭টি মরদেহের বিপরীতে মোট ২৫৭টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। শনাক্ত না হওয়া ১৯ জনের মরদেহ ও একটি বিচ্ছিন্ন হাত পাওয়া যায়। এর বিপরীতে ৪৮ জন দাবিকারীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২৩ জনের সঙ্গে ১১টি মরদেহের নমুনা মিলে যায়। বাকি ৮-৯টি মরদেহের বিপরীতে ২৫ জন দাবিদার থাকল। একই পরিবারের একাধিক দাবিদার আছে। বাকিগুলো শনাক্ত করতে ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগতে পারে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তানজিল হাসান রোহানের (২১) পরিচয় শনাক্ত হয়েছে মা ও বাবার নমুনা যাচাইয়ে। তার বাবা হাসান বলেন, ‘ও আমার বড় সন্তান। আমার স্বপ্ন ছিল। আল্লাহ নিয়ে গেছেন। আমার স্বপ্ন শেষ…।’
কেরানীগঞ্জের রাইতা আটির বাসিন্দা এনামুল হক (৩৩) ছিলেন চকবাজারে স্টেশনারির দোকানদার। বাবা আমজাদ হোসেন ও বোন রোজিনা আক্তারের ডিএনএ নমুনায় শনাক্ত হয়েছে তাঁর মৃতদেহ। গতকাল সন্ধ্যায় সন্তানের লাশ গ্রহণ করে বাবা বলেন, ‘তিন বছরের এক বাচ্চা (ছেলে) রাইখা আমার ছেলেটা চলে গেল। ওর সংসারের কী হবে জানি না।’
মা শামসুন্নাহার এবং ভাই সাইদুল ইসলাম সানির সঙ্গে যাচাইয়ে শনাক্ত হয় গার্হস্থ অর্থনীতি কলেজের ছাত্রী ফাতেমাতুজ জোহরা বৃষ্টি (২৩)। মরদেহ গতকালই হস্তান্তর করা হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে থাকা তার বান্ধবী বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের ছাত্রী রেহনুমা তাবাসসুম দোলার (২৩) অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু অনেকটা নিশ্চিত হলেও লাশ শনাক্ত হয়নি এখনো।
এখনো নিখোঁজ যারা : এখনো শিশু আফতাহী ও শিক্ষার্থী দোলা ছাড়াও নিখোঁজ আছে চকবাজারের হাজি বালুগেটের জহিরুল হক সুমনের স্ত্রী বিবি হালিমা শিল্পী (২৫), কামরাঙ্গীর চরের রিকশাচালক শাহাবুদ্দীন (৩৩), চকবাজারের প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবসায়ী ফয়সাল সারোয়ার (৫৩), চকবাজারের প্লাস্টিক ব্যবসায়ী জাফর (৩০), সোয়ারীঘাটের রিকশাচালক হেলাল (২৫), পথচারী রফিক মিয়া (২৫), নূরুল ইসলাম (৪০), ইসমাইম (৪০), মোস্তফা (২৭) ও রাজু (২৩)। উৎস: কালের কণ্ঠ।




