চট্টগ্রামে বিয়ের পর পাল্টে গেল ছেলে, মামলা করলেন বাবা
বাংলাদেশে চট্টগ্রামে ছোটো একটি কাপড়ের দোকান চালাতেন আবু তাহের। এক পর্যায়ে কাজ থেকে অবসর নিয়ে আর্থিক সহযোগিতার জন্য ছেলে মেয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, তার ছেলে খুবই ভালো একটি সন্তান ছিলো। ছেলেকে বড় করতে গিয়ে আমাকে ও তার মাকে একটি কঠিন সময় পার করতে হয়েছিলো। কিন্তু বিয়ের পরই ছেলেটা পাল্টে গেলো। বাবা মায়ের দেখভাল করা বন্ধ করে দিলো।’ মেয়ের কাছ থেকে কিছু সহযোগিতা পেলেও বেশ কষ্টই করতে হচ্ছিলো ৭৫ বছর বয়সী আবু তাহেরকে।
আর এ কারণেই কোনো উপায়ন্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত ছেলে মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে মামলা ঠুঁকে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আবু তাহের। তিনি বলেন,‘এটা আমার জন্য অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত ছিলো। সবাই অনেকদিন ধরেই বলছিলো মামলা করার কথা কিন্তু আমি সেটি করতে চাইনি। কিন্তু আর কোনো উপায় নেই দেখে মামলা করলাম।’ যদিও পুত্র শাহজাহান অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।ছেলে শাহজাহান, যিনি একটি ব্যাংকে চাকরি করেন, বলছেন তিনি বাবা-মাকে সহায়তা করে আসছেন। তার দাবি তার বাবা তার নামে মামলা করেছেন তাকে অসম্মানিত করার জন্য।
বাবা বনাম পুত্র: পরিবারের এমন ভাঙ্গাগড়ার ঘটনা বিশ্বের যে কোনো জায়গাতেই ঘটতে পারে কিন্তু পিতা হয়ে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন আবু তাহের সেটি কিছুটা নজিরবিহীন। বাংলাদেশে বাবা মাকে সহায়তা নিশ্চিত করতে করা পিতা-মাতা ভরণ-পোষণ আইনের আওতায় মামলা করেছেন তিনি।যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে ও ইউরোপের কোন কোন জায়গায় এ ধরণের আইন আছে কিন্তু এগুলোর প্রয়োগ তেমন একটা দেখা যায়না। যদিও এশিয়ায় মাঝে মধ্যে এর প্রয়োগ দেখা যায়।
ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. রায় সেরানো এশিয়ার বিভিন্ন দেশের এ সম্পর্কিত আইনগুলো পর্যালোচনা করে বলেন ,এ ধরণের আইনগুলোর এসেছে পিতা মাতা বা মুরুব্বীদের প্রতি শ্রদ্ধা বা সম্মানের ধারণা থেকে। তিনি এগুলোকে সমাজে ভরণপোষণ বা শিশুদের সমর্থদের সম্প্রসারিত ধারণা হিসেবে বর্ণনা করেন যা পরিবার বা মূল্যবোধকে পুরস্কৃত করে।
এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর একটি উদাহরণ। দেশটির আইন অনুযায়ী, বয়স্ক বাবা -মা যারা নিজেদের আয় উপার্জনের সক্ষমতা নেই তারা সন্তানদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা চাইতে পারেন। তারা মামলাও করতে পারেন যদি সন্তান সেটি না করে। আদালত মাসিক একটি ভাতা বা মোটের ওপর অর্থ সহায়তার নির্দেশ দিতে পারেন। আবার এটি দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতেও হতে পারে। ২০১৭ সালে বিশটি মামলা ট্রাইব্যুনাল ফর মেইনটেনান্সে নিষ্পত্তি হয়েছে।এদিকে, চীন, ভারত ও বাংলাদেশে প্রায় একই পদ্ধতি কাজ করছে। মূলত বয়স্কদের সহায়তার জন্য গত কয়েক বছরে এগুলো এই পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। ড. সেরানো বলছেন, ‘সন্তান হিসেবে বড় হয়ে বাবা-মা’র সাথে বসবাস না করলেও আপনার উচিত তাদের সহায়তা করা।’আবার কিছু ক্ষেত্রে সন্তানদের জরিমানা ও জেল দেয়ারও নজির আছে। চীনের সিচুয়ান প্রদেশে সম্প্রতি একটি ঘটনা ঘটেছে। সেখানে পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ককে দু’বছর পর্যন্ত জেল দেয়া হয়েছে বয়স্ক বাবাকে পরিত্যক্ত করার জন্য। আদালত তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ পেয়েছে।
রাষ্ট্রের ভূমিকা: আইনগুলো আসলে বয়স্কদের দারিদ্র্যতার দিকেই বেশি দৃষ্টি দিয়েছে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদী দেখভালের জন্য নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৮০ ভাগ বয়স্ক মানুষ বসবাস করবে নিন্ম ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। ড. সেরানো বলছেন, সিঙ্গাপুরের মতো ব্যবস্থা বয়স্ক অভিভাবকদের যারা দেখাশোনা করেনা তাদের জন্য কার্যকর হতে পারে। তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে এসব নীতির বিরুদ্ধে মত আছে।
হার্ভার্ড অধ্যাপক জেমস সেবিন অবশ্য বলছেন, ‘এর সম্ভাব্য একটি বিপদ হলো— হয়তো কোনো সন্তানও এমন অভিযোগ করতে পারে যে তার বাবা মা তাকে অবহেলা করেছেন বা হয়রানি করেছে।আমার মনে হয় না যে এসব সামাজিক ও মানসিক বিষয়ে আদালতের ওপর নির্ভর করা উচিত।’যদিও বাংলাদেশে যে ব্যবস্থা আছে সেটি আবু তাহেরের মতো ব্যক্তির জন্য সহায়কই হবে। তিনি আদালতের বাইরে ছেলের সাথে একটি সমঝোতা করেছেন। সে অনুযায়ী সন্তান মো. শাহজাহান তাকে প্রতি মাসে তার বাবাকে দশ হাজার টাকা দেবেন বলে সম্মত হয়েছেন। আবু তাহের বলছেন, ‘ছেলে কথা রাখলে তিনি চট্টগ্রামে আদালত থেকে মামলা তুলে নেবেন।’ সূত্র: বিবিসি বাংলা




