চাকরি করতে গিয়ে ‘বন্দী’
রাহসান আহমেদ হালিম। গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়। ২০১৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর স্থানীয় একটি কলেজে ভর্তি হয় সে। বাবার অভাবের সংসারে একটু সহযোগিতা করতে পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটখাটো অনেক কাজ করছিলেন হালিম। কিন্তু হঠাৎ এক বন্ধুর ফোন পেয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করে হালিম। কারণ ওই বন্ধু ফোনে তাকে ১২ হাজার টাকা মাসিক বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেয়। জানানো হয়, থাকা-খাওয়ার জন্য তাকে কোনো খরচ করতে হবে না, কর্মীদের সব ব্যবস্থা কোম্পানিই করে থাকে।
অভাবের সংসারে বড় হওয়া হালিমের কাছে চাকরির প্রস্তাবটি ছিল ‘মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি’ পাওয়ার মতো। তবে এই প্রস্তাব যে তাকে তিন মাসের বন্দিত্ব উপহার দেবে, বাবার টানাপোড়েনের সংসারে ঋণের বোঝা আরও ভারী করবে, এমনটা কল্পনাও করতে পারেনি হালিম। চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলে তাকে বলা হয়, জামানত ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ৪০ হাজার টাকা দিতে হবে। তবে ওই টাকা তিন মাস পর ফেরত দেওয়া হবে। সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় তা-ই করে হালিম।
কৌশলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর তিন মাস গাজীপুরের একাধিক এলাকায় আটকে রাখা হয় হালিমকে। অন্য কাউকে ফাঁদে ফেলে কীভাবে তাদের কাছে থেকে কৌশলে টাকা হাতিয়ে নেওয়া যায়, এমন নানা রকমের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল তাকে। কিন্তু মানুষ ঠকানোর কোনো কৌশলই শিখতে চাচ্ছিল না সে। বাবার কষ্টের টাকা ফেরত ও বন্দী দশা থেকে মুক্তি চাচ্ছিল। কিন্তু টাকা বা মুক্তি কিছুই মিলছিল না। তিন মাস বন্দী থাকার পর একদিন কৌশলে সেখান থেকে বের হয়ে মা-বাবার বুকে ফেরে হালিম।
শুধু হালিম নয়, তার মতো আরও শত শত চাকরিপ্রত্যাশী তরুণের সঙ্গে একইভাবে প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে একটি মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতিষ্ঠান। ‘দৈনিক আমাদের সময়’ অনলাইনের অনুসন্ধানে প্রতারিত এমন বেশ কয়েকজন তরুণের খোঁজ পাওয়া গেছে। তাদের প্রত্যেকের অভিযোগ একই।সম্প্রতি প্রতারণার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ’-এর সাত জন কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়েছিল। কিন্তু আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও লোক ঠকানোর ব্যবসায় নেমেছেন তারা।
চাকরি করতে গিয়ে যেভাবে বন্দী হয় হালিম-গত ২৭ ডিসেম্বর মাসে এই প্রতিবেদকের কাছে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে একটি বার্তা পাঠিয়ে নিজের বন্দিদশার বর্ণনা দেয় হালিম। অনুরোধ করে, তাকে যেন মুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।ওই বার্তায় হালিম লিখে, ‘আস্ সালামুআলাই কুম। স্যার, আমি ঢাকার গাজীপুর থেকে বলছি। আমার নাম আ.হালিম। আমাকে আমার এক বন্ধু অফিসিয়াল কাজের কথা বলে ৪০ হাজার টাকা জামানত নিয়ে লাইফওয়ে বাংলাদেশ নামক একটা কোম্পানিতে ঢুকিয়েছে। …আমাকে বলা হয়েছিল চাকরিতে যোগদান করার পর আমাকে অফিসিয়াল কাজের দায়িত্বে রাখা হবে। কিন্তু এখন দেখতাছি ওই ধরনের কোনো পদই নাই। এখানে প্রতিদিন আমার মতো অনেক যুবক ভালো চাকরি পাওয়ার নামে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। আমাদেরকে সারা দিন রুমে আটকে রাখে। বাহিরে বের হতে দেয় না। দিনে তিন-চার ঘণ্টা অফিসে নিয়ে গিয়ে কিছু সফলতায় গল্প শুনায় আবার লিডারদের দ্বারা আমাদেরকে বাসায় নিয়ে আসে। আমার মতো আরও অনেকেই আছে এখানে।…আমাদের উদ্ধারের জন্য আপনাদের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন।’
