259509

মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারটি নিয়ন্ত্রণে নিতে আরেকটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠেছে!

ডেস্ক রিপোর্ট।। বন্ধু প্রতীমদেশ মালয়েশিয়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম স্বীকৃতি কারি মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বিস্তৃত হয়ে চলেছে। বর্তমানে রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বাংলাদেশ মালয়েশিয়া সুসম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এ দেশটি বাংলাদেশিদের জন্য ইতিবাচক। এ সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশ হতে মালয়েশিয়া পর্যন্ত রয়েছে দালাল ও মানবপাচারকারী চক্রের নানান অপতৎপরতা। যদিও বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দালাল ও মানব পাচার রোধে রয়েছে কঠোর আইন।

মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের নানান অবৈধ প্রক্রিয়ায় প্রেরণ করা হচ্ছে অনবরত। ফলে মালয়েশিয়া সরকার দফায় দফায় বৈধ হওয়ার সুযোগ দেয়া সত্বেও অবৈধ বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। যা স্থগিত হওয়া জি টু জি প্লাস প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগে বাধাগ্রস্ত করছে বলে জানা গেছে।

এদিকে স্থগিত কর্মী নিয়োগ নিয়েও রিক্রুটিং এজেন্টদের আগাম তৎপরতা ও ভুল বার্তা দিয়ে এ প্রক্রিয়াকে ফেলেছে জটিলতায়। কেননা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মাহাথির সরকারের স্পষ্ট ঘোষণা এবং বাংলাদেশ সরকারের স্পষ্ট অবস্থান থাকা সত্বেও মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের কতিপয় এজেন্টদের তৎপরতা কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে দুটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় নির্দিষ্ট হওয়া বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে মালয়েশিয়া সরকার সতর্কতা অবলম্বন করছে।

পক্ষান্তরে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থই ক্ষুন্ন হচ্ছে। মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশিসহ সকল প্রবাসী কর্মীদের স্বার্থসুরক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অর্জনে সচেষ্ট। বৈধতার প্রগ্রামের আওতায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক প্রতারণার শিকার হয়ে অজানা আশংকায় ভুগছেন। এদের বৈধতার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য হাইকমিশন অনুরোধে মালয়েশিয়া সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি যেসকল কোম্পানি বা এজেন্ট প্রতারনা করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও হাইকমিশন করেছে বলে জানা গেছে।
প্রায় ৪৫ হাজার কর্মী এখনও ভিসা প্রাপ্তির আশায় প্রহর গুনছেন। ওদিকে ১ লাখেরও বেশি নিবন্ধিত হয়েও প্রতারনার শিকার হয়ে দিকবিদিক ছুটাছুটি করছেন। এখনও বৈধতার নামে স্পেশাল পাশ করিয়ে দেয়ার নামে প্রচারণা চলছে যা মালয়েশিয়া সরকারকে কঠোর হতে বাধ্য করছে। ফলে বৈধ কর্মীরাও এখন নানান সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

এদিকে মালয়েশিয়ার মাহাথির সরকার, বিগত সরকারের অনেক নীতি ও সিদ্ধান্তের রিভিউ করলেও বিদেশী শ্রমিকদের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত এখনও আসেনি। এ সুযোগে আগাম বিশেষ কয়েকটি ঘটনা ঘটে চলেছে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের আদম বেপারীদের মধ্যে। বাংলাদেশ পক্ষে এমন কিছু কর্মকান্ড করা হচ্ছে তা পক্ষান্তরে মালয়েশিয়ার জন্য বিব্রতকর বলে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন।

মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী সংগ্রহে প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে কোম্পানি এজেন্টের কাছে বিক্রি করে দেয়। এ এজেন্টের কাছ থেকে বাংলাদেশের সাব এজেন্টরা কিনে নেয় এভাবে হাত বদল হতে হতে থাকে আর মূল্য ক্রমশ: বাড়তে থাকে যা বাংলাদেশি কর্মীকেই বহন করতে হয়।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারটি নিয়ন্ত্রণে নিতে আরেকটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠেছে বলে সংবাদ মাধ্যমে জানা গেছে। ফোমেমা নামক একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন দ্বায়িত্বশীল ব্যক্তির বাংলাদেশ সফর ও মেডিকেল সেন্টারগুলি পরিদর্শন নিয়ে ছড়ানো হয়েছে যে তারা মালয়েশিয়া সরকারের প্রতিনিধি। এজাতীয় কোন সরকারি টিম মালয়েশিয়া গেছে কি না তা মালয়েশিয়াস্থ বংলাদেশ হাইকমিশন জানে না বলে সংশ্লিষ্ট দ্বায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মেডিকেল সেন্টার অনুমোদন নিতে তৎপর শুরু করেছে ওই মহলটি। রবিবার ফোমেমা নামে মালয়েশিয়ার একটি বেসরকারি মেডিকেল চেকাপ সংগঠনের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে এসেছে। যার মূলে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান আদম ব্যবসায়ী দাতো শ্রী আবু হানিফ মো. আবুল কাশেম।

অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ থেকে যেসব কর্মী মালয়েশিয়ায় যাবে, তাদের মেডিকেল চেকাপের সিন্ডিকেট করা হবে। এভাবে শ্রমবাজারটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছেন বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার এই ব্যবসায়ী মহল। এধরনের মেডিকেল চেক আপ সেন্টার উভয় দেশের সরকার মিলে ঠিক করবে বলে জানা গেছে। সরকার এ ধরনের সিন্ডিকেটের বিপক্ষে বলে জানা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন।

অপরদিকে মালয়েশিয়া সরকারও পূর্বের ন্যায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী দাতু শ্রী আমিন নুরের মত কোন সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এ যেন এক বাংলাদেশির ফাঁদ থেকে আরেক বাংলাদেশির ফাঁদে পরছে সরকার। অপরদিকে প্রতারণার ফাঁদ পাতানো বন্ধ হচ্ছে না। এবার বাংলাদেশ সরকারের মনোগ্রাম যুক্ত করে ফেসবুকে পেজ খুলে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যেতে ইচ্ছুকদের আকর্ষণ করা হচ্ছে।

বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। আর ওই সব কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, উইচ্যাট সহ ভিন্ন অবলম্বন। প্রবাসীকর্মী হতে সরকারের আইনগত সুনর্দিষ্ট পদ্ধতি আছে এবং এ সম্পর্কি আইনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নীরব থাকে। শক্তিশালী একটি ভিজিলেন্স টিম এবং তাতক্ষণিক শাস্তি প্রদানের জন্য ১১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত করা হলেও প্রতারকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় নি। এ বিষয়ে প্রবাসীদের নিয়ে সোচ্চার সংগঠনগুলো সরকারকে বারবার দাবি জানিয়ে আসলেও অজ্ঞাত কারণে সরকার চুপ থেকেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি সর্বাগ্রে অভিবাসনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে বাংলাদেশ বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অপরদিকে যথানিয়মে জনশক্তি রপ্তানিতে নিযুক্ত এজেন্টারও সঠিকভাবে অভিবাসন করতে সক্ষম হবেন বলে দাবি করেছেন।

উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ার বিগত সরকার মালয়েশিয়ান বাংলাদেশি ব্যবসায়ী দাতো শ্রী আমিন নুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ১০ জন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ করে যেখানে কোম্পানির সরকারি অনুমোদন, মেডিকেল চেক আপ, সিকুরিটি ক্লিয়ারেন্স, ভিসা প্রাপ্তি, ঢকাস্থ মালয়েশিয়ান হাইকমিশন থেকে ভিসা প্রাপ্তি এবং বিমান টিকিটসহ যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ করতো। পদ্ধতিটা শুরুতে ভালোই ছিল কিন্তু পরবর্তীতে অধিক অভিবাসন ব্যয় ও দুর্নিতির কারণে বর্তমান মালয়েশিয়ান সরকার সামগ্রিক প্রক্রিয়াটা স্থগিত করে মূল্যায়ন করছে এবং সকল দেশের জন্য একক প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগের পদ্ধতি চালুর ঘোষণ দিয়েছেন। আর যেন কোন আমিন নুর সুযোগ না নেয় এ বিষয়ে সরকার সচেষ্ট। জানাগেছে মালয়েশিয়া সরকার দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করবে। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে এ ধরনের তৎপরতা সুফল বয়ে আনতে কতটা ভূমিকা রাখবে তা লক্ষণীয়। তবে উভয় সরকারের কঠোর সিদ্ধান্তই পারে কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে। উৎস: যুগান্তর।

ad

পাঠকের মতামত