268958

আলামত ‘খেলনা পিস্তল’ ও ‘বোমা সদৃশ বস্তু’

নিউজ ডেস্ক।।  বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজ ময়ূরপঙ্খি ছিনতাইচেষ্টা ঘটনার পর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ওই ঘটনায় কমান্ডো অভিযানে নিহত যুবক পলাশ আহমেদকে ঘিরেও কম আলোচনা হচ্ছে না। তিনি কী করে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়ে উড়োজাহাজে অস্ত্রসদৃশ বস্তু নিয়ে উঠলেন, সে বিষয়ে সরকারের একাধিক সংস্থা নানাভাবে তদন্ত করছে। তবে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি। এর মধ্যেই মামলার তদন্তভার ন্যস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ওপর। গতকাল তারা তদন্তে নেমে আলামত হিসেবে ময়ূরপঙ্খি উড়োজাহাজটি জব্দ করে। পরে তা বিমান মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির জিম্মায় দেওয়া হয়। এর আগে তদন্তকারীরা উড়োজাহাজটি পরিদর্শন করেন। এ সময় উড়োজাহাজটির ভেতরে কোনো গুলির চিহ্ন আছে কিনা তা তারা খতিয়ে দেখেন। এর পর গতকাল রাতে ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা কিছু আলামত পুলিশের কাছে জমা দেন সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাজেশ বড়–য়া। পুলিশ সূত্র বলছে, আলামতগুলোর মধ্যে একটি খেলনা পিস্তল ও বৈদ্যুতিক তার রয়েছে।

এদিকে শাহজালাল বিমানবন্দরের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা দেখেছেনÑ পলাশের কাছে থাকা ব্যাগ-লাগেজ স্ক্যানারে স্ক্যানিং করেছিলেন নিরাপত্তা অপারেটররা। এর আগে তার শরীরও তল্লাশি করা হয়। এত কিছুর পরও কী করে অস্ত্র নিয়ে পলাশ উড়োজাহাজে উঠলেন তা এখনো রহস্য। বিষয়টি স্পষ্ট হতে এখন উড়োজাহাজ ময়ূরপঙ্খির ভেতরের সিসি ক্যামেরার ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এর মধ্যে ছিনতাইচেষ্টার ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্মকা-ে সমন্বয়হীনতার দিকটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সূত্র বলছে, বর্তমানে দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরে ২৯টি সংস্থা কাজ করে। নিরাপত্তার দিকটি দেখভাল করে সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা শাখাসহ ৭টির মতো সংস্থা। এর মধ্যে রয়েছে ৩টি গোয়েন্দা সংস্থা, এপিবিএন, আনসার, বিমানবন্দর থানাপুলিশ এবং এভসেক সদস্যরা।

তবে মূল দায়িত্বে থাকার কথা সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা শাখার। কিন্তু সম্প্রতি এসব সংস্থার কর্মকা-ে একরকম সমন্বয়হীনতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে এক সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে আরেক সংস্থার সদস্যদের মধ্যে কর্তৃত্বের দ্বন্দ্বও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বিমানবন্দরে কর্মরত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর কারণে বিমানবন্দরে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, আমাদের মধ্যে কোনো সমন্বয়হীনতা নেই। আমরা বিশেষ বিশেষ সময়ে একে অপরের সঙ্গে পরামর্শ করে থাকি। যাতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কোথাও ঘাটতি না থাকে।

জানা গেছে, বিমানবন্দরের নানা দিক পর্যবেক্ষণে রাখতে সিভিল এভিয়েশনের নিজস্ব সিসি ক্যামেরা রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থাও বিমানবন্দরের বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে।
গত রবিবারের ছিনতাইচেষ্টার পর বিমানবন্দরের সিসি ক্যামেরা পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা দেখেছেনÑ নিহত পলাশ ওই দিন দুপুর ২টার দিকে বিমানবন্দরে আসেন। শাহজালাল বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে প্রবেশের আগমুহূর্তে প্রায় ৪০ মিনিট সেখানে পায়চারি করেন। তখন তার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা দেখা গেছে। ৪০ মিনিট পর অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের মূল গেট দিয়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন।