এর এক সপ্তাহ পর সাহায্য চেয়ে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে আবার একই বার্তা পাঠায় হালিম।এমন বার্তা পাওয়ার পর অনুসন্ধানে নামে ‘দৈনিক আমাদের সময়’ অনলাইন। খোঁজ মেলে আরও বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর। তাদের কাছে থেকেই জানা যায়, কীভাবে চাকরির নামে ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ’ শত শত তরুণের সঙ্গে প্রতারণা করছে।ভুক্তভোগী হালিম বলেন, এবাদুর রহমান নামে এক বন্ধুর মাধ্যমে পাওয়া চাকরির অফারের বিষয়টি আমার পরিবারকে জানাই। তারা সবাই হাসিমুখে আমাকে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে ঢাকায় পাঠায়। অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে আমাকে লাইফওয়ে বাংলাদেশ-এর আশুলিয়া অফিসে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হয়। আমি যথাসময়ে তাদের অফিসে ইন্টারভিউ দিতে চলে যাই। কথা বলার পর তারা জানায় যে আমার চাকরি হয়ে গেছে। আমার বেতন মাসে ১২ হাজার টাকা। আর থাকা-খাওয়া কোম্পানির। তবে জামানত হিসেবে ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে। একই সাথে ফরম বাবদ আরও দেড় হাজার টাকা দিতে হবে। আর আমার চাকরিতে যোগদানের তিন মাস পরে এই টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তাদের কথা মতো আমি ফোনে আমার বাবার কাছে অনেক অনুরোধ করে টাকা ম্যানেজ করে ওই দিনই তাদের হাতে তুলে দেই।’
ঘটনার বিবরণ দিয়ে হালিম বলে, ‘টাকা দেওয়ার পরে তারা আমাকে একটি হোস্টেলে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে দেখি আমার মতো প্রায় ১০০ জন ছেলে। আবার প্রতিদিন অনেক নতুন ছেলে এসে সেখানে যুক্ত হতো। কেউ সেখানে এক মাস কেউ তিন মাস, কেউ আবার ছয় মাস ধরে রয়েছে। পরের দিন আমাকে সবার সাথে নিয়ে গিয়ে ট্রেনিং করানো হয়। সেখানে একটা বিষয় স্পষ্ট হই যে আমাকে অন্য মানুষের কাছ থেকে চাকরির নাম করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল শেখানো হচ্ছে। আমিনুল মোল্লা নামের একজন বস আছেন, তিনি আমাদের প্রশিক্ষণ দেয়। তাদের প্রডাক্ট সেল করলে বা টার্গেট পূরণ করলে কমিশন পাওয়া যাবে। যদিও কোনো দিন নিজ চোখে তাদের কোনো পণ্য আমি দেখি নাই।’
হালিমের ভাষ্য, ‘দুই-তিন দিন পর আমি তাদের জিজ্ঞাসা করি যে, আমাকে তো অফিসিয়াল কাজের কথা বলে চাকরি দেওয়া হয়েছে। এখন এসব মানুষ ঠকানো কাজ শেখানো হচ্ছে কেন? জবাবে তারা বলে,‘ এটাই তাদের মূল কাজ’। তখন আমি আমার টাকা ফেরত চাইলে তারা নানা রকমের অজুহাত দেখাতে শুরু করে। কেউ যে থানা-পুলিশের কাছে যাবে তেমন সুযোগই কাউকে দেওয়া হয় না। সব সময় একটা ঘরে রাখা হয়। দিনে ৩/৪ ঘণ্টার জন্য তাদের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। এসব থেকে মুক্তি পেতে আমি ৩০ ডিসেম্বর সেখান থেকে কৌশলে চলে আসি।’
প্রতারণার প্রথম টার্গেট আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, পরিচিতরা-ওই কোম্পানির ভুক্তভোগী সেলিম, লেমন হোসেন, তুষারসহ বেশ কয়েকজন তরুণ এই প্রতিবেদককে জানায়, তাদের কাছ থেকে চাকরির নামে টাকা নেওয়ার পর প্রথম কাজ দেয় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-পরিচিতদের ফোন নম্বর জোগাড় করার। এরপর সেই সব নম্বরে ফোন করে মিথ্যা চাকরির কথা বলে তাদের ডেকে আনতে বলা হতো। পরে তাদেরও একই কৌশলে ফাঁসানো হতো।
