আনোয়ার ভাইয়ের শার্টের পোড়া টুকরো নিয়ে ঘুরছেন
নিউজ ডেস্ক।। চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে নিহত ৬৭ জনের মধ্যে এখনও ১৯ জনের লাশ হস্তান্তর করা যায়নি। তারা পুড়ে এতটাই অঙ্গার হয়েছেন যে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই ঢামেক মর্গের সামনে তাদের স্বজনের আহাজারি থামছে না। বিস্কিটের একটি খালি প্যাকেট নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন আনোয়ার হোসেন। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করতে প্যাকেটের ভেতর থেকে শার্টের একটি পোড়া টুকরো বের করে দেখালেন। তার ভাষ্য, চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের আগে ওই শার্ট পরেছিলেন তার ভাই আহছান উল্লাহ (৩২)। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) মর্গে রাখা একটি লাশের সঙ্গে লেগে ছিল শার্টের টুকরোটি। পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া মৃতদেহটি তার ভাইয়ের বলে ধারণা করছেন আনোয়ার। তবে সংশ্নিষ্টরা এখনও সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেননি। তাই ডিএনএ প্রোফাইল মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ নেওয়ার অনুরোধ করেছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। আরও অনেকের স্বজনই গতকাল শনিবার ভিড় করেন ঢামেকসহ বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবরেটরির সহকারী ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন সমকালকে বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনদের শরীর থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এগুলো থেকে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে নিহতদের ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে যাদের লাশ শনাক্ত হবে, তাদের স্বজনদের ডেকে লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হবে। ঢামেক মর্গে গতকাল দুপুরে আহছান উল্লাহর চাচাতো ভাই আজাদ হোসেন জানান, পুরান ঢাকার সাতরওজা এলাকার ছক্কু মিয়ার গলিতে থাকতেন আহছান। তিনি ব্যাগের ব্যবসা করতেন। ঘটনার দিন তিনি চকবাজারে মান্নান-হান্নানের দোকানে ব্যাগ সরবরাহ করতে যান। ওই দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, গাঢ় নীল রঙের শার্ট ছিল তার গায়ে। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি চুড়িহাট্টায় যান। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তাকে পাওয়া যায়নি। খুঁজতে খুঁজতে গতকাল স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গের একটি লাশে তার শার্টের টুকরো খুঁজে পান স্বজনরা। লাশটি যদিও ফুলে গেছে, তবু তারা ধারণা করছেন, সেটিই তাদের নিখেঁাঁজ প্রিয়জন। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে সিআইডির লোকেরা আহছান উল্লাহর আপন ভাই আনোয়ার হোসেনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছেন।
আহছানের কারখানার কর্মী রাশেদ জানান, শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগে ভুগছিলেন আহছান। সেজন্য ওষুধ কিনতে তিনি চুড়িহাট্টায় যান। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের নরোত্তমপুর এলাকায়। আহছানের স্ত্রীর নাম বিবি কুলসুম। তাদের মাকসুদ ও শরীফ নামে দুই ছেলে রয়েছে। আহছানের বাবা সরু মিয়া অনেকদিন ধরে অসুস্থ। নুরুজ্জামানের খোঁজে স্ত্রী-সন্তান :রিকশাচালক নুরুজ্জামান হাওলাদারের খোঁজে ঢামেক মর্গে এসেছিলেন তার স্ত্রী শিরিন আক্তার। তার সঙ্গে ছিল তাদের পাঁচ মাসের সন্তান আবুল হোসেন। সিআইডির ডিএনএ ল্যাবের কর্মীরা গতকাল শিশুটির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেন।
শিরিন আক্তার জানান, অগ্নিকাে র পর থেকে তার স্বামী নুরুজ্জামানের খোঁজ মিলছে না। আগুনে তার মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্বজনরা। মর্গে ৪০টির মতো লাশ দেখেছেন। তবে সেগুলোর মধ্যে তার স্বামীর লাশ ছিল না। তাদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বেলপাড়ায়। বর্তমানে থাকেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। আগুনের ঘটনার আগে নুরুজ্জামান মোবাইল ফোনে জানিয়েছিলেন, তিনি চকবাজারে আছেন।
ইব্রাহিম ও রফিকের স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ :অটোরিকশাচালক ইব্রাহিম (২৮) ও চুড়ি কারখানার কর্মী রফিক (২৫) চুড়িহাট্টার আগুনের পর থেকে নিখোঁজ। গতকাল তাদের স্বজনরা ঢামেক মর্গে সিআইডির অস্থায়ী বুথে গিয়ে ডিএনএ নমুনা দেন। ইব্রাহিমের স্ত্রীর বড় বোন রোকসানা জানান, কামরাঙ্গীরচরের নজিবর ঘাট এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন ইব্রাহিম। তাদের বৃষ্টি নামে এক মেয়ে রয়েছে। ঘটনার দিন বিকেলে ইব্রাহিম বাসা থেকে বের হন। এরপর তার খোঁজ মেলেনি। তাই মর্গে এসে লাশগুলো দেখছেন। ডিএনএ নমুনাও জমা দিয়েছেন। রফিকের স্বজনরা জানান, কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জ এলাকায় স্ত্রী হাসিনা ও মেয়েকে নিয়ে থাকতেন রফিক। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুরে। বাবার নাম আলতাফ মিয়া। আগুনের পর থেকে তারও খোঁজ মিলছে না। উৎস: সমকাল।