ছিনতাইচেষ্টার ঘটনায় সোমবার রাতেই পতেঙ্গা থানায় মামলা হয়েছে। কিন্তু উড়োজাহাজের ভেতরে পলাশ নামে ওই যুবক গুলি করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা আগে যে দাবি করেছিলেন, তার কিছুই মামলার এজাহারে নেই। এমনকি ওই যুবক পিস্তল বা খেলনা পিস্তল বহন করছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে তথ্য দিয়েছিল, তারও কিছু এজাহারে উল্লেখ হয়নি। কেবল বলা হয়েছেÑ পলাশ উড়োজাহাজের ভেতর দুটি পটকাজাতীয় বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন। মামলাটির তদন্ত ভার এখন ন্যস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কাছে।

এজাহারে বলা হয়, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মামলার বাদী চট্টগ্রাম সিভিল এভিয়েশনের প্রযুক্তি সহকারী দেবব্রত সরকার বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকালে বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে খবর পান, ঢাকা থেকে ৫টা ১৩ মিনিটে ছেড়ে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিমান বিজি-১৪৭ উড়োজাহাজটি অজ্ঞাত এক দুষ্কৃতকারী বোমাসদৃশ বস্তু ও অস্ত্র দেখিয়ে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করছে। তখন তিনি পাইলট ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের কথোপকথন ইসিআরে স্থাপিত রিসিভারে মনিটরিং করেন। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানালে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক সিভিল এভিয়েশন নিরাপত্তাকর্মী, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও আনসার সদস্যদের রানওয়ে এবং অ্যাপ্রোনে যাওয়ার নির্দেশ দেন। বিকাল ৫টা ৪১ মিনিটে আক্রান্ত বিমানটি অবতরণের পর পরই জরুরি নির্গমন পথ দিয়ে যাত্রী ও কেবিন ক্রুরা বেরিয়ে আসেন। এর মধ্যেই বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটির অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল মফিজুর রহমানের নেতৃত্বে বাহিনীর সদস্য, সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দল, র‌্যাব-৭ ও সিএমপি কর্মকর্তা, সিআইডির ক্রাইম সিন দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পরে প্যারা কমান্ডোরা বিমানটির ভেতরে অভিযান চালিয়ে অজ্ঞাত এক দুষ্কৃতকারীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অ্যাপ্রোনে নামিয়ে আনেন। এক সময় সে মারা যায়।

এজাহারের পরবর্তী অংশে বলা হয়, বিমানের ভেতরে পলাশ নামে দুষ্কৃতকারীর হাতে বোমা ও অস্ত্রসদৃশ বস্তু ছিল। সে তার কিছু দাবি প্রধানমন্ত্রীকে শুনতে হবে বলে চিৎকার করছিল। অন্যথায় সে বিমানটি বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। ওই সময় সে দুটি পটকাজাতীয় বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটায়। এ পরিস্থিতিতে বিমানটি শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তবে অভিযান শেষে মামলার আলামত হিসেবে কী কী জব্দ করা হয়েছে, তা এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি। যদিও বলা হয়, উদ্ধারকৃত আলামত র‌্যাব-৭ এবং সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দলের হেফাজতে আছে।

এদিকে পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা ও সুরতহাল প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কমান্ডোদের গুলি পলাশ আহমেদের নাভির ডানপাশ দিয়ে ঢুকে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। পরে সেটি উড়োজাহাজের গায়ে লেগে সেখানে ক্ষতের সৃষ্টি করে।  সিএমপির উপকমিশনার ও কাউন্টার টেররিজমের প্রধান মো. শহীদুল্লাহ বলেন, মামলার তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জব্দ আলামতের তালিকা তৈরির প্রস্তুতি চলছে। সব কিছু পাওয়ার পর আমরা বিস্তারিত বলতে পারব।
পলাশের দাফন সম্পন্ন : ছিনতাইচেষ্টাকালে নিহত পলাশ আহমেদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল ৯টায় তার নিজ বাড়ি সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের দুধঘাটা গ্রামে পলাশকে দাফন করা হয়। পলাশের বাবা পিয়ার জাহান সরদার জানান, প্রথমে ছেলের লাশ গ্রহণের ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু প্রশাসন লাশ নিতে বলায় সোমবার রাতে তিনি চট্টগ্রামে যান। পরে পতেঙ্গা পুলিশের কাছ থেকে লাশ নিয়ে গতকাল সকাল ৬টায় বাড়িতে পৌঁছেন। উৎস: দৈনিক আমাদের সম।

ad

পাঠকের মতামত