‘ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়েও বেঁচে গেলেন মৃত্যুপ্রত্যাশী আয়েশা’
এক পা ভাঙা, জীর্ণ শরীর। হাঁটতেও পারছেন না। মলমূত্র ত্যাগের ভয়, তাই না খেয়ে চলছে চারদিন। স্বামী নেই, একমাত্র পুত্রসন্তানও মারা গেছে। সব যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে চান এই রুমেলা খাতুন (৫০)।যন্ত্রণাকে মুক্তি দিতেই চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেন তিনি। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চালক কৃষ্ণ কুমারও লাঠি হাতে রেললাইনের পাশে দাঁড়ানো অস্থির এই নারীকে অবলোকন করছিলেন।গৌরীপুর রেলওয়ে জংশন থেকে ছেড়ে আসা মহুয়া ৪৪ আপ ট্রেনটি তখন ময়মনসিংহের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। জংশন ছাড়ার কারণে ট্রেনের গতিও বাড়তে থাকে। রেলওয়ে জংশনের লেভেলক্রসিং অতিক্রমের পূর্বমুহূর্তে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়েন এই রুমেলা খাতুন।
রেলওয়ে জংশনের কেবিন এড স্টার মো. সাইদুর রহমান জানান, ৪৪নং আপ-মহুয়া কমিউটার ট্রেনটি শনিবার ৫টা ২২মিনিটে গৌরীপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়। বিচক্ষণ চালক কৃষ্ণ কুমারও হঠাৎ ট্রেনের ব্রেকে চাপ দেন। থেমে যায় ট্রেন! ইঞ্জিনের নিচ থেকেই অক্ষত অবস্থায় এ নারীকে উদ্ধার করেন এলাকাবাসী।উদ্ধারের পর থেকে রুমেলা বাঁচতে চান না, মরে যেতে চান বলে চিৎকার শুরু করেন। বারবার বকতে থাকেন, আমার এক পা ভাঙা; আমি বাঁচতে চাই না। আমাকে দেখার কেউ নেই। স্বামীও মরছে, পুত্র মরছে। খাইলে প্রস্রাব, পায়খানায় যেতে হয়, আমি যেতে পারি না। তাই ৪ দিন ধরে কিছু খাই না।
খবর পেয়ে ছুটে আসেন গৌরীপুর রেলওয়ে ফাঁড়ির কনস্টেবল মো. খায়রুল ইসলাম, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন গৌরীপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও যুগান্তর প্রতিনিধি মো. রইছ উদ্দিন, যুগান্তর স্বজন সমাবেশের সহসম্পাদক মো. মিলন মিয়া।রুমেলা এ সময় সাংবাদিক, পুলিশ ও মানবাধিকার কর্মীদের কাছে পরিচয়ও দিতে চাননি। একপর্যায়ে জানান তার নাম আয়েশা খাতুন। বাড়ি গাজীপুরের টংটংগিয়া এলাকা। নিজেকে আড়াল করতে নিজের পরিচয়ও গোপন করেন তিনি।
সবার আশ্বাসে বদলে যায় ‘মরার স্বাদ’। তখন তিনি বলেন, আমাকে ছেড়ে দিন, আর মরতে যাব না। এখন বাঁচতে চাই, বেঁচে থাকব। ভিক্ষা করে খাব, তারপরও বেঁচে থাকব।রাত একা ছাড়া অনিরাপদ হওয়ায় সবার সিদ্ধান্তে রেলওয়ে জংশনের মাস্টার মো. আব্দুর রশিদের সহযোগিতায় রেলওয়ে পুলিশের মাধ্যমে তাকে গৌরীপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে নেয়ার পর অবশ্য তিনি তার আসল পরিচয় দেন রুমেলা খাতুন (৫০)। তার বাড়ি গৌরীপুর উপজেলার মইলাকান্দা ইউনিয়নের লামাপাড়া গ্রামে। তার স্বামীর নাম মৃত আবদুর রহমান।
হাসপাতালে ভর্তি চিকিৎসা কার্যক্রমে এগিয়ে আসেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারহানা করিম ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম। নিজে সুস্থতা উপলব্ধি করায় রোববার গৌরীপুর হাসপাতাল থেকে ‘বেঁচে থাকব প্রতিশ্রুতিতে’ নিজ বাড়িতে চলে যান।