মৌখিক পরীক্ষাতেই চাকরি, পরে সর্বনাশ-চাকরিপ্রার্থী শত শত মানুষকে প্রতারণার ফাঁদ পেতে কোটি টাকা আত্মসাৎকারী ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে কথিত সেই মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতিষ্ঠানের চার কর্মকর্তাকে গত ৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।প্রতারিত এক ব্যক্তির ঘটনার বিবরণ দিয়ে পিবিআই ঢাকা মহানগরের বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ জানান, ঝালকাঠি জেলার বাসিন্দা আবু হানিফ নামে এক ব্যক্তিকে তার বন্ধু ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ডেকে আনেন। তার সেই বন্ধুর নাম মেহেদী হাসান। মেহেদী তাকে বলেছিল যে, সুপারভাইজার পদে তার চাকরি হবে। বেতন পাবে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। এরপর ২০১৮ সালের ৫ মার্চ হানিফ উত্তরা এলাকায় লাইফওয়ের কার্যালয়ে যান। তখন তার বন্ধু মেহেদী তাকে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক পরিচয়দানকারী নজরুলের ইসলামের সঙ্গে পরিচয় করে দেন।
আবুল কালাম আজাদ জানান, এরপর ওই ব্যক্তি হানিফের নামমাত্র একটি মৌখিক পরীক্ষা নেয়। পরে বলা হয় যে তার চাকরি হয়ে গেছে। এ জন্য তার কাছে থেকে প্রতিষ্ঠানের ফরম পূরণ ও জামানত বাবদ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। টাকা নেওয়ার পরে হানিফসহ নতুন চাকরি পাওয়া ৭-৮ জনকে একসাথে আজমপুর এলাকায় একটি বাসায় রাখা হয়। মূলত সেখানে তাদের বন্দীর মতো করেই রাখা হয়। এরপর হানিফকে চাপ দিয়ে তার এলাকার আরও দুজনকে চাকরি দেওয়ার নাম করে ওই প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। একইভাবে তাদের কাছ থেকেও টাকা আদায় করে আটকে রাখা হয়। এত কিছুর পরও হানিফ যখন সাহস করে টাকা ফেরত চায়, তখন টাকা ফেরত না দিয়ে তাকে ছুটির নামে বাড়ি পাঠানো হয়। হানিফ সেই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার পর তাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলা, গ্রেপ্তারের পরও থামছে না প্রতারণা-প্রতারণার বহু অভিযোগে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয় ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ’ নামক ওই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের। কিন্ত জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই কাজে নেমে পড়ছেন তারা।গত ৩০ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসপি) এনামুল কবির লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছিলন। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি চাকরিতে নিয়োগের নামে বেকারদের কাছ থেকে জামানত হিসেবে টাকা জমা রেখে তা আত্মসাৎ করতো। এর আগে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুর থেকে এই প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।এর আগে গত ২৮ এপ্রিল ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ওই কোম্পানির বেশ কয়েকজনকে আটক করেছিল র্যাব-১১। এ সময় কয়েকজন নারীসহ মোট ৩১ জন ভিকটিমকেও উদ্ধার করে র্যাব।
কথা বলতে নারাজ কর্তৃপক্ষ-২০১০ সাল থেকে কাজ করছে ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড’। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র মার্কেটিং অফিসার এবাদুর রহমানের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি একটা মিটিংয়ে আছি। পরে কথা বলবো।’ নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফোন কেটে দেন তিনি।এরপর লাইফওয়ে বাংলাদেশের পরিচালক পরিচয় প্রদানকারী আমিরুল মোল্লার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়




